Published : 10 Aug 2020, 11:12 PM
মঈদুল হাসানের "মূলধারা '৭১" এক বহুল আলোচিত ও সমালোচিত বই। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর সহযোগী থাকার সুবাদে লেখকের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে এক বিশেষ জায়গা থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেজন্য নিজের সংশ্লিষ্টতার জায়গাগুলোতে একধরনের পক্ষপাত থাকাটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়।
এছাড়া, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের সদস্য হিসেবে সক্রিয় থাকায় তার মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতের সম্ভাবনাকেও লেখক নিজেই হালকা করে দেখেননি। "মূলধারা '৭১" ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, সেখানে লেখক নিজেই তার সীমাবদ্ধতার এ কথাটি উল্লেখ করেছেন। এটি ভালো দিক। ঝামেলা বাধে পাঠের বেলায়, বিশেষ করে যারা লেখকের এই সীমাবদ্ধতাকে আমলে নিতে ব্যর্থ হন। এ ব্যর্থতা কেবল সাধারণ পাঠকের বেলায় ঘটে তা না, ইতিহাসের অনেক পণ্ডিতও এতে আক্রান্ত হন। এমনকি পরবর্তীতে তাজউদ্দীনকন্যা শারমিন আহমেদ রিপি কিংবা আরও অনেকের লেখায় এই "মূলধারা '৭১" বইটি একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। সেজন্য, এই বইয়ের একটা নির্মোহ পাঠ আবশ্যক হয়ে পড়েছে বলে এই প্রবন্ধের সূচনা।
বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ শুরু হয়েছে এভাবে,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দূরবর্তী কারণ অনেক ছিল। এর মাঝে সর্ববৃহৎ কারণ ছিল ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তিকালে- ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগলিক অবস্থানের সকল বিরুদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠন পরিকল্পনার অভিনবত্বে। দ্বিতীয় বৃহৎ কারণ ছিল ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন নানা ভাষাভাষীদের নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের উপযোগী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অন্বেষণে পাকিস্তানি নেতৃবর্গের ব্যর্থতা।
উপরের বাক্য দুটোকে খুব ভালোভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। 'সংগ্রাম' শব্দকে 'আন্দোলন' শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার কারণটি স্পষ্ট নয়। পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে 'সংগ্রাম' শব্দটি এক বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্য হিসেবে পরিত্যক্ত হয় এবং এজন্য জাতীয় সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে দ্বিধা করেনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের মিলিটারি সরকার। তখন 'সংগ্রাম' শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল 'যুদ্ধ' শব্দ দ্বারা। এভাবে বাঙালির হাজার বছরের মুক্তির সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ নামক ৯ মাসের এক ঘটনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। লেখকের অভিপ্রায় অনেকটা যে ওই ৯ মাসের মধ্যেই লুকানো, তা তিনি গোপন করেননি। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি যথার্থই বলেছেন যে,
এই গ্রন্থের আলোচিত সময় ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকাল পর্যন্ত। একাধিক কারণে এই সময়কে একটি অখণ্ড কাল হিসেবে আমি গণ্য করেছি।
তা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন তিনি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম ও ব্যর্থতার পেছনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পেপারে বর্ণিত ব্যাখ্যাকে একমাত্র ব্যাখ্যা বলে গ্রহণ করেন। ওই পেপারে আর যাই থাক, ভারতবর্ষের মূল সংকটটিকে সেখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ভারতবর্ষের মূল সংকটটি হচ্ছে জাতিগত, অর্থাৎ বহুভাষা ও সংস্কৃতি তো বটেই, একই সাথে বিকাশমান বহুজাতির বসবাস এখানে। পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ তথা পুঁজিবাদের বিকাশ। যাহোক, এই বহুজাতি সমূহকে কীভাবে একটি অথবা একাধিক রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া যায়, সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ। লেখক একে সজ্ঞানে আমলে না নিলে কী হবে, অসাবধানতায় মাঝে মাঝে জাতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি তার লেখাতেও এসে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের অভিমত হচ্ছে, বাঙালি জাতির বিকাশকে বুঝতে আমাদেরকে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, যাকে কার্ল মার্কস ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, নিদেনপক্ষে সেখান থেকে শুরু করতে হবে। তারপর ব্রিটিশদের আনুকূল্যে কলকাতা কেন্দ্রিক যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী হিসেবে নগর কলকাতা শুরু থেকে এক ধরনের কসমোপলিটন আদল পেলেও এখানে ভারতবর্ষের সকল জাতির জন্য সমবিকাশের পথটি উন্মুক্ত ছিল না, থাকার কারণও নাই। কারণ, নতুন হলেও শহরটি বাঙলা ভাষাভাষীদের শহর। কিন্তু তা হলে কী হবে, শুরু থেকেই বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি পুঁজি বিকাশের স্বাভাবিক রাস্তাকে পাশ কাটাতে চেয়েছে, অথবা পাশ কাটিয়ে গেছে। ফলে একদিকে পূর্ব বাঙলার কৃষক যেমন মধ্যবিত্ত হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে গেছে, অপরদিকে বিকাশমান বাণিজ্য ও কলকারখানার মালিকানা চলে গেছে অবাঙালিদের কাছে। এমনকি একসময়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী, সেখানেও বাঙালিরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে। কলকাতার বাবু কালচার এখানে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল কিনা, সেটা এক প্রশ্ন হলেও আমাদের আলোচনা সেদিকে নিয়ে যাবো না। তবে, বিষয়টি সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে পূর্ব বাঙলার সাধারণ মানুষের অবস্থান এবং পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে আলাদা হয়ে পৃথক রাষ্ট্র গড়ার পক্ষে পূর্ববঙ্গবাসীদের আগ্রহটিকে ব্যাখ্যা করা সহজ হবে। নামে পাকিস্তান হলেও পূর্ব বাঙলার মানুষ যে একটি স্বশাসিত রাষ্ট্র পেতে যাচ্ছে, সেটি লাহোর প্রস্তাবে যেমন ছিল, তেমনি পরবর্তীকালে এখানকার প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মূল লক্ষ্যটিও ছিলো এই স্বশাসন অর্জন করা।
এই ইতিহাসটি মনে রাখলে ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমকালে, লেখক যেমনটি বলছেন, অর্থাৎ ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগলিক অবস্থানের সকল বিরুদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠন পরিকল্পনার মধ্যে কোনও অভিনবত্ব আবিষ্কারের বদলে সেখানে বাঙালি জাতির মুক্তির স্বপ্নটিকে লুকায়িত দেখতে পেতেন। স্বপ্নের এই জায়গাটি অস্বীকার করার আরেক অর্থ আমাদের পূর্ববর্তী সকল আন্দোলন ও তার সাথে সম্পৃক্ত নেতৃত্বকে মূর্খ মনে করা। এটা ঠিক যে, পাকিস্তানে বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে; কিন্তু বহুজাতির সমন্বয়ে গঠিত যুক্তরাষ্ট্রীয় ধারণাটিকে আর যাই হোক, অভিনব বলার সুযোগ নাই। ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগলিক অবস্থানের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বিশ্বের বহুদেশ কনফেডারেশন করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া তো বটেই, এখনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আড়ালে তেমন কনফেডারেশন গঠনের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ভারতবর্ষে এই কনফেডারেশনটাই ঠিকমতো গড়া হয়নি- না ভারতে, না পাকিস্তানে। এর বিপরীতে লেখকের ভাষা ধার করে বলা যায় যে, "একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের উপযোগী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অন্বেষণে" পাকিস্তানি নেতৃত্ব কেবল না ভারতবর্ষেই নেতৃত্বও ব্যস্ত ছিল এবং এখনও আছে। ফেডারেশন হচ্ছে অনেক জাতির সম্মেলনকেন্দ্র, তাকে এক জাতি হতে হবে কেন? কিন্তু পাকিস্তান যেমন, তেমন করে ভারতও একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের অভিপ্রায় দ্বারা তাড়িত। সেজন্য ব্রিটিশ থেকে মুক্ত হওয়ার ৭৩ বছর পার হলেও ভারতকে এখনও জাতিগত সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। পাকিস্তানকেও করতে হচ্ছে। বিকাশমান জাতিগুলো তাদের স্বপ্নের পথে রক্ত ঢেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের সৌভাগ্য বলতে হবে যে, এই ভূমিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পেরেছে।
ইতিহাসকে দেখা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির এই অস্বচ্ছতা কেবল দূরবর্তী সময়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা লেখকের আলোচিত সময়ের উপরেও প্রভাব ফেলেছে। প্রথম অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তিনি লিখছেন:
জানুয়ারি বা সম্ভবত তার আগে থেকেই যে সমর প্রস্তুতির শুরু হয়েছিল তার অবশিষ্ট আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ধূম্রজাল বিস্তার করা হয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুগপৎ সন্দিহান ও আশাবাদি থাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পক্ষে আসন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে যথোপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত একই কারণ ২৫/২৬ শে মার্চের মধ্যরাতে টিক্কার সমর অভিযান শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বাধীনতার সপক্ষে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠতে পারেননি। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী যারা তার সাথে দেখা করেছিলেন, তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েও তাদের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিব রয়ে যান নিজ বাসভবনে। সেখান থেকে গ্রেফতার হন হত্যাযজ্ঞের প্রথম প্রহরে। কিন্তু যেভাবেই হোক, ঢাকার বাইরে এ কথা রাষ্ট্র হয়ে পড়ে যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন এবং পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দান করে চলেছেন। সম্ভবত তিন সপ্তাহাধিক কালের অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ারে বাংলার সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় এমন এক মৌল রূপান্তর ঘটে যে, পাকিস্তানিদের নৃশংস গণহত্যা শরু হওয়ার সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি আক্রমণের সাথে সাথে অধিকাংশ মানুষের কাছে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ঘোষণা হয়ে ওঠে এক অভ্রান্ত পথ-নির্দেশ।
এ ধরনের উপসংহার ভ্রমাত্মক। কিন্তু পরবর্তীতে লেখক তার পুরো সময় ব্যয় করেছেন এই ভ্রমাত্মক উপপাদ্যকে সঠিক প্রমাণের কাজে। ইয়াহিয়ার যুদ্ধ প্রস্তুতির বিপরীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমান্ড প্রস্তুতিহীন থাকলে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হওয়ার ২ দিনের মাথায় প্রথমে বুড়িগঙ্গার ওপারে এবং পরে মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে আওয়ামী লীগের এবং ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে হাজির হতে পারতেন না। এমনকি রেহমান সোবহানের মতো আপাত নিরীহ অর্থনীতির অধ্যাপকের পক্ষেও দিল্লি হাজির হওয়া সম্ভব হতো না। ডক্টর কামাল হোসেনের মতো দ্বিধা থাকলে তাদের কেউ কেউ যে ধরা পড়তেন, ধরা পড়লে যশোরের আওয়ামী লীগ নেতা মশিউর রহমানের মতো কেউ কেউ যে মিলিটারির হাতে নিহত হতেন, তাতে সন্দেহ পোষণ করার কোনো কারণ নাই। আওয়ামী লীগের অনেকে তেমন প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত না থাকলে কী হবে, বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষ নেতৃত্ব, ভারত সরকার এবং ছাত্রলীগের প্রস্তুতি ছিল বহুবছর আগে থেকে। ৩ মার্চে পল্টনে ছাত্রলীগের সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ সেই প্রস্তুতির এক অংশ, যা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভের পরে লন্ডন ঘুরে আসার পরে। তার পরপরই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ভারতে গিয়ে মিলিটারি ট্রেনিং লাভ করার ঘটনা ঘটে। সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে ভারতের সবুজ সংকেত না পেলে এবং ছাত্রলীগের বাছাইকৃত ছেলেদের এক বছরের অধিক সময়জুড়ে ভারতের মাটিতে গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ট্রেনিং দেওয়া সম্ভব না হলে ইয়াহিয়া খানের শর্ত মেনে ছয় দফায় কিছু কাটছাঁট করে আওয়ামী লীগকে যে সরকার গঠন করতে হতো, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। তা তারা করতে পারতো এবং আবুল মনসুর আহমদের মতো প্রাক্তন নেতা তো বটেই, নির্বাচনে জিতে আসা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা সেটাই আশা করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন দ্বিধাহীন; সেজন্য আপসের সকল সুযোগকে তিনি দু'পায়ে ঠেলে দিয়েছেন। মঈদুল হাসানের কাছে এই তথ্য হয়তো ছিল না; কিন্তু তার বইয়ে ছাত্রলীগের সেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের হাতে তৈরি বিএলএফ বা মুজিববাহিনী নিয়ে মন্তব্য আছে; সেক্ষেত্রে এই বাহিনীর জন্মের পটভূমিটা যদি আরেকটু খোঁজখবর নিয়ে তিনি জানার চেষ্টা করতেন, তাহলে তিনি নিজে যেমন বিভ্রান্তিতে ভুগতেন না, তেমনি পাঠকদেরও মহাবিভ্রান্তিতে ফেলার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হতেন।
ইতিহাসের লেখকরা বঙ্গবন্ধুর সেই লন্ডন সফর এবং সেখানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে তার আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে বলে আশা করি, তা না হলে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব (অথবা মৃত্যু) বরণকে ইতিহাসের পাঠকরা বুঝতে সক্ষম হবেন না। লেখক মঈদুল হাসান তো বটেই, আরও অনেকের আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তকে হয় হালকাভাবে নেওয়া হয়েছে, তা না হলে পরিহাস করা হয়েছে।
আমাদের বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনে এটি ছিল সবচেয়ে আবেগহীন এবং ঠাণ্ডা মাথার সিদ্ধান্ত। এরপরে আসবে যথাক্রমে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পরে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে বিরতি নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের দিনক্ষণ ঠিক করার সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ভারতবর্ষকে ঘিরে রচিত ব্রিটিশ ও মার্কিন পরিকল্পনার বিপরীতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে হিন্দুত্ববাদ ও ইসলামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে এবং সেই আবর্তনে দুই দেশ পরষ্পরকে শত্রু মনে করে অস্ত্রবাজি করবে। এভাবে সদ্য স্বাধীন দুটো দেশ হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাণিজ্যের এক চমৎকার ঠিকানা। সেখানে ইউরোপিয় রেনেঁসার আদলে বাংলাদেশে সম্পূর্ণভাবে ভাষা ও সংস্কৃতি নির্ভর একটা জাতির জন্ম ও বিকাশ ঘটলে তা অস্ত্রব্যবসার বিজনেস মডেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করাই কেবল নয়, একই সাথে এশিয়ায় নতুনভাবে একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম ভারতবর্ষের তো বটেই বিশ্বের নানাপ্রান্তে এমনতর জাতীয়তাবাদী আকাঙক্ষা উসকে দেবে, এই হিসাবটাও ব্রিটিশ বা মার্কিনদের জানা ছিল। সেজন্য, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে ঘিরে বিশ্বের নয়া বাস্তবতা বুঝতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং সেখানকার বিরোধীদলীয় নেতার সাথে মিলিত হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কী হতে পারে? পাকিস্তানের কারাগার থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে তখন পর্যন্ত তার সহকর্মীদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। ভুট্টো অথবা অন্যকোনো সূত্র থেকে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবরটা তার কানে যাওয়াটা অসম্ভব না; কিন্তু সেই সরকারের কোনো প্রতিনিধির সাথে তখন পর্যন্ত ব্রিটিশ বা মার্কিন কর্তৃপক্ষের কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি হয়নি, তেমন কোনো খবর জানার মতো অবস্থা বা সুযোগ তার ছিল না। অপরদিকে ভুট্টোর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে ইরানে যাওয়ার অথবা ইরানের শাহের পাকিস্তান আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ আসছিল। সেসব উপেক্ষা করে এককভাবে লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ২৬ মার্চে বন্দিত্ব বরণের মতোই ছিল সুদূরপ্রসারী। একই কথা বলা যায়, ফেরার পথে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধ রাখার বেলায়। লন্ডনে যাত্রা বিরতিকালে টেলিফোনে ঢাকায় তার সাথে অনেকেরই কথা হয়। কাজেই তেমন কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে ইন্দিরা গান্ধী বরাবর ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে, সেটিকে তার একক সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর লন্ডন গমন এবং দিল্লিতে যাত্রাবিরতিতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মিলিত হওয়ার এই দুই সিদ্ধান্তের পেছনে আর যাই থাক, মুজিবনগর সরকারের কোনো প্রভাব আবিষ্কার করা যাবে না। তেমন চেষ্টা এযাবৎ কেউ করেছে বলে আমাদের জানা নাই।
"মূলধারা '৭১" বইয়ে মোটা দাগে যে সমস্যাগুলো চোখে পড়ে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা। ইচ্ছাকৃত কিনা জানি না, তবে এখানে একটা ধূম্রজালের সৃষ্টি করা হয়েছে। বইয়ের সূচনায় গেঁথে দেওয়া ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত ইন্ডিপেন্ডেন্স অর্ডারের ৭ নম্বর প্যারাগ্র্যাফে খুব পরিষ্কারভাবে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণার রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসের এই সত্যকে বিতর্কিত করতে নানা ব্যক্তিগত গল্প হাজির করা হয়েছে। ইতিহাসের পাঠক যদি বইটি প্রকাশের সময়কালকে (১৯৮৫) মাথায় রেখে বইটি পড়েন, তাহলে এই ধূম্রজালের পেছনে আরও অনেক রথি-মহারথিদের আবিষ্কারে সক্ষম হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ছাত্রলীগ এবং বঙ্গবন্ধু- এই দুই স্তম্ভকে আড়াল করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মুজিবনগর সরকারকে বিতর্কিত করার একটা চেষ্টা দৈনিক বাংলা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যে সক্রিয় ছিল স্বাধীনতার পর থেকেই। তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে গোপনে ভারতের সাথে করা চুক্তির কেচ্ছা বলা, কিংবা মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল, সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি) জিয়ার নামে 'একটি জাতির জন্ম' শিরোনামে প্রবন্ধ ছাপানো থেকে শুরু করে চীনপন্থি লেখকদের হাতে ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ ঘটানোর কার্যক্রম বস্তুত ৭২-৭৩ সালেই শুরু হয়। বিচিত্রা সরকারি পত্রিকা হলে কী হবে, তার সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরী ছিলেন একজন চীনপন্থি মুক্তিযোদ্ধা এবং সে কারণে ২ নম্বর সেক্টরে হাজির হওয়া ঢাকার তরুণদের মধ্যে বেছে বেছে রাশেদ খান মেননের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের প্রতি পক্ষপাত এবং ছাত্রলীগ বা মতিয়া চৌধুরীর ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন কোনও গোপন বিষয় ছিল না। পেশাদার সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, দৈনিক বাংলা বা বিচিত্রা কেবল নয়, বাংলাদেশের কোনো পত্রিকা সেটা অনুসরণ করতে পারেনি। পক্ষপাতদুষ্টতার এই রেশ স জায়গায় দেখা যায়। হয়তো সে কারণে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় কয়েক খণ্ডের দলিলপত্র প্রকাশিত হলেও খুব সচেতনভাবে সেখানে ছাত্রলীগ, মুজিববাহিনী এবং এপ্রিলের শুরুতে জিঞ্জিরায় সংগঠিত পাকিস্তানি গণহত্যাকে সম্পূর্ণভাবে গায়েব করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ অনেক কান্নাকাটি করেও তাঁদের মন ভেজাতে পারেননি।
নি:সন্দেহে মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক বহুমাত্রিক ঘটনা। আওয়ামী লীগ তাকে এককভাবে দখল করার চেষ্টা করেছে- দৈনিক বাংলা কেন্দ্রিক চীনপন্থী এ মহল থেকে বরাবরই এমন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। অথচ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সংগঠিত ঐতিহাসিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, বঙ্গবন্ধুকে সুপ্রিম লিডার মেনে স্বাধীনতার প্রশ্নে এককভাবে এগিয়ে যাওয়া- এসবকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতার কোন চিত্রটি তারা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল? চীনপন্থিদের এই হীনমন্যতার একটা ছায়া মঈদুল হাসানের লেখার মাঝে দেখা যায়, অথচ রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন মস্কোপন্থি।
বইটির নাম রাখা হয়েছে "মূলধারা '৭১"; তাতে কেউ আপত্তি করবে না। আরও অনেক ধারার মধ্যে এই ধারা কীভাবে মূলধারা হয়ে উঠতে পারলো, তার সপক্ষে একটা ব্যাখ্যা থাকা দরকার ছিলো। তা তো নাই-ই, বরং মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় অন্য আরও যেসব ধারার জন্ম হয়েছিল, এই বইয়ে সেসব ধারা যে ধরনের অবহেলা বা বিষোদগারের শিকার হয়েছে, তাতে বইটির নাম 'একমাত্র বৈধধারা ৭১' হলে আরও ভালো হতো। মুক্তিযুদ্ধের সূচনার একটা চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যাবে লতিফুল কবিরের লেখা 'মেহেরুন' উপন্যাসে।
সেখান থেকে উদ্ধৃতি করছি: "গ্লেসিয়ারে বরফ গলে যেখানে নদীর সূচনা হয়, সেখানে একসাথে অনেকগুলো স্রোতের সূচনা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। নানা ধারায় আলাদা-আলাদা পথ রচনা করে নানা নামে তারা এগিয়ে চলে। কোনটি প্রধান ধারা হয়ে উঠবে, সূচনায় সেটা স্পষ্ট থাকে না। কানাডার আলবার্টা প্রদেশে কলম্বিয়া আইসফিন্ড তেমনি এক গ্লেসিয়ার, যেখান থেকে তিনটি ধারায় তিন নদী তিন মহাসাগরে যাত্রা করেছে- অতলান্তিক, প্রশান্ত এবং আর্কটিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা অনেকটা পাহাড়ের চূড়ার সেই গ্লেসিয়ারের মতো। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আকাঙক্ষায় তেইশ বছরের জমাটবাঁধা বরফ পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ছিটকে বেরিয়ে আসে পঁচিশে মার্চ রাতে। জনআকাঙক্ষা আর পাকিস্তান মিলিটারির গণহত্যা- এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় জন্ম নেয় কয়েকটি ধারা। আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সফিউল্লাহ-খালেদ মোশাররফ প্রমুখ বাঙালি সেনা অফিসারদের বিদ্রোহ, শেখ ফজলুল হক মণি ও সিরাজুল আলম খানের যুব-নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীন বাংলাদেশ-মুখী সংগ্রাম, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়ভাবে সংগঠিত প্রতিরোধ- এসব নানা ধারায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় মার্চের মাসব্যাপী পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের গর্ভে। বিদ্রোহী সেনা অফিসারেরা তাজউদ্দীন ঘোষিত সরকারের সাথে একাত্ম হয়ে গেলে এপ্রিলের ১৭ তারিখে সেটা প্রধান ধারারূপে আত্মপ্রকাশ করে। দ্বিতীয় প্রধান ধারাটি ছিল 'বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফ'; অপর নাম 'মুজিব বাহিনী'। এর বাইরে দৃশ্যমান ছোট ছোট ধারা ছিল দেশজুড়ে। মান্নান ভূঁইয়া, সিরাজ শিকাদার, কাদের সিদ্দিকী, হেমায়েত- এগুলো উল্লেখযোগ্য ছোটধারা। এঁদের পথ আলাদা, কিন্তু বুকে একটাই স্বপ্ন- বাংলাদেশ।"
"মূলধারা '৭১" বইটি লেখার সময়কাল হিসেবে ১৯৭২ সাল বলা হলেও সেটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। ততদিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বদানকারী মূল নেতারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। কেবল তাই না, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ নেওয়া মুজিবনগর সরকার এবং তার ধারবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানের আওতায় নির্বাচিত ১৯৭৩ সালের সরকারের অনুসৃত অনেক নীতি পরবর্তীতে জিয়া ও এরশাদের মিলিটারি সরকার বাতিল করে। তাজউদ্দীন আহমদ সূচিত তথাকথিত মূলধারার পেটে লুকিয়ে থাকা চীনপন্থি উপধারাটি যে ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের পরে আংশিকভাবে এবং একই বছর ৭ নভেম্বরের পরে পুরোপুরি বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়, বইটি সম্পাদনার সময় সেই বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিকাতরতা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে মূলধারার পেটে লুকিয়ে থাকা চীনপন্থি ধারাটি এই বইয়ের প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠতে পারতো এবং সেটিই হতে পারতো কৌতুহলী পাঠকদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। নিঃসন্দেহে এই বই নিয়ে বিপুলসংখ্যক পাঠক আগ্রহ দেখিয়েছে; তবে, মূলধারার অন্তর্গত উপধারা সমূহ জানানোর পরিবর্তে নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু যে কতোটা ব্যর্থ এবং সেই ব্যর্থতার বিপরীতে তাজউদ্দীন আহমদ যে কতটা সফল, সেই জানানোটাই মূখ্য উপজীব্য হয়ে উঠেছে। কেবল তাই না, মূলধারার বাইরে অন্যধারাগুলো যে কতটা অন্যদেশের, বিশেষত ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনী কর্তৃক প্রভাবিত, সেটিও মূখ্য হয়ে উঠেছে। এতে করে ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে সৃষ্ট জাতীয়তাবাদী দলে বিলুপ্ত হওয়ার রোমাঞ্চকর কাহিনীর নানা মিসিং লিংক পাওয়ার হাত থেকে পাঠক বঞ্চিত হয়েছে।
বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছে পাকিস্তানি মিলিটারির ক্র্যাকডাউনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে। পড়লে মনে হবে ২৫ মার্চের আগে দেশ ছিল একেবারে শান্ত। ১৯ মার্চে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গলের বিদ্রোহ কিংবা ২৩ মার্চে নওগাঁয় আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা (পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য) আবদুল জলিল এবং ইপিআর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের নেতৃত্বে ইপিআর-এর ৭ নম্বর সেক্টরের বিদ্রোহ পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে। ২৩ মার্চে পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে নওগাঁর ওই আক্রমণের পেছনে বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন ছিল মর্মে আবদুল জলিল এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন। যাহোক, মেজর নাজমুল হকের ওই সাহসী পদক্ষেপের ফলে নওগাঁ তো বটেই, বগুড়া এবং রাজশাহীর বিস্তৃত এলাকা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাঙালিদের দখলে ছিল। মেজর নাজমুল সেপ্টেম্বরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন; কিন্তু তা সত্ত্বেও অজ্ঞাতকারণে তাকে পদকবঞ্চিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনায় ১৯ কিংবা ২৩ মার্চ চেপে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে তা আমাদের জানা নাই। তবে, সচেতন পাঠক এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের চতুর্থ প্যারাগ্রাফ পড়তে গিয়ে যে হোঁচট খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। পাঠের সুবিধার জন্য সেখান থেকে উদ্ধৃতি করছি:
অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, বেপরোয়া গোলাগুলি ও অগ্নি-সংযোগের মুখে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী এবং সশস্ত্রবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালিরা তো বটেই, বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষও নিরাপত্তার সন্ধানে শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে শুরু করে, প্রথমে হাজারের অঙ্কে, পরে লক্ষের- বিরামহীন, বিরতিহীন। এমনিভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক বিরোধ ও গৃহযুদ্ধের সাথে ভারত ক্রমশ জড়িত হয়ে পড়ে এই ভীত সন্ত্রস্ত শরণার্থীদের জোয়ারে।
আচ্ছা, তাহলে লেখকের কাছে বিষয়টা আর মুক্তিযুদ্ধ থাকছে না, হয়ে পড়ছে- 'আঞ্চলিক বিরোধ এবং গৃহযুদ্ধ'। বাংলাদেশকে ঘিরে পাকিস্তানি মনোভাবটাও কিন্তু সেটাই। বাংলাদেশের জন্মকে ঘিরে পাকিস্তানে যত বই প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বরাবরই এক গৃহযুদ্ধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। মঈদুল হাসান তাতে যুক্ত হলেন কোন খেয়ালে বা কার ইচ্ছাপূরণের গুটি হিসেবে, সেই খতিয়ান একদিন নিশ্চয়ই জানা যাবে। তবে, ইতিহাস বয়ানের এই দুর্বলতার কারণে বিশ্বের বুকে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাঙালির অভ্যুদয়ের ইতিহাসটা যে হারিয়ে যায়, সেটাই দু:খজনক। বিশ্বের বুকে যেকোনও ভাষা ও সংস্কৃতির জন্মের পেছনে থাকে হাজার বছরের ইতিহাস। সেই ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে একটা জনগোষ্ঠী যখন স্বাধীন জাতি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়, তখনই কেবল সেই জাতির পূর্ণাঙ্গ মুক্তি আসে। সেই হিসেবে এশিয়ায় বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জন্ম এক অভিনব বিষয় বলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে। তবে তাকে কোনোভাবেই কোনও দেশের আঞ্চলিক বিরোধ বা গৃহযুদ্ধের ফসল হিসেবে গণ্য করা চলে না।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের আরেক সরলীকরণ অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে পাকিস্তানি মিলিটারিতে কর্মরত বাঙালি সেনা কিংবা ইপিআর বাহিনীর বিদ্রোহ নিয়ে করা মন্তব্য। লেখক বলছেন:
বিদ্রোহ ঘোষণার সাথে সাথে পাকিস্তানি বাহিনী সীমান্ত পর্যন্ত এমনভাবে এদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় যে, এদের জন্য পাকিস্তানে ফিরে আসার পথ সম্পূর্ণ রূদ্ধ হয়। হয় কোর্ট মার্শাল নতুবা স্বাধীনতা- এই দুটি ছাড়া অপর সকল পথই তাদের জন্য বন্ধ হয়ে পড়ে।" (৬ষ্ঠ প্যারাগ্রাফ)।
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে ধরা পড়া সেনাকর্তা বা সৈনিকদের মধ্যে কয়জনের কোর্টমার্শাল হয়েছিল? একটা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। শমশের মবিন চৌধুরী ছিলেন মেজর জিয়ার অষ্টম ইস্টবেঙ্গলের তরুণ সেনাকর্তা (সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট), চট্টগ্রাম বিদ্রোহের পরে এপ্রিলের শুরুতে সম্মুখযুদ্ধে তিনি পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে ধরা পরেন। তারপর পুরো ৯ মাস তাকে বন্দি করে রাখা হলেও কোনো ধরনের কোর্ট মার্শালের মুখে পড়তে হয়নি। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। যুদ্ধে পাকিস্তান মিলিটারিতে কর্মরত আনুমানিক ৩০ হাজার বাঙালি সেনার মধ্যে মাত্র ১০ হাজার বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেয়, বাকি ২০ হাজারের অনেকে পশ্চিম পাকিস্তানে, অনেকে এই যুদ্ধরত বাংলাদেশেই অবস্থান করে এবং কেউ কেউ পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়। কাজেই পাকিস্তানি জেনারেলদের কাছে মেজর পদমর্যাদার দশ-বারোজন বিদ্রোহী সেনাকর্তা এবং খুবই সামান্য আর্টিলারি সাপোর্ট যে তেমন গুরুত্ব পাওয়ার কথা না, এটা জানতে সমরপণ্ডিত হতে হয় না। তাদের মূল আশঙ্কা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং একইসাথে বেসামরিক বাঙালি বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী দ্বারা গঠিত মুজিববাহিনী নিয়ে। ২ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর এ টি এম হায়দারের হাতে গঠিত হওয়া গেরিলা বাহিনীর বাইরে সারাদেশে গেরিলাদের সরবরাহ লাইনটা বজায় রাখা হতো ছাত্রলীগের প্রায় ত্রিশ হাজার সদস্য নিয়ে গঠিত বিএলএফ বা মুজিববাহিনী হতে। গেরিলারা সফল হলে ভালো, তখন তারা পালিয়ে নিজেদের বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু ব্যর্থ হলে রক্ষা ছিল না। ইতিহাস সাক্ষী, পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে ধরা পড়া গেরিলাদের কেউ-ই জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি।
এবার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১ নম্বর প্যারাগ্রাফটি পড়া যাক, কারণ এখান থেকেই ইতিহাস বিকৃতির শুরু। তিনি লিখছেন:
২৫ শে মার্চের সন্ধ্যায় যখন পাকিস্তানি আক্রমণ অত্যাসন্ন, তখন শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে ঢাকারই এক শহরতলীতে আত্মগোপন করার নির্দেশ দেন যাতে শীঘ্রই তারা পুনরায় একত্রিত হতে পারেন। তারপর একনাগারে প্রায় তেত্রিশ ঘন্টা গোলাগুলির বিরামহীন শব্দে তাজউদ্দীনের বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি- যে অনুমানের ভিত্তিতেই তাকে শহরতলীতে অপেক্ষা করতে বলা হয়ে থাকুক, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তরুণ সহকর্মী আমিরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ২৭ শে মার্চ ঢাকা ত্যাগের আগে দলের কোনো নেতৃস্থানীয় সদস্যের সাথে আলাপ পরামর্শের কোনো সুযোগ তাজউদ্দীনের ছিল না।
নানাজনের লেখায় বুড়িগঙ্গার ওপারে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নানান বয়ান পাওয়া যায়। এরমধ্যে ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের বয়ান যেমন আছে, তেমনি আছে কবি নির্মলেন্দু গুণের বয়ান। খসরু কিংবা মোস্তফা মহসীন মন্টুর বয়ানও কম গুরুত্বপূর্ণ না। বুড়িগঙ্গার ওপারে তাজউদ্দীন আহমদের সাথে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুল মালেক উকিল, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজের একত্রিত হওয়া এক ঐতিহাসিক ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর খোঁজে শেখ ফজলুল হক মণির তৎপরতাটা ছিল সবচেয়ে বেশি এবং বঙ্গবন্ধু যে ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে সরে পড়েননি বা সরে পড়তে ব্যর্থ হয়েছেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরেই নেতারা ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাহোক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বুড়িগঙ্গার ওপারে শীর্ষ নেতাদের এই মিলিত হওয়ার ঘটনা লেখক মঈদুল হাসানকে খুব কুশলতার সাথে চেপে যেতে হয়েছে। কিন্তু এতে করে ইতিহাস বিকৃতির যে দরজা তিনি খুলে দিয়েছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্বয়ং তাজউদ্দীন আহমদ। এই বিকৃতির উপর দাঁড়িয়ে তাজউদ্দীন আহমদকে যে তিনি এক অনন্য কৃতিত্বে ভাসাতে চেয়েছেন, তা আর গোপন থাকেনি। কিন্তু কেন? সেটা কি এজন্য যে, এই শীর্ষ নেতাদের সাথে মিলিত হওয়া সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমদ কর্তৃক নিজেকে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্তটিকে জাস্টিফাই করা। মূলত, তাজউদ্দীন আহমদের এই সিদ্ধান্তটি নিয়েই দলে বিতর্ক তৈরি হয় এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের উদ্যোগে তার একটা ফয়সালা হওয়ার আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। কিন্তু পুরো বই পড়লে মনে হবে যে, এটি ছিল শেখ ফজলুল হক মণি বনাম তাজউদ্দীন আহমদ বিতর্ক। বঙ্গবন্ধু যে কার্যত পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে ২৬ মার্চ রাত সাড়ে দশটা থেকে বন্দি সেই খবর আওয়ামী লীগ তো বটেই বিশ্ববাসীর কাছে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত অজানা ছিল। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছেন অথবা গোপনে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে দিচ্ছেন- এই দুই খবরই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু বইটি পড়লে যে কেউ এ ধারণা করতে বাধ্য হবে যে, বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়া সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বা ছাত্রলীগের আর কেউ কিছু না জানুক তাজউদ্দীন আহমদ অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন।
তৃতীয় অধ্যায়টি আগের অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা মাত্র, সেখানে ছত্রে ছত্রে বিদ্রোহী সেনাদের সাথে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার বয়ান। এখানে যে ধরনের সমন্বয় প্রত্যাশা করা হয়েছে, তাকে এক কথায় অভাবনীয় বললে দোষ হবে না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের বিদ্রোহী সেনাদের সহযোগিতা করতে সীমান্তে ট্যাংক, আর্টিলারি, অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে অপেক্ষা করবে- এমন ধরনের ভাবনা কীভাবে আসে? বাস্তবতা তো সে কথা বলে না। বাংলাদেশে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোর মধ্যে একমাত্র দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের কমান্ডার ছিলেন একজন বাঙালি কর্নেল। তিনি বিদ্রোহে আগ্রহী ছিলেন না। শুধু তাই না, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে অগাস্ট মাসে তিনি করাচি হাজির হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও সেখানে সেকেন্ড-ইন কমান্ড মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়। মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ছিল মর্মে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সেকেন্ড-ইন কমান্ড জিয়ার সাথে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ না থাকলেও ইবিআরসির প্রধান কর্নেল এম আর চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ ছিল এবং সেকারণে ২৫ মার্চ রাতেই তাকেসহ আরও পাঁচশ-রও বেশি ক্যাডেটকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সাথেও যোগাযোগ ছিল যাকে ২৫ মার্চের ৩ দিন আগে একপ্রকার গৃহবন্দি করে পাকিস্তান মিলিটারি এবং পরে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে করাচি হাজির করা হয়। কাজেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সাথে সেনাকর্তাদের ব্যাপকভিত্তিক যোগাযোগের ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারতো। আবার বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং তারা দলে দলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে এমন- আশঙ্কা পাকিস্তানি জেনারেলদের থাকলে তাদের প্রস্তুতি ভিন্নরকমের হতো। মূলত এই প্রস্তুতির অভাবে প্রথম দিকে দেশের অনেক অঞ্চল পাকিস্তানি মিলিটারির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও ২ ডিভিশন সৈন্য আনার পরে এপ্রিলের শেষ নাগাদ পুরো দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। এ কে খন্দকারের মতো অনেকে ঠিক এই জায়গা থেকেই গালগল্প বলার মসলাটা জোগাড় করেন এবং কোনো ধরনের আর্টিলারি সাপোর্ট ছাড়াই পাকিস্তান মিলিটারিকে পরাস্ত করার এক দিবাস্বপ্ন দেখেন- নিজে দেখেন এবং জাতিকে দেখাতে চেষ্টা করেন। কনভেনশনাল যুদ্ধের ধারণা কেবল এ কে খন্দকার একা না, প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর মধ্যেও পুরোপুরি ক্রিয়াশীল ছিল। সেজন্য একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করেছেন ব্রিগেড গঠনের কাজে।
যুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বিদ্রোহী সেনাদের সহযোগিতা করতে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের পরিণতি কী হতে পারতো, সে সম্পর্কে চমৎকার আলোচনা আছে চতুর্থ অধ্যায়ে। তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত প্রত্যাশা এই আলোচনার একেবারে বিপরীত। মূলত, যুদ্ধের শুরুতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্মোহ আচরণে ক্ষুব্ধ আমাদের বিদ্রোহী সেনাদের মননে মলম দেওয়া ছাড়া এই অধ্যায়টি আর কোনো কারণে লেখা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। যাহোক, চতুর্থ অধ্যায়ে এসে বইটি বাস্তবতায় ফিরে আসে। পাকিস্তানের মিলিটারি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের অনুরূপ একটা যুদ্ধবিরতি, তাহলে শরণার্থীদের চাপে ভারত অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়তো, আর বাঙালির স্বাধিকারের স্বপ্নও চিরতরে থেমে যেতো। এই লক্ষ্যপূরণে পাকিস্তান বেছে নিয়েছিল এথনিক ক্লিনজিংয়ের পথ, যেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা হয়ে পড়েছিল মূল টার্গেট। কাজেই, ভারতের দিক থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য ভালো একটা সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সেজন্য ডিসেম্বরকে টার্গেট করে ইন্দিরা গান্ধী তার পরিকল্পনা সাজাতে থাকেন। এখানে মুজিবনগর সরকারের আওতায় গঠিত মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে গঠিত বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) বা মুজিববাহিনীকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার নিখুঁত ছকটি আঁকা হয় এবং যাকে যতটুকু অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার দরকার তাই দেওয়া হয়। প্রচলিত যুদ্ধের নিয়ম মেনে মুক্তিবাহিনী অথবা গেরিলাযুদ্ধের নিয়ম মেনে মুজিববাহিনী এককভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সক্ষম হবে, এমন চিন্তাভাবনা অন্তত আর যাই হোক ইন্দিরা গান্ধীর মাথায় ছিল না। সেজন্য অগাস্ট মাসেই তিনি বিশ্বভ্রমণে বের হন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কৌশলগত সামরিক চুক্তিতে আব হন। ফলে ডিসেম্বরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে নিরাপত্তা পরিষদে বারবার উত্থাপিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ভেটোতে নাকচ হয়ে যেতে থাকে। জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধ বিরতি এবং একই সাথে এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ চীন ও মার্কিন হস্তক্ষেপের আশায় চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত উপস্থিতি চীন ও মার্কিন উভয়কে তেমন উদ্যোগ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়। আর এভাবেই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ এক নয়া বাস্তবতা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে হাজির হয়।
মুক্তিবাহিনীতে যোগদানে ইচ্ছুকদের যাচাই-বাছাইয়ের যে প্রক্রিয়া ছিল, এখানে তার একটা প্রচ্ছন্ন বিরোধিতা এই অধ্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। লেখকের মতে, তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের বাইরে অন্যান্য দলের অনুসারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণের পক্ষে ছিলেন। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তেমন ধারণা পোষণ করাটা হয়তো দোষের কিছু না। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের জন্মে এর সৈনিক ও নেতৃত্বের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনার আবশ্যকতা সম্পর্কে উদাসীন থাকাটাও সমানভাবে ক্ষতিকর। একেবারে যাচাই বাছাই না করার যে খেসারত ১৯৭২ সাল থেকে জাতি দিয়ে চলেছে, তার দায়-দায়িত্ব কে নেবে? ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত সামরিক বাহিনীর পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কর্তারা মুজিবনগর সরকার কর্তৃক কোনো ধরনের যাচাই বাছাইয়ের মুখে পড়েনি। পাকিস্তান থেকে ডিফেক্ট করাটাই তখন একমাত্র যোগ্যতা। এই সুযোগে মননে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নাই, এমন বহু মানুষ মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছে। মেজর নূর চৌধুরী, মেজর ডালিম, কর্নেল তাহেরদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিলে অতীতে এদের মাওবাদ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যেতো বৈকি। এমনকি ৭২ সালে সেনাবাহিনী ত্যাগ করে সর্বহারাদের প্রশিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া মেজর জিয়াউদ্দীনকে চিহ্নিত করাটাও সম্ভবপর ছিল। মুক্তিবাহিনীর এই আদর্শগত দূর্বলতার বিপরীতে ছাত্রলীগের সদস্যদের নিয়ে গঠিত বিএলএফ বা মুজিববাহিনী ছিল পুরোপুরি জাতীয়তাবাদী। সিরাজুল আলম খানের মধ্যে একধরনের মার্কসবাদী ঝোঁক থাকলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তার কিংবা তার অনুসারীদের মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। কাজেই, তাজউদ্দীন আহমদের সাথে শেখ ফজলুল হক মণি অথবা সিরাজুল আলম খানদের কোনও দ্বন্দ্ব হয়ে থাকলে সেটা এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। পুরো বইয়ে এই দ্বন্দ্বকে আদর্শিক জায়গা থেকে না দেখার একটা দূর্বলতা রয়ে গেছে। বরং, একে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসাবে চিহ্নিত করার প্রয়াসটাই বেশি চোখে পড়ে। কেবল তাই না, শেখ ফজলুল হক মণিকে খন্দকার মোশতাকের অনুসারী হিসেবে বিবেচনা করার চেষ্টাটাও দেখা যায়। খন্দকার মোশতাক কিংবা ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টে তাকে প্রেসিডেন্ট বানানো খুনি মেজররা যে কতটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিরোধী, সেটা ১৫ আগস্টেই তারা জাতিকে জানিয়ে দিয়েছে। মোশতাক যদি ইসলামপন্থী হয় তো খুনি মেজররা ছিল পিকিংপন্থি; কিন্তু জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তারা ছিল কট্টর বাঙালি বিরোধী। মজার বিষয় হচ্ছে, চতুর্থ অধ্যায়ের শেষে লেখক আবার নিজের অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য গেরিলা যুদ্ধ এবং তাকে ব্যাপকভাবে সহয়তা করতে পারে এমন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছেন। এটা যে কতবড় স্ববিরোধিতা সেটা তাকে কে বলবে? সকল দলের সমন্বয়ে গেরিলা হয় না, কারণ সাংগঠনিক পরিচয়ের সংকটটি তখন বড় হয়ে ওঠে এবং গেরিলাযুদ্ধ ব্যর্থ হয়। তথাকথিত মূলধারা এমন সংকটে নিমজ্জিত থাকলেও অন্যতম ধারা মুজিববাহিনীর গেরিলাদের সেই সংকটের মুখে পড়তে হয়নি। সেজন্য যুদ্ধের এক পর্যায়ে গিয়ে মুজিববাহিনীকে সমন্বয় করে মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল পুনর্বিন্যস্ত করা হয় এবং মুজিববাহিনীর সদস্যদের দেশের অভ্যন্তরে গিয়ে গেরিলা অপারেশন চালানোর একচ্ছত্র অধিকার দেওয়া হয়।
মুজিববাহনীর সাথে সমন্বয়ের কাজটি করা হলেও এদের উপর মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক সংগ্রামে তাজউদ্দীন আহমদ এবং কর্নেল ওসমানী উভয়কেই ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। পরবর্তী অধ্যায়ে ছত্রে ছত্রে তার বর্ণনা পাওয়া যাবে। মুজিববাহিনীর কমান্ডারদের মতো ভারতীয় কর্তৃপক্ষও এই নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে চায়নি। তার সংগত কারণও ছিল। দেশের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠা অন্যান্য স্বতন্ত্র বাহিনীর সাথে সমন্বয়ের কাজটি যেখানে করা হয়নি, বরং মাওবাদীদের কোনো কোনো গ্রুপ (যেমন আত্রাইয়ে ওহিদুর)কে মুজিবনগর সরকারের মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কর্নেল নুরুজ্জামানের পক্ষ থেকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহের বা মেজর খালেদ মোশাররফের অনুরোধে এইসব মাওবাদীদের জন্য গোপনে অস্ত্র কেনার উদ্যোগ লন্ডন এয়ারপোর্টে জানাজানি হয়ে গেলে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। তখন তাদেরকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো চিন্তাভাবনা কারও মাথা থেকে আসেনি, কিন্তু মুজিববাহিনীর ব্যাপারে তাদের গাত্রদাহ ছিল দেখার মতো।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মুজিববাহিনী এবং টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীকে নিরস্ত্র করতে সক্ষম হলেও মুক্তিযুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়া মাওবাদীদের কোনো অংশকেই নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়নি। বরং তারা সদ্য স্বাধীন দেশের নতুন সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তাদেরকে নিরস্ত্র করতে সেনাবাহিনীকে পর্যন্ত তলব করতে হয়েছে।
মঈদুল হাসানের মূল লক্ষ্য হলো- তাজউদ্দীন আহমদকে আগাগোড়া মুক্তিযুদ্ধের কাঠামো নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার লক্ষ্যে বাঙালির দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রামকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করা। এরই মধ্যে মঈদুল হাসানের হাত ধরে আবার তৃতীয় একটি গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে। এ দেশে যারা বঙ্গবন্ধুর বিপরীতে তাজউদ্দীনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চায়, তাদের মূল বক্তব্য, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ প্রস্তুতি তিনি নেননি, ঝুঁকি নিয়েছেন শুধু তাজউদ্দীন আহমদ। এর সমস্ত ভিত্তি মৌখিক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন জীবিতকালে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, ইতিহাস নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। এই ধারার শুরু করেছেন মঈদুল হাসান নিজে। মঈদুল হাসানকে তথ্যসূত্র উল্লেখ করে তাজউদ্দীনকন্যা শারমিন আহমেদ রিপিও একই পথে হেঁটেছেন। শেষ সংযোজন এ কে খন্দকার। তাজউদ্দীন আহমদকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা যাবে না। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সবকিছু তাজউদ্দীন আহমদ করেছিলেন-ভেবেছিলেন এটি আবার সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য হবে না।
বঙ্গবন্ধু কী বলেননি, কী করেননি, কী বলতে পারতেন, কী করতে পারতেন তা নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই পারি; কিন্তু তা তো আর ইতিহাস হতে পারে না- পারে ইতিহাসের ব্যাখ্যা হতে। কিন্তু মঈদুল হাসান ইতিহাসের ব্যাখ্যা আর ইতিহাস একত্রে গুলিয়ে ফেলেন এবং তা জাতিকে গেলানোর চেষ্টা করে যায় দেশের গণমাধ্যমের শক্তিশালী খেলোয়াড়রা। মঈদুল হাসান ও শারমিন আহমেদ রিপি থেকে এ কে খন্দকাররা এ কাজটিই করেছেন এবং সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় তাদের বই ব্যবহার করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে এবং তাদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
মঈদুল হাসানের ইতিহাস বিকৃতির জ্বলন্ত প্রমাণ ২০১৯ সালের জুন মাসে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ কে খন্দকারের সংবাদ সম্মেলন। ওই সংবাদ সম্মেলনে এ কে খন্দকার ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার বিতর্কিত বই '১৯৭১ ভেতরে বাইরে' বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং বিতর্কিত ইতিহাস রচনার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান। একই সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখিত বইটি প্রকাশের জন্য মঈদুল হাসানকে দায়ী করেন এ কে খন্দকার। এমনকি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এ কে খন্দকারের স্ত্রী অভিযোগ করেন '১৯৭১ ভেতরে বাইরে' বইটি বাজার থেকে তুলে না নেওয়ার জন্য মঈদুল হাসান তাদেরকে হুমকি দিয়েছিলেন। মঈদুল হাসানের হুমকি-ধমকির ফলেই নাকি দীর্ঘ পাঁচ বছর লেগে যায় বিতর্কিত বইটি বাজার থেকে তুলে নিয়ে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে- এমন অভিযোগই করেছিলেন এ কে খন্দকারের স্ত্রী।
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ এক বিশাল মহাগ্রন্থ। সেখান থেকে, বুঝে হোক কিংবা না বুঝে, বেছে বেছে নিজের ইচ্ছে মতো বর্ণনা দেওয়া সাময়িককালে তেমন দোষের মনে না হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, মঈদুল হাসানের "মূলধারা '৭১" তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সংশোধিত হওয়ার পরিবর্তে আরও বহুসংখ্যক লেখককে একই পথ বেছে নিতে দেখা গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে প্রজন্ম মূল্যবান সময় নষ্ট করে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের গর্ভে জন্ম নেওয়া সকল ধারার প্রতি রাগ বা অনুরাগ না দেখিয়ে ইতিহাসের একটি গ্রহণযোগ্য পাঠ এখনও বহুদূরের পথ বলেই মনে হয়। অনাগত পাঠক সেদিকেই তাকিয়ে আছে।