Published : 14 Oct 2025, 06:14 PM
`স্পেকট্রাম’ বা `তরঙ্গ’ দেশের এমন একটি অমূল্য সম্পদ যা ব্যবহার উপযোগী করার জন্য দেশকে একটি পয়সাও খরচ করতে হয় না, কিন্তু এর সর্বোত্তম ব্যবহার একটি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই বেতার তরঙ্গ আমাদের সবার চারপাশে বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান, অদৃশ্য আকারে। একটি দেশের টেলিকম রেগুলেটর কিভাবে এর বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারণ করে তার ওপর নির্ভর করে এই সম্পদ দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখনো এই মূল্যবান সম্পদকে কেবলমাত্র সরকারের নগদ আয়ের উৎস হিসেবেই প্রাধান্য দিয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এর সুফল জনগণ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তেমন কোনো কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
এখানে বলে রাখা ভালো, তরঙ্গ এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ যা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় যখন নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, তরঙ্গের প্রকৃত উপকারিতা তখনই অর্জিত হয়, যখন এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। এর আগে এটি কেবল একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ মাত্র–যা দেশের জন্য কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে না।
এই বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, শুরু থেকেই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা তরঙ্গের মূল ব্যবহারকারী মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের জন্য তরঙ্গের সরবরাহ সীমিত রেখেছে। সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে এবং তরঙ্গের সরবরাহ সীমিত করার মাধ্যমে চাহিদা বাড়ানোর কৌশলে সরকার তরঙ্গের মূল্য এমন অস্বাভাবিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা এই সম্ভাবনাময় টেলিকম সেক্টরের বিকাশের বদলে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলাফল সুস্পষ্ট: দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বিপুল পরিমাণ তরঙ্গ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা তরঙ্গের মূল্য এত বেশি রাখা হয়েছে যে অপারেটররা নিলামে তা সম্পূর্ণভাবে কিনতেই পারেনি। এতে যেমন সেক্টরের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথেও অদৃশ্য এক দেওয়াল তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, অপারেটরদের শুধু তরঙ্গ কিনলেই কিন্তু হয় না, সেই তরঙ্গকে তাদের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যবহার উপযোগী করতে বিশাল বিনিয়োগ করতে হয় হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার ক্রয়ে।
শুধু তাই না, নতুন তরঙ্গ ব্যবহারে সক্ষম মোবাইল ফোন ডিভাইস বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্রাহকের হাতে আছে কিনা তার ওপর নির্ভর করে প্রয়োগ করা তরঙ্গ মোবাইল অপারেটরের জন্য কতটা রাজস্ব আনবে।
গ্রাহকের দিক থেকে বিষয়টি দেখলে স্পষ্ট। অপারেটররা যত বেশি তরঙ্গ ব্যবহার করবে, গ্রাহক তত ভালো মানের সেবা পাবে। কিন্তু যখন সীমিত পরিমাণ তরঙ্গ উচ্চ ভিত্তি মূল্যে নিলামে দেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে–নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি নিজেই টেলিযোগাযোগ সেবার মানের সঙ্গে আপস করছে?
শুধু তাই নয়, এ ধরণের সিদ্ধান্ত দেশের ডিজিটাল উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দিয়েছে কারণ অপারেটরকে তরঙ্গের উচ্চ মূল্যে বিনিয়োগ করতে করতে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তরঙ্গের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক অনন্য নজির স্থাপন করা হয়েছিল ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত তরঙ্গের নিলামে। মূলত ২০১৮ সালের নিলামের কারণেই, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৯০০ ও ১৮০০ ব্যান্ডের মূল্য ২৭৫ শতাংশ এবং ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১০০ ব্যান্ডের মূল্য ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশে লোয়ার ব্যান্ড অর্থাৎ ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ ব্যান্ডের মূল্য এখন পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে ২০২২ সালের নিলামে পরিস্থিতি ছিল একদম ভিন্ন, যেখানে টেলিকম রেগুলেটর তাদের চিরাচরিত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ২৩০০ এবং ২৬০০ ব্যান্ডের মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে ২২০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের নিলামে অপারেটররা কিনে নেয় ১৯০ মেগাহার্টজ—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল তরঙ্গ নিলাম হিসেবে ধরা হয়।
কারণটা একদম স্পষ্ট–তরঙ্গের দাম ছিল ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এবং তা দেওয়া হয় সহজ শর্তে, তাই অপারেটররা সর্বোচ্চ পরিমাণে তরঙ্গ কিনতে পেরেছে। ফলাফল হিসাবে এই সফল নিলামের সুফল আমরা গ্রাহককেও পেতে দেখেছি নিলাম পরবর্তী সময়ে গত ২ বছরে ৪জি সেবার মান ও গতিতে দৃশ্যমান উন্নতির মধ্য দিয়ে।
যে কোনো ব্যবসার মতো টেলিকম সেক্টরেও একই নিয়ম প্রযোজ্য–বিনিয়োগ সক্ষমতা নির্ভর করে আয় থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হল, গত এক দশকে মোবাইল অপারেটরদের প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গ থেকে আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ। পাশাপাশি ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রাহক প্রতি গড় আয়ও কমেছে ৩৪ শতাংশ।
এবার কিছু বৈশ্বিক বাস্তবতা অনুধাবন করা যাক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইকোনমিক রিসার্চ এসোসিয়েটসের (এনইআরএ) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তরঙ্গের সরবরাহ বেড়েছে ৬০ শতাংশ, মূলত ৪জি ও ৫জি সেবা বিস্তারের জন্য। বাড়তি তরঙ্গ সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে এর দাম কমানো হয়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, ডেটা ট্রাফিকের বার্ষিক বৃদ্ধির হারও কমছে–২০১৮ সালে যেখানে ছিল ৭০ শতাংশ, ২০২৩ সালে নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশে। অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বে মেগাহার্টজ প্রতি আয় কমেছে ৬৭ শতাংশ।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরে অনুষ্ঠেয় ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ ব্যান্ডে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তরঙ্গের নবায়ন আমাদেরকে নতুন একটা সুযোগ করে দিচ্ছে যেখানে এই ব্যান্ডগুলোতে সব অপারেটর মিলে ৭৯.২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নবায়ন হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলে আগের মতো স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকারের নগদ আয়ের উৎস হিসেবেই উচ্চ মূল্যে তরঙ্গ নবায়ন করে সরকারি কোষাগারের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করে দিতে পারে, অথবা দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার নিরিখে সহজ শর্তে ও কম দামে তরঙ্গ নবায়নের মাধ্যমে অপারেটরদেরকে নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়ে গ্রাহক সেবার মান উন্নত করার জন্য সহায়তা করতে পারে।
এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সঠিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে জনমত গঠন করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহী হবে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কম দামে তরঙ্গ দিলে সরকারের নগদ আয় কমে যাবে। কিন্তু যদি এর প্রভাব সঠিকভাবে বোঝা যায়, দেখা যাবে–স্বল্পমেয়াদি তুলনামূলক কম নগদ আয় এই দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নেবে বহুগুণ। আর ডিজিটাল অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও হবে আরও সুদৃঢ় ও প্রতিযোগিতামূলক যা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আয় বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।