Published : 21 Jun 2020, 09:54 PM
বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালের প্রবল বন্যায় তিন ভাগের দুই ভাগ এলাকা মাসাধিক কাল পানির নিচে ছিল। বন্যায় আউশ ও আমন ধানের ক্ষতি হয় প্রচুর। কিন্তু পরের বোরো মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) কৃষকরা 'গোলা ভরা ধান' প্রবাদকে যথার্থ প্রমাণ করতে পারে। বন্যা চলার সময়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিলেন, আবেদনের ৪৮ ঘণ্টা বা দুই দিনের মধ্যেই কৃষি ঋণ দিতে হবে। আরও কিছু সুবিধাও কৃষি খাতে দেওয়া হয়। তদুপরি আউশ, আমন ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকরা 'এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখেনি'। ফল মেলে বোরো মৌসুমে- এক কোটি পাঁচ লাখ টনের মতো চাল উৎপন্ন হয়। ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া বলেছিলেন, "এবার অন্তত এক কোটি টন বোরো চাল উৎপন্ন হবে।" এটা শুনে একটি 'দাতা সংস্থার' এক শীর্ষ কর্মকর্তা পাশে বসা বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কাছে মন্তব্য করেন- 'রিডিকুলাস ক্লেম' বা হাস্যকর দাবি।
বাস্তবেই এক কোটি ৫ লাখ টন চাল বোরো মৌসুমে উৎপন্ন হয়েছিল। 'দাতারা' এটা বিশ্বাস করতে চায়নি। বাংলাদেশে ভেতরেও কিছু লোক রয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের দেওয়া বদনামে আস্থা রেখেছিল- 'বাংলাদেশ একটি বাস্কেট কেস' কিংবা বটমলেস বাস্কেট। এ দেশটি টিকবে না। উন্নত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পর আগামী অর্থ বছরের বাজেট পেশ কালে অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল যখন দাবি করেন- ২০২০-২১ অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮.২ শতাংশ, তখনও একদল 'বিশেষজ্ঞ' রে রে করে ওঠেন- রিডিকুলাস ক্লেম, হাস্যকর দাবি। অথচ কয়েক দিন যেতে না যেতেই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে- ২০২০-২১ অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটবে ৭.৫ শতাংশ। দুই হিসাবে খুব কি পার্থক্য আছে? এ তথ্য নিশ্চয়ই আমাদের আছে- করোনাভাইরাস ও প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমপানের মধ্যেও বাংলাদেশ চলতি মৌসুমে ২ কোটি ১০ লাখ টনের মতো বোরো চাল ঘরে তুলতে পেরেছে। এমন শক্তি তো আমাদের ভেতরেই আছে। কেন তা কাজে লাগাবো না? কেবল কৃষক নয়, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত অনেক অ-কৃষক পরিবারেও সংকল্প- এক ইঞ্চি জমিও খালি রাখা হবে না। বাড়ির আঙিনা ও ছাদেও হবে চাষ। পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের জন্য ঘোষিত এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রণোদনার সুফল নিশ্চিত করার জন্যও আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
মার্চের শেষ দিকে পোশাক শিল্পের লাখ লাখ কর্মীকে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ঢাকা নিয়ে আসা এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফেরত পাঠানোর ঘটনায় বিস্তর সমালোচনা রয়েছে এবং তাতে যুক্তিও আছে। কিন্তু এ ঘটনার আরেকটি দিকও ভুলে যেতে পারি না- অর্থনীতি সচল করার প্রবল আগ্রহ শ্রমিক, মালিক ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের। এর পেছনে জীবিকার তাগিদ আছে, জীবন রক্ষার জন্য যা অপরিহার্য।
বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে ১৪ জুন ল্যারি এলিয়ট লিখেছেন, 'কস্ট অব লকডাউন আর টু হাই'। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিসের প্রধান অ্যান্টনি ফাউসি বলেছেন, "করোনার ভ্যাকসিন এসে যাচ্ছে। মানুষের ভেতরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে।" লকডাউন যেভাবে মাস তিনেক চলেছে, তাতে পরিবর্তন তিনিও চান।
বাংলাদেশে অনেকের দাবি কিন্তু ভিন্ন- কঠোরতম লকডাউন চাই। এমন কারফিউ দিতে হবে, যেন 'পাখিও ফাঁকি দিতে না পারে'। জীবনের শঙ্কা থেকে অনেকে এটা বলেন। আক্রান্ত হলে চিকিৎসা মিলবে কীনা, করোনাভাইরাস ছাড়াও অন্য রোগে আক্রান্ত হলে কী হবে- এমন ভয়ও কাজ করে। আরও উদ্বেগ আছে- কবে এর শেষ হবে? যেন কূল নেই, কিনার নেই অবস্থা। হতাশা স্বাভাবিক।
একটা বিষয় সকলকে স্মরণ করতে বলি- পাকিস্তান আমলে কিংবা বাংলাদেশে সামরিক নিপীড়নের আমল ছাড়া কখনও কি নিপীড়নমূলক কারফিউ জারি হয়েছে? ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, জেনারেল ইয়াহিয়া খান, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ আন্দোলন দমাতে কারফিউ জারি করেছেন। সামরিক শাসনামলে গড়ে ওঠা দল বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া সামরিক বাহিনী রাজপথে নামিয়েছেন। এমনকি জেনারেল মঈউদ্দীনও কারফিউ জারি করেছেন, রাজপথে সামরিক বাহিনী নামিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা শেখ হাসিনা কখনও কি এমন পথে চলেছেন? আওয়ামী লীগের মতো দল কিন্তু কোনো সময়েই এটা করতে পারে না। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একাধিক বার পেট্রল বোমার নির্বিচার ব্যবহারে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। নির্বাচন হতে দেবে না- সংকল্প প্রকাশ করেছিল। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে শোনা গেছে- জরুরি আইন আসছে। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। তাহলে শেখ হাসিনা শান্তির সময়ে লকডাউন কার্যকর করার জন্য কেন কারফিউ জারির মতো পদক্ষেপ নেবেন? এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের অর্থ হচ্ছে দেশের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা। কেন এমন আত্মঘাতী পথে চলার প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে? এ ধরনের জনসম্পৃক্ত দলের আস্থা কিন্তু রাজনৈতিক উদ্যোগে, আমজনতার সঙ্গে সমঝোতায়।
স্বাধীনতার পর ভুয়া রেশন কার্ড ও বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে বঙ্গবন্ধুর সরকার ঢাকার কিছু এলাকায় দিনের বেলা কারফিউ জারি করেছিল। চোরাচালান দমনে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মতলববাজ একটি মহল তার চরম অপব্যবহার করে। দ্রুতই এ পদক্ষেপ থেকে সরে আসেন বঙ্গবন্ধু।
যে কোনো দেশে লকডাউনের প্রধান শিকার তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কারণে এ সমস্যা আরও প্রকট। গড় আয়ু ৭২ বছর ছাড়ালেও জনসংখ্যা বৃহত্তম অংশ কর্মক্ষম বয়সের। তরুণ-তরুণী যাদের বলি, তারাই অনেক কিছুর নির্ধারক। কারফিউ জারি করে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে আটকা রাখা কি সম্ভব? আর আটকা রাখলেই কি করোনাভাইরাসের বিদায় ত্বরান্বিত হবে? ল্যারি এলিয়ট লিখেছেন, "করোনায় তরুণ-তরুণীরা কম আক্রান্ত, কিন্তু দুর্ভোগ তাদেরই বেশি।" শ্রম বাজার, শিক্ষা, খেলাধুলাসহ কত ক্ষেত্রে তরুণদেরই নিরঙ্কুশ প্রাধান্য। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ফুটবল লীগ চালু করতে হয়েছে। শুটিং শুরু হয়েছে।
প্রেম-ভালবাসা তো আছেই। করোনাকাল শুরু হতে না হতেই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সেক্স লাইফ। বাংলাদেশে এ নিয়ে আলোচনা 'নিষিদ্ধ'। কিন্তু এর চেয়ে বড় সত্য জীবনে কী আছে?
জীবন রক্ষা ও রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রতিটি দেশ মনোযোগী। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন- প্রতিটি দেশের ভয় যদি দ্বিতীয় দফায় লকডাউন দিতে হয়? দিলে কি সেটা মানানো যাবে? তাতে লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে না তো? এখন বলা হচ্ছে, এইডসসহ অনেক রোগ থেকে মুক্তির কার্যকর ও স্থায়ী চিকিৎসা নেই। অনেক রোগ করোনাভাইরাসের চেয়েও প্রাণঘাতি। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা সত্ত্বেও করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার দেড় শতাংশের কম। আমরা যদি রোগের সংক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে না পারলেও অন্তত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি তাহলে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক অবস্থা নিয়ে আসা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আগের অবস্থায় যাবে না, এটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কারফিউ জারি করে কঠোর লকডাউন নয়, বরং জীবনযাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে আমরা নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারি কী-না, সেটা ভেবে দেখার সময় কি আসেনি? এটাই অভিজ্ঞতা যে কঠোর লকডাউনেও সব কিছু বন্ধ রাখা যায় না।
টিভি প্রতিবেদনে দেখা যায়, কত কারণ দেখায় ঘরের বাইরে আসা মানুষ। সংবাদ মাধ্যম তা প্রচার করে এবং এক ধরনের সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। অনেকের যুক্তি হাস্যকর, কিন্তু যারা দিচ্ছে- তারা তো সমাজেরই অংশ। সেই প্রথম দিকে যশোরের এক নারী ইউএনও লকডাউন বলবৎ করতে গিয়ে চরম বিপদে পড়েছিলেন। তিনি দু'জন কৃষককে লাঞ্ছিত করেন। কাজটি অনুচিত ছিল। কিন্তু কারফিউ বলবৎ করতে হলে এর চেয়েও অনুচিত কাজ করতে হতে পারে। আমাদের সমাজ আদৌ সে জন্য প্রস্তুত নয়। রোগ সংক্রমণ ঠেকাতে নির্দিষ্ট এলাকায় কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন হতেই পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও দমননীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রশ্ন আসে না। বরং জীবনের ঝুঁকি যতটা কমিয়ে আনা যায়, সে জন্য সবর্তোভাবে চেষ্টা করতে হবে। দেশের ভেতরে কিংবা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ আমরা চাইলেও থামিয়ে রাখতে পারব না। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত কি বন্ধ রাখা সম্ভব? এটাও মনে রাখতে হবে, ইউরোপের কোনো দেশ যেমন এককভাবে করোনা নির্মূল করতে পারবে না, তেমনি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানও নিজেদের এ ধরনের মহামারী থেকে পৃথকভাবে মুক্ত রাখতে পারবে না। তাদের কাজে সমন্বয় থাকতে হবে। সহযোগিতা হতে হবে সর্বাত্মক।
মানবসমাজ অনেক রোগের হাত থেকে নিষ্কৃতির উপায় বের করতে পারেনি। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা চলে। তবে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। কিছু কার্যকর ওষুধের কথাও বলা হচ্ছে। আমাদের সৌভাগ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাধিক ওষুধ বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে। আমরা যেমন মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার রপ্তানির বিষয়ে সচেষ্ট হয়েছি- ওষুধ রপ্তানির হিস্যাও পেতে পারি। ভ্যাকসিন উৎপাদন ব্যাপকভাবে শুরু হলে আমাদের মানসম্পন্ন বড় কোম্পানিগুলো যেন তার হিস্যা পায়, সে জন্য চেষ্টা করতে হবে জোরেশোরে। এতে রপ্তানি আয়ের যে ঘাটতি সেটাও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন। শহর কিংবা গ্রামের অধিবাসী, ধনবান কিংবা দিনমজুর-বস্তিবাসী, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে কেউ যেন চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা,অফিস কিংবা জমিতে যারা কাজে যাবে, পাইকারি বা খুচরা ব্যবসায় যারা যুক্ত হবে, শিক্ষা কিংবা অন্য কারণে যাদের বাইরে যেতে হবে তারা যেন রোগ নিয়ে ঘরে না ফেরে কিংবা রোগে আক্রান্ত হলে অন্যকে সংক্রামিত না করতে পারে তার প্রতিও সর্বোচ্চ নজর চাই। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সর্বোচ্চ। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- সকলকেই নিজ নিজ ভূমিকা পালন করা চাই। প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে, আমার যা সাধ্য তা করিব আমি।