Published : 09 Nov 2020, 07:27 PM
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের হার বিশ্বের অসংখ্য মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। এদের মধ্যে একটি বিরাট অংশের কাছে চার বছর আগে তার জয়ী হওয়াটাও ছিল বিরাট আশ্চর্যের। এমন একটা লোক যার মুখে কোনো লাগাম নেই, যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে, যার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ আছে, মানুষের প্রতি বিশেষত অধীনস্তদের প্রতি তার আচরণ ভয়াবহ রকমের বাজে, যে কিনা সকাল বিকাল গণমাধ্যম আর গুরুত্বর্পূর্ণ ব্যক্তিদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, সে-ই কিনা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্ট!
পশ্চিমা গণমাধ্যমের বদৌলতে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রেসিডেন্টের উপর এক ধরনের পবিত্রতা আরোপ করা থাকে। তাদের সম্মোহনী বক্তৃতার ভূয়সী প্রশংসা থাকে। তাদের কথার উপর ভর করে ইরাকে 'উইয়াপন অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশন' পাওয়া নিয়ে যুদ্ধকেও মহত্তম করে তোলার চেষ্টা হয়। মনে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধই যেন নৈতিক ও জরুরি। অন্য কোনো দেশ বা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটবে ঠিক এর উল্টো।
এগুলো নিয়ে আগেও প্রচুর আলোচনা হয়েছে, সোশাল মিডিয়ার উত্থানের সঙ্গে ট্র্যাডিশনার গণমাধ্যমগুলোর 'ফেইলরের' এ সম্পর্কের কথা এখন হরদম শোনা যাচ্ছে।
আমরা ফিরে আসি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রসঙ্গে। নির্বাচনের আগে নানান জনমত জরিপে আমরা ট্রাম্পের হারের ইঙ্গিত পেয়েছি। বলা হচ্ছিল- করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা রিপাবলিকান প্রার্থীর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফল আমরা পাইনি। ইলেকটোরাল কলেজ ভোট, মানে যে ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্ধারিত হয়, তাতে বিজয়ীর সঙ্গে পরাজিতের পার্থক্য প্রায় গতবারের মতোই। চার বছর আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি পপুলার ভোট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি পেয়েও হেরেছিলেন। এবার জো বাইডেন তো রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন। নির্বাচনের আগে, যখন আগাম ভোট রেকর্ড ছাড়াচ্ছিল, তখনই বলাবলি হচ্ছিল ট্রাম্পের এবার ভূমিধস হার হবে। ট্রাম্প হেরেছেন, তবে পরাজয়টা অতটা একপাক্ষিক হয়নি, যতটা মনে হচ্ছিল। ভোট পেয়েছেন ৭ কোটিরও বেশি। চার বছর আগে এর চেয়েও কম ভোট পেয়ে তিনি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি জনপ্রিয় হিলারিকে হারিয়েছিলেন।
বোঝাই যাচ্ছে, এবার অনেক অনেক বেশি ভোট পড়েছে। যাদের অনেকেই ভোট দিতে চাননি, বা একে দরকার বলে মনেই করেন না তারাও এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডাকযোগে ভোট। এর বাইরে মফস্বলের নারী প্রার্থী ও তরুণরাও ট্রাম্পকে হারাতে বড় ভূমিকা রেখেছেন বলে বুথফেরত জরিপ জানাচ্ছে।
যাই ঘটুক, যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রায় দিয়েছেন। তারা ট্রাম্পকে সরে যেতে বলেছেন। বারবার ট্রাম্পের নামই এখানে আসছে। কেননা, এবং বলাও হচ্ছে, এ নির্বাচনে ভোটাররা বাইডেনের নীতি বা পরিকল্পনায় খুশি হয়ে নয়, ট্রাম্পের অস্থিরতা, অদক্ষতা ও 'উল্টো পথে' চলায় তিতিবিরক্ত হয়ে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ট্রাম্প অবশ্য সহজে হার মানছেন না। নানান গণমাধ্যম বলছে, তার স্ত্রী, মেয়ে, মেয়ের জামাইও তাকে হার মেনে নিতে অনুরোধ করেছেন। যদিও তিনি তাতে গা করছেন না। 'তৃতীয় বিশ্বে'র দেশগুলোতে ভোটের পর আমরা হরহামেশাই যা শুনি, সেই 'ভোটে কারচুপির' অভিযোগ এনে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন। বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এবং 'এস্টাবলিশমেন্ট' তাতে কান দিচ্ছে না। দেওয়ার কথাও না। সারা দুনিয়ায় তারা যেসব বিষয় নিয়ে ছবক দেয়, সেগুলোর মধ্যে উপরের দিকেই আছে- গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব নিয়ে তারা নিয়মিতই অনেক দেশকে হুমকি-ধামকি দেয়, নিষেধাজ্ঞা দেয়, কোথাও কোথাও সরকার ফেলে দেয়, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ক্যু'তে মদদ দেয়। এখন সেইসবের 'চ্যাম্পিয়ন' ভাবমূর্তিতে দাগ লাগতে দেবে কেন তারা? সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব ট্রাম্পের এসব 'আওয়াজ'কে গায়েব করার পথে হাঁটতে হবে তাদের। 'বিদায়ী প্রেসিডেন্টের' সঙ্গে এই বিবাদের মীমাংসা শেষ পর্যন্ত কীভাবে হয়, তা-ই দেখার অপেক্ষা।
২.
বাইডেনের পুরো আমলেই তাকে ট্রাম্পের রেখে যাওয়া 'কাঁটা' পরিষ্কার করে এগোতে হবে। তার সবচেয়ে বড় এক্সিট ওয়ে-ও হবে ট্রাম্প। এমনিতেই আগের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে রানিং প্রেসিডেন্টের তুলনা হয়। কার আমলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্রনীতি কেমন, তার নানামুখী বিচার বিশ্লেষণ চলে।
বাইডেন আর কমলা হ্যারিস তাদের নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ নানান বিষয়ে বারাক ওবামা আমলের নীতি ফিরিয়ে আনা, ট্রাম্পের নেওয়া বিতর্কিত পদক্ষেপগুলো থেকে সরে আসা, নেটোকে শক্তিশালী করা, ট্রাম্প যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিলেন সেগুলোতে ফের যুক্ত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিলেন।
যে কারণে বাইডেন প্রশাসন দ্রুতই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় পুনঃপ্রবেশ, ট্রাম্প যেসব দেশের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিলেন সেগুলো প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। অনেকের আশা, বাইডেন হয়তো ইরান চুক্তিতেও ফের ওয়াশিংটনকে নিয়ে যাবেন।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ওবামাকেয়ার পুনরায় চালু, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় গতি আনা, পুলিশে সংস্কারের দিকেও নজর থাকতে পারে তার প্রশাসনের। এমনকি নানান পণ্যে 'শুল্ক' বসিয়ে মেক্সিকো, কানাডা ও ইউরোপের যেসব দেশগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসন চটিয়ে দিয়েছিল, বাইডেন আর হ্যারিস সম্ভবত সেই পথ থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঝালাই করার, আরও মজবুত করার দিকেই অগ্রসর হবেন।
তবে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেট নিয়ন্ত্রণে না থাকায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু কী করতে পারবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেবল তাই নয়, এবারের প্রতিনিধি পরিষদে এমনকী ডেমোক্র্যাটদের দু'বছর আগেকার মতো মেজরিটিও থাকছে না। বেশিরভাগ রাজ্যের আইনপরিষদ এখনও রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে, কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীলদের অবস্থানও বেশ পোক্ত। অর্থ্যাৎ- বাইডেন প্রশাসনের জন্য অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো সংস্কার করা সত্যিই খুব কঠিন হবে। আবার এটা না করে তার উপায়ও থাকছে না।
বাইডেন শুরু থেকেই বলে এসেছেন, তার প্রশাসনকে মূল কাজই হবে ট্রাম্পের 'বিভাজনের রাজনীতি' উপড়ে ফেলায় হাত দেওয়া। ব্যাপারটা করতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের চটিয়ে দেন কিনা, সেটাও দেখার মতো হবে। আর যদি পরিস্থিতি ওবামা আমলের শেষ দুই বছরের মতো অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে সেনেটে ওবামার যাবতীয় প্রস্তাব আটকে যাচ্ছিল, তাহলে ৭৮ বছর বয়সী প্রেসিডেন্টের জন্য তা কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটা সুবিধা তিনি পাবেন, তা হল পশ্চিমা এবং মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যমের ব্যাপক সমর্থন। শেষ সময়ে এসে ট্রাম্প তার আগেরবারের তুরুপের তাস সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকেও ক্ষেপিয়ে দিয়েছিলেন। এসব প্ল্যাটফর্মকে সামনের দুনিয়াতে এমনিতেই নানান আইনি মারপ্যাচে পড়তে হবে। যেটা বাইডেনকে সুবিধা করে দেবে। আর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সনাতনি 'ক্ষমতা কাঠামো'। ট্রাম্পের মতো কাউকে এনে আবার বিপদে পড়তে, কে-ইবা চাইবে?
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রের এই জটিল হিসাব নিকাশ থেকে উত্তরণের জন্য বাইডেন প্রশাসনকে রিপাবলিকানদের সাথে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। ট্রাম্পের বিরোধিতায় নামা রিপাবলিকানদের একটি অংশ সেটার জন্য মুখিয়েও আছে। নির্বাচনে ট্রাম্প হারার পর দলটির বড় একটি অংশের চুপচাপ অবস্থান এটাও জানান দেয় যে, তারা ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া মুখরা ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এড়াতে চায়।
তবে ব্যাপারটা সহজ হবে না। গত বেশ কয়েকটি নির্বাচনের পপুলার ভোট জানান দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে এখন রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাট ভোটার বেশি। এরপরও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আসেন ইলেকটোরাল কলেজের মারপ্যাঁচে। এসব কারণে ঘাঁটি অঞ্চল ও সুইং স্টেটগুলোতে নিজেদের ভোট ব্যাংককে চটাতে চাইবেন না রিপাবলিকানরা। রক্ষণশীল অংশের কাছে যেসব ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ- চাকরি, কর হ্রাস, ধর্ম, কৃষ্ণাঙ্গ ও বামপন্থিদের উত্থানে ভীতি, বাইডেন যেহেতু এগুলোতেই হাত দিতে চাইবেন, সেক্ষেত্রেও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের চুক্তিতে আসাটা বেশ কঠিন হবে। বাইডেন কর বাড়াবেন বলে অনেকের ধারণা; মহামন্দা, অর্থনীতির নিম্নমুখী প্রবণতা, করোনাভাইরাসের ধাক্কা- এসবের পর করের বোঝা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
অন্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- ট্রাম্পের পাওয়া ৭ কোটি ভোট। গতবার যে কারণে জরিপে পিছিয়ে থেকেও ট্রাম্প বাজিমাত করেছিলেন, তা হল- কলেজ পাস না করা বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন। এ অংশকে ভোটে টেনে আনার কৃতিত্বও ট্রাম্পের। এবং এ নির্বাচনেও দেখা গেছে, তাদের মধ্যে তার সমর্থন কমেনি।
ট্রাম্প সংখ্যাগুরুর রাজনীতি করতে গিয়ে, কিছু বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রকাশ্য করে দিয়েছেন। তিনি বর্ণবাদের কার্ড খেলেছেন; তার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ভিতের উপর আঘাত পড়েছে। দাস ব্যবসায়ীদের মূর্তি ভাঙচুর হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অনেক নায়কের প্রতিকৃতি ধুলায় গড়াগড়ি খেয়েছে, কালি লেগেছে। বাকি বিশ্বের কাছে যেমনই হোক না কেন, সেইসব নায়করা যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের আজকের যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ছিল, সে কারণে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং তার ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পের পরাজয়- (কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান বংশোদ্ভূত নারীর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়া, যাকে আবার ডেমোক্র্যাটদের পরবর্তী কাণ্ডারিও বলা হচ্ছে) সংখ্যাগুরুরা একে ভালোভাবে নেবে কিনা, সেটাও বড়সড় জিজ্ঞাসু হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যা হোক, রাজনীতিতে শেষ বলে যেহেতু কিছু নেই, সুতরাং সামনে কি হবে তা সময়ই বলে দেবে। আমাদের দেখতে হবে, বাইডেন প্রশাসন কিভাবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সেনেট আর রক্ষণশীলদের সুপ্রিম কোর্ট সামলায়- তা।
৩.
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যা-ই হোক না কেন, বাইডেন প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের 'হারানো অবস্থান ফিরে পাবার' চেষ্টা করতে হবে। প্যারিস চুক্তি তো বটেই, জাতিসংঘে নিজের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব আরও বাড়াতেও কাজ করতে হবে তাদের। ইউরোপ ও আমেরিকার পুরনো মিত্রদের আস্থা অর্জন করতে হবে। নেটোকে উজ্জীবিত করতে হবে। এসব করতে হলে তাকে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজেট বাড়াতে হবে।
শেষ টিভি বিতর্কে বাইডেন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে 'ক্লিন এনার্জির' পথে হাঁটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশ্বের জন্য ভালো হলেও এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে একটা বড়সড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। চীনসহ সারা দুনিয়ার অনেকের সঙ্গে ট্রাম্প 'শুল্ক যুদ্ধ' বাধিয়েছিলেন। সেখান থেকে সরে আসাটাও বাইডেন প্রশাসনের জন্য জরুরি হয়ে পড়বে; কিন্তু তাতে তার দেশের অর্থনীতির পরিস্থিতি আবারও মন্দা পরবর্তী গোলকধাঁধায় ঢুকে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প যা করে ফেলেছেন, তাকে পাশ কাটিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া বাইডেন প্রশাসনের জন্য বেশ কঠিনই হবে। ডেমোক্র্যাট এ প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেম থেকে আবারও তেল আবিবে নিয়ে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের আশ্বস্ত করতে চাইবেন কিনা, কে জানে। তেমনটা করলে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ইসরায়েল যে বেঁকে বসবে, তা বুঝতে গণক হওয়া লাগবে না। অবশ্য ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যে ছক কেটেছেন, তা বাইডেনের জন্য শাপে-বরও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে যে দুই রাষ্ট্র নীতিতে অগ্রসর হতে চাইছিল, সেটা এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। ট্রাম্প সেখান থেকে ওয়াশিংটনকে বের করে এনেছেন। রিপাবলিকান প্রশাসনের কাজের ধারাবাহিকতায় ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলোর মিত্রতাও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। বাইডেন সেখান থেকে সরতে চাইবেন বলে মনে হয় না।
ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের সৈন্য গুটিয়ে নেয়ার কাজও এগিয়ে এনেছিল। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ওই অঞ্চলে ইরান, রাশিয়া, হিজবুল্লাহ আর তুরস্কের প্রভাব বাড়ছিল। এই দাবার ছক ফের নিজেদের মতো করে গুছিয়ে আনতে গেলে বাইডেন প্রশাসনকে বেশ বড়সড় যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এ ধরনের আরেকটা যুদ্ধের ধকল সামলানো সম্ভব হবে কিনা, বিশ্লেষকরা সেই প্রশ্নও করছেন।
ট্রাম্পের কারণে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ধরে এক ধরনের বড়সড় সামরিক পরিবর্তন ঘটছিল। মূল লক্ষ্য ছিল, চীনকে চাপে রাখা। বাইডেন সেই পথে হাঁটতে না চাইলে এখানেও ওয়াশিংটনের প্রভাব খর্ব হতে পারে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় মার্কিন মিত্ররা বিপাকে পড়তে পারেন। বাইডেনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নেটোকে শক্তিশালী করে তিনি আগের মতোই রাশিয়াকে কেন্দ্র করে সমর পরিকল্পনা সাজাবেন কিনা। দৃশ্যত, ট্রাম্প যেখান থেকে পিছু হটেছিলেন। সম্ভাবনা আছে, বাইডেন হয়তো চীনকে চাপে রাখার পথ থেকে সরে এসে রাশিয়ার দিকে ফিরবেন। তা হলে, ইউরোপ এবং বিশেষ করে ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে কেন্দ্র করে পুরনো উত্তেজনা বাড়তে পারে। বাড়তে পারে উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, রাশিয়াসহ তথাকথিত মার্কিন-মিত্র নয় বিশ্বের এমন সব দেশের উপর আরও আরও নিষেধাজ্ঞা।
বারাক ওবামা প্রশাসন কিংবা তার আগেরও বেশ কিছু প্রশাসনের নীতি ছিল 'ছদ্ম যুদ্ধের' মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে সুসংহত রাখা। সেক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস। তাদের নীতির কারণেই বিশ্বজুড়ে আল কায়েদা, আইএসের মতো সংগঠনগুলোর রমরমা অবস্থান দেখা গিয়েছিল। এবারও যদি বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্প পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলোর নীতির কাছেই আশ্রয় নেয়, তাহলে এশিয়া না হোক, আফ্রিকাতে এ ধরনের নতুন 'ছদ্ম যু্দ্ধ' শুরু হতে পারে। ক্ষেত্রও অনেকখানি প্রস্তুত।
অদ্ভূত ব্যাপার হল- ট্রাম্পের 'আমেরিকাই প্রথম' নীতিতে এ ধরনের যুদ্ধের সংখ্যা কম ছিল। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ থেকেও তারা অনেকখানি ব্যাক গিয়ারে ছিল। তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোর খরচ মিত্রদের কাছ থেকে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল; তাদের অস্ত্র কিনতে মিত্রদেরকে প্রায় বাধ্য করছিল। বাইডেন এখন কোন আমল থেকে শিক্ষা নিয়ে কী করেন এবং নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় সেটি কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তার উপরও অনেককিছু নির্ভর করবে।
এই ৪ বছর ট্রাম্প কি চুপ থাকবেন? রিপাবলিকান পার্টি যদি শেষমেষ তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তাহলে তো বিপদে পড়বেনই, সঙ্গে বোনাস হিসেবে একের পর এক মামলার জালে জড়িয়ে পড়াটাও অসম্ভব হবে না। আর যদি সেরকমটা না হয়, তাহলে?
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টরা সাধারণত উত্তরসূরীর কর্মকাণ্ড বা চলমান রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন না, এক ধরনের অবসরকালীন জীবনযাপনই করতেন। ট্রাম্পের আমলে ওবামা ওই রীতি ভেঙে ফেলেছেন। আর ট্রাম্পের যা চরিত্র, তাতে তার 'হস্তক্ষেপ' না করে বসে থাকার কথা নয়। 'হেরে যাওয়া' নির্বাচনে পাওয়া ৭ কোটির বেশি ভোটও তাকে সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সংকটের মুহূর্তে আরও প্রভাবশালী হিসেবে হাজির করতে পারে। ৪ বছর পরে তার বয়স হবে, ৭৮। তেমন বয়সে নির্বাচনে দাঁড়াতে তো আর দূরে কোথাও দেখতে হবে না। তিনি যার কাছে হোয়াইট হাউস ছাড়বেন, সে জো বাইডেনের বয়স যে এখনি ৭৮।