Published : 01 Apr 2026, 10:15 AM
প্রকৃতির এক অদ্ভুত সমীকরণ খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদী। চৈত্রের শেষ থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত নদীর অধিকাংশ স্থানে চর জাগার কারণে একপাশ দিয়ে সামান্য পানি প্রবাহিত হয়। এই চরে ভেসে আসা একটি ওয়ান টাইম ভাঙা প্লেটের নিচে পাখির কয়েকটি ডিম দেখতে পেলাম সেদিন। এসব ডিম থেকে অল্প কয়দিনের মধ্যেই বাচ্চা আসবে হয়তো। আরেকটু দূরে যেতেই সুসজ্জিত নুড়ি পাথরের মধ্যখানে আরও তিনটি ডিম চোখে পড়ল। হয়তো এই জায়গাকেই পাখিগুলো নিরাপদ মনে করেছে। এখানেই বাচ্চা দেবে। পাখিদের কোনো কোনো প্রজাতি প্রাকৃতিকভাবেই নদীর চরে ডিম পাড়ে। তাই চরে পাখির ডিম দেওয়াটা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। তবে নদীর চরে একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের প্লেটের নিচে পাখির আশ্রয়—প্রকৃতির এই রূপটি আসলে আমাদের পরিবেশগত সংকটেরই করুণ প্রতিচ্ছবি। শহর থেকে পাহাড়—সর্বত্রই সংকুচিত হচ্ছে পাখিদের পৃথিবী। কাজেই মনে প্রশ্ন জাগে মানুষের সৃষ্ট বৈরিতা ছাপিয়ে পাখি কি পারবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে?
পাখি প্রকৃতির অলঙ্কার। বাস্তুতন্ত্রেও এর বিশাল স্থান। পাখি প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যের ধারক ও বাহক। বর্তমান প্রজন্ম পাখিদের সুসজ্জিত দোকানের খাঁচায় দেখে অভ্যস্ত। বনে পাখিদের নিরাপদে থাকার পরিবেশ দিনে দিনে বিনষ্ট যাচ্ছে। যা ঘটছে তার পুরোটাই মনুষ্যসৃষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি আধুনিকায়ন তথা নগরায়ণের নামে বন উজাড় এর অন্যতম কারণ।
পৌরাণিক উপাখ্যান মতে, পাখি শুধু একটি প্রাণী নয়; বরং মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক। হিন্দু পুরাণ মতে, দেবতা বিষ্ণুর বাহন গরুড় পাখি; যা শক্তি ও ভক্তির প্রতীক। রামায়ণ মতে, সীতাদেবীকে জটায়ু পাখি আত্মত্যাগের মাধ্যমে রক্ষা করে। গ্রিক ও মিশরীয় পুরাণ মতে, ফিনিক্স পাখি অমরত্ব ও নতুনের প্রতীক। নর্স পুরাণে কাক ঐশ্বরিক বাণীর এবং আরবীয় পুরাণে ‘রক’ পাখি সৃষ্টির প্রতীক। আবার আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে উঠে লালন সাঁইজি ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গানে পাখির প্রতীকী রূপ দেখিয়েছেন।
“আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি,/ সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ,/ তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখি,/ তাহার গানে আমার নাচে বুক।” ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত কবিতা ‘এক গাঁয়ে’-তে এভাবেই আমাদের জাতীয় পাখি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিবিড় অনুভূতি প্রকাশ পায়। “মস্ত বড় দালান-বাড়ির উই-লাগা ঐ কড়ির ফাঁকে/ ছোট্ট একটি চড়াই-ছানা কেঁদে কেঁদে ডাক্ছে মা’কে।/ ‘চুঁ চা’ রবে আকুল কাঁদন যাচ্ছিল নে’ বসন-বায়ে,/ মায়ের পরান ভাবলে-বুঝি দুষ্ট ছেলে নিচ্ছে ছা-য়ে।” এভাবেই কাজী নজরুল ইসলামের ‘চড়ুই পাখির ছানা’ কবিতায় পাখিপ্রেম ও আবেগ ফুটে উঠেছে। নির্জন পরিবেশে পাখির সুমধুর ডাক কিংবা নীলাকাশে সাদা বক উড়ে যাওয়ার অনাবিল দৃশ্য বিভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে স্থান দখল করে আছে। শিশুসাহিত্যেও অনবদ্য বহু উপাখ্যানে পাখি বন্দনা সমুজ্জ্বল। এটি প্রমাণ করে যে, পাখি আমাদের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। অথচ আমরাই শখের বসে পাখি শিকার করি, হত্যা করি।
পাখির প্রতি বিরূপ আচরণ একটি নিয়মিত ঘটনা। শহর থেকে গ্রামে তা চলে সমানতালে। ঢাকায় সাধারণত সারারাত প্রচুর গাড়ি চলাচলের আলো এবং হর্নের দ্বারা পাখির স্বাভাবিক জীবনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। মফস্বল শহরেও পাখির জন্য বসবাসের পরিবেশ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সে জন্য শহরে পাখি তুলনামূলকভাবে অনেক কমে যাচ্ছে এবং বিলুপ্তির পথে। সবচেয়ে অমানবিক এবং হিংস্র ঘটনার একটি হচ্ছে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন। সাধারণত সন্ধ্যার আগেই প্রাকৃতিকভাবে অধিকাংশ পাখি তার নীড়ে ফিরে যায়। রাত বারোটা এক মিনিট নিঃসন্দেহে মধ্যরাত। আমাদের দেশে বিভিন্ন শহরে—বিশেষ করে ঢাকায় সর্বত্র মধ্যরাতে যখন আতশবাজি এবং বিকট শব্দের বর্ণিল বাজি ফোটানো হয়, তখন পাখিগুলো উচ্চস্বরে শব্দ করে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে। এই শব্দ প্রতিনিয়ত শোনা শব্দের ন্যায় কোনো স্বাভাবিক শব্দ নয়। এটি অবিবেচক মানুষের জন্য আনন্দের হলেও পাখির জন্য একান্তই ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের রাত। এমন নিন্দনীয় দৃশ্যের সাক্ষী শহরবাসী। উন্নত দেশেও থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করা হয়, তবে তা এভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেখানে-সেখানে না করে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় করা হয়, যাতে নাগরিক অসুবিধাসহ এ ধরনের সমস্যা এড়ানো যায়। সুনাগরিক আচরণের কারণে উন্নত রাষ্ট্রে পাখি অনেক নিরাপদ। আমাদের দেশে থার্টিফার্স্ট নাইটের পূর্বে সরকারের পক্ষ থেকে গতানুগতিক কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। রাতের বেলায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমন কিছু নিষেধ মানা হয় বলে মনে হয় না। আমরা এসব মানতে একান্তই অপরাগ। এতে নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীলতায় আমাদের উদাসীনতাই প্রমাণিত হয়।

প্রান্তিক জীবনেও নানা পরিবেশে পাখির প্রতি প্রতিনিয়ত অন্যায় আচরণ হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ সমারোহ। এখানে হরেক জাতের পাখিসহ বন্য পাখির আবাস। এখানেও দিনে দিনে পাখিদের স্বাভাবিক জীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত। ভৌগোলিক কারণে আমাদের দেশের তিন পার্বত্য জেলা সমতলের চেয়ে ভিন্ন। এখানে সমতল জায়গা নেই বললেই চলে। এখানকার মানুষের প্রধান পেশা জুম চাষ। ফাল্গুনের দখিনা বাতাস যখন বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে, কোকিল যখন শিমুল-পলাশ ডালে বসন্তের গান গায়; ঠিক তখনই জুম চাষিরা পাহাড়ের বনে আগুন লাগিয়ে দেয়। সব ঝোপঝাড় পুড়ে ছাই হয়ে যায়। চৈত্রের শেষে প্রথম বৃষ্টিতে ছাই মাটিতে মিশে উর্বরতা বাড়ায়, যা জুমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক। সেগুন বাগানেও শীতে ঝরে পড়া কয়েক স্তরের ঝরা পাতায় আগুন লাগানো হয়। এতে পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে প্রাণ বাঁচাতে। উদ্বাস্তুর মতো একটু আশ্রয়ের আশায় ঘুরতে থাকে পাখিও। তাদের প্রজনন, ডিম পাড়া, ডিমে তা দেওয়া, নতুন বাচ্চাকে বড় করা—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে যায়।
পাখি নিয়ে বিশ্বব্যাপী বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনাল’ কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-র ১৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা—স্থলজ জীবনের ১৫.২ সূচকে বন উজাড় বন্ধ এবং অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার, ১৫.৪-এ পার্বত্য বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, ১৫.৫-এ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং ১৫.৭-এ সংরক্ষিত প্রজাতির অবৈধ শিকার ও পাচার নির্মূল করার কথা বলা হয়েছে। এসব উল্লেখযোগ্য সূচক অর্জন করতে হবে আর মাত্র চার বছর অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে। অথচ পাখির নানা প্রজাতি আজও বিলুপ্তির পথে। অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তথা পাখি রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এর কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এরই মধ্যে গত ২৬ মার্চ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ৭ বস্তায় ৪ মণ মৃত পাখি উদ্ধার করা হয়; যেখানে কয়েক হাজার পাখি মারা যায়। বিষয়টি প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অসংখ্য অপরাধের মতো সাধারণ নয়। এতগুলো প্রাণী হত্যার শাস্তি শুধু জরিমানায় শেষ হওয়া উচিত কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। এভাবে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার একটি হয়তো জনসম্মুখে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু আইন পাখি রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। শিকার করে এমন বিকৃত মানসিকতার মানুষদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন জরুরি। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখি রক্ষায় আইনের প্রয়োগ ও কঠোরতা আবশ্যক। গ্রামাঞ্চলে পাখির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শিশুরাও পাখি শিকার ও পাখির বাসা থেকে ডিম নেওয়ার ঘটনা ঘটায়। বর্তমান প্রজন্মকে পাখির গুরুত্ব বোঝাতে পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত জরুরি। পাশাপাশি এ বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পৃক্ত সংগঠনগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিতব্য ক্যাম্পেইন পাখিবান্ধব ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে কিছুটা হলেও সহায়ক হতে পারে এবং বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।