Published : 24 Jun 2020, 11:09 PM
সাজিদা ইসলাম পারুল একাকি একটি প্ল্যাকার্ড হাতে প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায়। এটি ২৪ জুন সকালের ঘটনা। মূলধারার গণমাধ্যম ঘটনাটিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হয়েছে। অবশ্য এটিই প্রথম নয়, এপ্রিলের শুরুতে পারুল যখন তার স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য নির্যাতন, প্রতারণা এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ আনেন তখন থেকে আমরা নিজেরাই অনেকবার এ নিয়ে কথা বলেছি।
সাজিদা ইসলাম পারুলকে আমি 'আন্টি' বলে ডাকি। আমার ছোটবোন অনামিকা চন্দ্রা এবং অপার সর্বজয়ারও খুব প্রিয় আন্টি তিনি। তিনি আমাদের রক্তসম্পর্কীয় কেউ নন। কিন্তু আমাদের কাছে আপনার চেয়ে আপনজন। নাট্যকলার শিক্ষার্থী চন্দ্রাকে ভর্তি পরীক্ষার আগে হাতেকলমে অভিনয় শিখিয়েছেন পারুল আন্টি। অপারের জন্য মানুষের সমান পুতুল কিনে এনেছেন। ডালিয়া দিদি মানে ডালিয়া চাকমা একবার একটা বিপদে পড়ে সাংবাদিক সাজিদা ইসলাম পারুলের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। সাংবাদিকের দায়িত্বের চেয়ে অনেক বেশি করেছেন পারুল আন্টি। আমাদের পারুল আন্টি সেই থেকে ডালিয়া চাকমার প্রিয় পারুল আপু। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রায়হান, সরাইলের মনসুর ভাই পারুল আন্টির সাত চম্পার দুটি ভাই। এমন অনেকজন মিলে আমরা ঠিক করলাম সাজিদা ইসলাম পারুলের পাশে থাকতে হবে। আমরা যে প্রবলভাবে আছি, তা অনেকেরই জানা আছে। আমরা বারবার বলেছি এক্ষুনি প্লাবনকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
প্লাবন মানে যুগান্তরের সাংবাদিক রেজাউল করিম প্লাবন। অবশ্য আমরা বিশ্বস্তসূত্রে জেনেছি প্লাবনকে 'যুগান্তর' কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বরখাস্ত করেছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। তবে ঘোষণার আগপর্যন্ত আমরা এ খবরে শতভাগ আস্থা স্থাপন করতে চাই না। যৌতুক দাবি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে গত ১১ মে হাতিরঝিল থানায় প্লাবনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন সাজিদা ইসলাম পারুল। সেই থেকে বহুবার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই যে প্লাবন গ্রেপ্তার হলো বলে। এই বলে বলে অনেক ইঁদুর-বেড়াল খেলা হয়েছে। 'যুগান্তর' কর্তৃপক্ষও এমন ঘৃণ্য অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্মীকে তখনই বরখাস্ত করেনি। আমরা বলেছিলাম, আপনারা প্লাবনকে প্রয়োজনে সাময়িক বরখাস্ত করেন, তিনি নির্দোষ প্রমাণ হলে পুনর্বহাল করবেন। না করার ফলে পুলিশ বলার সুযোগ পেয়েছে, এটা দুজন সাংবাদিকের দাম্পত্যকলহ। পুলিশকে আবার এসব বলার সুযোগ করে দিয়েছেন, কতিপয় সাংবাদিক নেতা।
প্লাবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং অল্পদিনের প্রেমের পর ২ এপ্রিল পারুল ও প্লাবন বিয়ে করেন। বিয়ের পর যৌতুক হিসেবে প্লাবন ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট দাবি করেন পারুলের কাছে। এরই মধ্যে একাধিক নারীর সঙ্গে প্লাবনের অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা জেনে যান পারুল। অনৈতিক সম্পর্কে বাধা ও যৌতুক না দেওয়ায় পারুলকে নির্যাতন করা হয়। মারধরের কারণে পারুলের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ৫ মে তিনি প্লাবনের গ্রামে বাড়ি গেলে সেখানেও মারধরের শিকার হন। প্লাবনের বড় ভাই এমএ আজিজ, ছোট ভাই এসএম নিজামউদ্দিন এবং বাবা সামসুল হক ও মা মারধর করেন পারুলকে।
মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পারুলের অনুরাগীরা অনলাইনে মানববন্ধন আয়োজন করি। আমরা নিশ্চয়ই রাজপথে দাঁড়াতাম। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহ দুর্দিনে এর বিকল্প হিসেবে রুমানা আপু অনলাইন মানববন্ধনের পরিকল্পনা করেন। আমরা ২৫ জন শুরু করেছিলাম অনলাইন মানববন্ধন। একপর্যায়ে অন্তত শ পাঁচেক মানুষ আমাদের সঙ্গে সংহতি জানান। আমাদেরও আগে প্লাবনের গ্রেপ্তার জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল নারী সাংবাদিকদের দুটি সংগঠন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি প্লাবনের স্থায়ী সদস্য পদ স্থগিত করে।
কিন্তু কতিপয় সাংবাদিক নেতা যারা 'আওয়ামীবলয়' এর সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের পরিচিতি দিতে পছন্দ করেন, তারা ছায়া দিতে শুরু করলেন প্লাবনকে। ছাত্রজীবনে প্লাবন শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেটা কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে রংপুর পর্যন্ত সর্বত্র সেই সময় প্লাবনের নির্যাতনের শিকাররা স্বীকৃতি দিয়ে জানিয়েছেন। পরিতাপের বিষয় সেই প্লাবন এখন আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
আমাদের তো আন্দোলন করা ছাড়া উপায় নেই। ফেইসবুকে আমরা 'উই স্ট্যান্ড ইন ডিফেন্স অফ পারুল' নামে একটা গ্রুপ করে রেখেছি শুরু থেকে। কী করা যায় এরপর? গ্রুপে এম মনসুর আলী বারবার দেশজুড়ে মানববন্ধন করার তাগাদা দিতে লাগলেন। সেটা হয়তো আমরা করতে পারতাম। করার পরিকল্পনাও করছিলাম। বাধা দিলেন স্বয়ং সাজিদা ইসলাম পারুল। তার বক্তব্য সরল, করোনাভাইরাস সংক্রমণের সেই সময় তিনি তার জন্য কাউকে ঝুঁকি নিতে দেবেন না। এটাই আমার পারুল আন্টি। অন্যের জন্য অকাতরে করলেও নিজের জন্য কাউকে বিপদে ফেলতে নারাজ। কিন্তু তার বড়ভাইতুল্য সাংবাদিক নেতারা তাকে সমঝোতার নামে বিড়ম্বিত করছেন। সাজিদা ইসলাম পারুল বারবার লিখেছেন, 'আমার বড় ভাইতুল্য ওই সাংবাদিক নেতাদের করজোড়ে বলছি, আপনারা পুলিশকে বিভ্রান্ত করবেন না। আমি আপনাদের ছোটবোনের মতো, আমার জায়গায় নিজের বোনটিকে ভাবুন, কন্যাটিকে ভাবুন, যদি আপনার বোন বা মেয়ে যৌতুকের জন্য নির্যাতিত হতো, তার গর্ভের অনাগত সন্তানটিকে হত্যা করা হতো কী করতেন আপনি?'
আজ একাকি একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রেসক্লাবের সামনে, সেখানে দাঁড়িয়েই ফেইসবুকে লিখেছেন, টেলিভিশনের সঙ্গে বলেছেন, 'কতিপয় সাংবাদিক নেতার প্রশ্রয় এবং পুলিশ প্রশাসনের অবহেলা কাজে লাগাচ্ছে প্লাবন। প্রতিনিয়ত সমঝোতার চাপ, হুমকি, ফেইসবুক আইডি হ্যাক করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। একদিন দেখবেন, পুরো আমাকেই গায়েব করে দেবে সে।'
এক মাস পনের দিন হয়েছে রেজাউল করিম প্লাবনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন পারুল। তার ভাষায়, 'উপায়ান্তর না দেখে ন্যায় বিচারের দাবিতে আজ একাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়ালাম। আশা করছি পুলিশের টনক নড়বে। না হয় এরপর প্লাবনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে দাঁড়াবো হাতিরঝিল থানার সামনে। দাঁড়াবো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাড়ির সামনে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে। তাতেও কাজ না হলে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করবো। বিচারহীনতার এই সমাজে বেঁচে থাকার চেয়ে প্রতিবাদ করে মরে যাওয়া ভালো।'
পারুল আন্টির এই রকম লেখা পড়ে আমরা বিষণ্ণ হয়ে পড়েছি। আজও কাঁদছিল পথের ধারে দাঁড়িয়ে। এমন কান্নায় আমাদের বুক ফাটে, তবু রাষ্ট্রের চোখ ফোটে না। সত্যি 'যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই—প্রীতি নেই—করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।'