Published : 14 Dec 2021, 07:08 PM
বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতা বা বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। একইসঙ্গে ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নানা আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল কারণ। বুদ্ধিজীবীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, সরাসরি যুদ্ধের উসকানিও দেন নি। তাহলে ঠিক বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে কেন বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলো নিষ্ঠুরভাবে? কী ছিল তাদের অপরাধ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা দরকার।
৫০ বছর আগে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পেছনে রয়েছে এক বিস্তৃত প্রেক্ষাপট, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনালোচিতই থেকে যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনার পেছনে বুদ্ধিজীবীদের অসামান্য ভূমিকা ছিল। তাদের চিন্তা বুদ্ধি আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণভাবনা ঘটিয়েছিল অসামান্য গণজাগরণ। বাঙালি জাতির মানসগঠনের এই কারিগরগণ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, পুঁজিপতি শ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য ছিলেন অত্যন্ত বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ। ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয় মুক্তির দিশা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি তৈরি হয়েছিল যা বুদ্ধিজীবীমহল সঞ্চারিত করেছিলেন। সুতরাং তাদের অস্তিত্ব ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্য ছিল চরম হুমকি। ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান মেনে নেননি বলে এবং আগামী বাংলাদেশকে ধর্মরাষ্ট্র করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হবে, তদুপরি বাংলাদেশকে প্রগতির পথে পরিচালনায় অগ্রগামী হওয়ার আশঙ্কায় একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দেশীয় দোসরেরা নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে এই জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধ্বংস করে দিতে এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।
এখানে প্রশ্ন আসে, কারা বুদ্ধিজীবী? বাংলা একাডেমি প্রকাশিত 'শহীদ বুদ্ধিজীবীকোষ' গ্রন্থে বলা হয়েছে―"বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, সকল পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী। যারা দেশের স্বাধীনতাকে ভিত্তি করে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের বিচার, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে কাজ করে।"
অন্যদিকে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত অভিধানে 'বুদ্ধিজীবী' বলতে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে― "যারা সমাজ ও সংস্কৃতি সচেতন এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে দক্ষ সুশিক্ষিত মানুষ, যারা বুদ্ধির বলে বা বুদ্ধির কাজ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।"
ইতালির বামপন্থি বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, সাংবাদিক আন্তোনিয়ো গ্রামশি–কে মুসোলিনি কারারুদ্ধ করেছিলেন (১৯২৬–৩৭)। গ্রামশি তার কারাগার জীবনের নোটবইতে লিখেছিলেন, "সব মানুষই বুদ্ধিজীবী, কিন্তু সমাজে সকলের ভূমিকা বুদ্ধিজীবীর নয়।"
আরেক দার্শনিক এডওয়ার্ড সাঈদের মতে বুদ্ধিজীবী এমন একজন ব্যক্তি যিনি স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের পক্ষে একটি নির্দিষ্ট বার্তা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও একটি সুচিন্তিত মতামত জনগণের সামনে তুলে ধরেন৷ কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাকে সত্য প্রকাশ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না৷
সমাজে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা নির্ণয় করা খুব সহজ নয়। আসলে 'বুদ্ধিজীবী'রা যন্ত্রণাদায়ক ইঞ্জেকশনের মতো। সাধাররণেরা কখনওই তার উপকারিতা বোঝে না। কিন্তু সমাজবিকাশে এবং মানস গঠনে তাঁদের অবদান অপরিসীম।
একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। রাজনীতির কোলাহল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন তারা। তাই তাদের টার্গেট করা হয়েছে। বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে। তবে এখন বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বদলে গেছে। প্রচারের আলোর টান, সরকারি দাক্ষিণ্যের লোভ, মতাদর্শের নামে বাঁধা বুলি আওড়ানোর অভ্যাস করায়ত্ত করে নিয়েছেন অনেক বুদ্ধিজীবী। পত্রপত্রিকায় কলম ধরার সাবেক রীতির পাশাপাশি টিভি চ্যানেলে মুখ দেখানো, সোশ্যাল মিডিয়ায় গলা ফাটানো, সভা–সমাবেশে হাজিরা দিয়ে ছবি তোলা, প্রয়োজনমাফিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সেল–এর উপদেষ্টার দায়িত্ব সামলানো, এ–সব প্রাত্যহিক প্রয়োজনের ঘনঘটা বহুলাংশে নব্য বুদ্ধিজীবীদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে রাজনীতির ভাগ্যলক্ষ্মী এমন অনেককেই কৃপা করেছেন, ফলে এখন দলগুলোতে 'বুদ্ধিজীবী'-র ঘাটতি কম।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতে আপত্তি কোথায়? দলীয় রাজনীতির সঙ্গে বুদ্ধিজীবীর সম্পর্ক আদায়–কাঁচকলায় হতে হবে, এমন কোনও মাথার দিব্যি আছে কি? উত্তরে হ্যাঁ এবং না, দুটোই বলা যায়। এই অর্থে— যে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শেরই একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকে। সেখানে বুদ্ধির সঙ্গেই তার নাড়ির যোগ। আবার রাজনীতির দৈনন্দিনতার বৃত্তেও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা বরাবরই বিদ্যমান। রাজার সভাকবি থেকে শুরু করে সরকারি থিঙ্ক–ট্যাঙ্ক, তাদের নিয়েই তৈরি।
এ বার হ্যাঁ–বাচক উত্তরটি খুঁজতে হলে তাকাতে হবে এই বৃত্তের বাইরে, জাতীয় পর্যায়ের বুদ্ধিজীবীদের দিকে। এই বুদ্ধিজীবী কে? যিনি জগৎসংসারের প্রতি নির্লিপ্ত নন, যিনি তার যুগের স্বরকে স্বকণ্ঠে ধারণ করেন।
ব্যবহারিক বুদ্ধিজীবী নন, প্রকৃত প্রস্তাবে চিন্তানায়ক যিনি হন, স্বধর্মেই তাকে হতে হয় রাজনৈতিক শিবিরের বেড়াজালমুক্ত। বাধ্যবাধকতার বাঁধনহীন। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে মাথায় তুলে নাচা বা পক্ষে সওয়াল করার দায় তার থাকে না। কোনো দলের 'ঘরের লোক' হয়ে উঠবার তাগিদ তিনি অনুভব করেন না। এ কালের সংকট এই যে, 'সেল' বা বাহিনীর রমরমা এখানে স্বাধীন চিন্তানায়কের এই ধারণাটিকেই প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। দিগ্ভ্রষ্ট পথিককে দিশা দেখানোর মতো বাতিঘর এমনিতেই আজ বিলুপ্তপ্রায়। তদুপরি বুদ্ধিজীবী নামধারী পারিষদবর্গের ঐকান্তিক চেষ্টাই এই, যাতে বাহিনী–বহির্ভূত কোনও স্বর তার অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখতে না পারে। তাতে শুধু যাবতীয় বিরোধিতা মুছে ফেলার সুবিধাই হয় না, বাহিনীর বাইরে থাকার ব্যবস্থাটাই নষ্ট করে দিয়ে এক 'নিও–নর্মাল' ঘরানা প্রতিষ্ঠা করা যায়, যেখানে আত্মীকৃত বুদ্ধিজীবীকেই নিরপেক্ষ ভাবুক বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। অভিসন্ধিই হবে যাবতীয় চিন্তা-ভাবনার একমাত্র চালিকাশক্তি।
কোনও মতাদর্শের প্রতি তার বিশ্বাস থাকতে পারে, কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার নৈকট্য থাকতে পারে, তিনি কোনও না কোনও প্রতিষ্ঠানের অংশও হতে পারেন। কিন্তু এর কোনওটিই তার ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে না, তার সত্তাকে মুঠোয় পুরে ফেলে না। প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তিনিই, যিনি মানুষের স্বার্থে কথা বলেন, কিন্তু জনতার কলাহলে একাকার হন না। তাঁর স্থান ঝাঁকের বাইরে, স্রোতের বিপরীতে। তিনি কখনও কারও মুখপাত্র নন। তিনি যদি কোনও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তা যুক্তির কষ্টিপাথর, নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বলেই। স্বার্থে নয়, ভাবাবেগে নয়, ভয়ে বা মোহে নয়, তাৎক্ষণিকতায় নয়। তাই বলে মানবিক দুর্বলতা, স্খলন, ক্ষুদ্রতা কি তার নেই? থাকতেই পারে। কিন্তু যেখানে বীক্ষার গভীরতার প্রশ্ন, চিন্তার শুদ্ধতার প্রশ্ন, ভাবনার সততার প্রশ্ন, সেখানে তিনি অজেয়। হাততালি বা চুনকালি, কিছুরই পরোয়া না করে তিনি থেকে যান নিষ্কম্প, বলে যান যা তার বলে যাওয়ার ছিল।
এ সব আকাশকুসুম কল্পনা নয়। সক্রেটিস থেকে সলঝিনেৎসিন, এডওয়ার্ড সাঈদ থেকে নোম চমস্কি, তারা প্রত্যেকেই পেরিয়ে এসেছেন এই অন্তবিহীন পথ। শুধু প্রাতিষ্ঠানিকতার পাশমুক্ত থাকতে চান বলে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন জাঁ পল সার্ত্র। রবীন্দ্রনাথকেও স্মরণ করা যায়— সময়ের দাবিতে সাড়া দিয়ে পক্ষ নিয়েছেন বার বার, কিন্তু শিবিরভুক্ত হননি। একা পড়ে যাওয়ার ভয় তাকে অপ্রিয় ভাষণে বিরত করেনি। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে নিজে রাস্তায় নেমেছেন। নিজেই পরে ঘরে বাইরে লিখেছেন। 'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে'র মতো গান বেঁধেছেন, আবার দেশমাতৃকার আরাধনার নামে বাস্তববর্জিত এবং আগ্রাসী দেশপ্রেমের বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন। গান্ধীকে মহাত্মা বলে ডেকেছেন, কিন্তু মতের ভিন্নতাকে বর্জন করেননি। তার অন্তর যাকে সত্য বলে মেনেছে, শুধু তারই প্রতি প্রণত থেকেছেন আজীবন।
কিন্তু এখন সময় বদলেছে। বুদ্ধিজীবীরাও এখন 'দলীয় রাজনীতি'কেই রাজনীতির একমাত্র রূপ বলে ধরে নেন। তারা ভুলে যান যে 'রাজনীতি' কথাটির পরিব্যাপ্তি অনেক বড়। জীবনের পরতে পরতে—ব্যক্তিগত, পারিবারিক থেকে সামাজিক, কর্মক্ষেত্রীয়, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রেই তা কবচকুণ্ডলের মতো আমাদের জড়িয়ে আছে। সোজা কথায়, জীবনের প্রতিটি স্তরেই আছে ক্ষমতার অস্তিত্ব ও তা প্রয়োগের সংগঠন এবং কৃৎকৌশল। জীবনের বহুস্তরী ক্ষমতা-রা আমাদের কাজকর্ম, আচরণ (এমনকী চিন্তাভাবনা) অনুমোদন বা অননুমোদন করে, তাদের প্রয়োজন মতো আমাদের গড়েপিটে অনুগত বানাতে চায়। বহু ক্ষেত্রে আমরা তার অধীন, আবার অনেক সময়েই আমাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সে 'অন্যদের' অধীন করে। জ্ঞানচক্ষু মেলার পর থেকেই এই ক্ষমতা-বলয়গুলির সঙ্গে প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া, আপস, এমনকী সংগ্রাম করে আমাদের জীবন কেটে যায়।
ফলে, 'দৈনন্দিনের রাজনীতি' আমাদের জীবনের অঙ্গ। প্রতি দিনের ছোট ছোট প্রতিবাদ বা সমাজ-পরিবেশের সার্বিক প্রশ্ন—সবটাই, বড় অর্থে, 'রাজনীতি'র বিষয়। যখন মানবাধিকার বা সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর বিরুদ্ধে বা তথ্যের অধিকার, খাদ্য সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়ে পথে নামেন, যখন লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে, বা বিকল্প যৌনতার পক্ষে মানুষ সরব হয়, তখন সেটা অবশ্যই রাজনীতি। ঠিক একইভাবে, নানা ভঙ্গিতে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ জ্ঞাপনও রাজনীতিই। কিন্তু 'বঙ্গ জীবনের অঙ্গ' হল দলীয় রাজনীতি।
এদেশে রাজনীতি কোনও যুক্তিকে ভিত্তি করে নয়, চলে আবেগে ও (সাধারণত) বংশপরম্পরায়— ফুটবল কিংবা ক্রিকেটে তাদের পছন্দের ক্লাবকে সমর্থন করে যায়, তেমনই আমাদের দলীয় রাজনীতিতে মানুষের (বিশেষত গ্রামাঞ্চল ও মফস্সলে) গায়ে জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত পার্টির পরিচয় সেঁটে দেওয়া হয়। কিন্তু, সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, বিবেকী নাগরিক সমাজ এই দলীয় কলুষের আবর্তে জড়িয়ে পড়বে কেন, এই বিশ্বায়ন-উত্তর অবাধ যোগাযোগের সাম্প্রতিক যুগে? এই প্রশ্নটা জোরেশোরেই তোলার সময় এসেছে।