Published : 01 Feb 2026, 06:18 PM
১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল দিনটি স্মৃতিতে এখনও সতেজ। তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুল ছুটি হয়েছিল বিকেল ৪টায়। ফেরার পথে একদল বড় ভাই বিয়ে বাড়ির উৎসব আনন্দে ছিটানো হয়—এমন রং স্কুলের সাদা শার্টে ছিটিয়ে দিয়েছিল। বলা বাহুল্য, স্কুলফেরত কিশোরীরাও এই উৎসবমুখর দামাল ছেলেদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। উপলক্ষ—মালয়েশিয়ায় আইসিসি ট্রফিতে কেনিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আর বড় কথা, এর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছে আকরাম–বুলবুল–শান্তরা। আহা! কী গর্ব, অহংকার আর আনন্দের দিন ছিল সেটি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি আমাদের কৈশোরে খুব সহজলভ্য ছিল না। ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ২০০৭ সালে বড় পর্দায় প্রথম বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার সুযোগ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। মনে আছে, সে সময় একটি মুঠোফোন কোম্পানির বড় অঙ্কের টাকা রিচার্জ করে একটা জার্সি পেয়েছিলাম। পাতলা ফিনফিনে সেই জার্সিতে গর্ব ছিল, ছিল আত্মঅহংকার। এরপর ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ছিল তো আমাদের বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ সহ-আয়োজক, ঢাকায় ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আজও মনে পড়ে, টিউশনের টাকা জমিয়ে এলিফ্যান্ট রোড থেকে বাংলাদেশ দলের জার্সি কিনেছিলাম। সেই জার্সি পরেই ২০১১ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন, দিনের বেলায়, টিএসসিতে মিছিল করেছি। আহা! আবেগ, আহা ক্রিকেট।
এরপর বড় হয়েছি, বলতে পারেন প্রায় বুড়োই হয়েছি। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের সামর্থ্য এবং সক্ষমতাকেও বিশ্লেষণ করতে শিখেছি নির্মোহভাবে। তারপরও প্রতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের একটি জার্সি আমি কেনার চেষ্টা করি। এমনকি আইসিসি ট্রফিতেও বাংলাদেশ কোনো আকর্ষণীয় জার্সি পরলে সেটি সংগ্রহের চেষ্টা করি। এখানে কোনো যুক্তি নেই। হয়তো ছেলেমানুষি আবেগটা রয়েই গেছে। কারণ সত্য বিশ্লেষণ করলে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ খুবই মাঝারি শক্তির দল। দীর্ঘ বিরতিতে দু–একটি বড় দলকে হারানো ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো সাফল্য নেই। এমনকি বাংলাদেশ একবারও এশিয়া কাপ জিততে পারেনি। বৈশ্বিক কোনো শিরোপা তো অনেক দূরের কথা। যদিও বাংলাদেশের মেয়েরা একটা এশিয়া কাপ জিতেছে। কিন্তু বৈশ্বিক কোন শিরোপা এখনও অধরা। তবে হ্যাঁ, একটা অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা আছে বাংলাদেশের ঘরে। কিন্তু সব বিবেচনায় ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলা দলটির জন্য এটি কোন অবস্থাতেই উল্লেখযোগ্য অর্জন নয়। টেস্ট ক্রিকেটেতো আমরা এখনও তলানিতে খাবি খাচ্ছি।
দেখুন, দিন শেষে আমরা অর্থনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন জাতি। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক হানাহানি ও নানা ধরনের দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। এর মাঝে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কোটি কোটি বাঙালিকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দেয়। একটি চার, একটি ছক্কা, একটি ম্যাচজয় আমাদের অনাবিল আনন্দ দেয়। আমরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি, পাশের জনকে জড়িয়ে ধরি। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করি। চলে আনন্দদায়ক ব্যঙ্গ, অনেক ক্ষেত্রে আনন্দদায়ক কটূক্তি। একটু স্মৃতি হাতড়ে দেখুন—বাংলাদেশের খেলার দিন অনেকেই ক্রিকেট দলের জার্সি পরে বাইরে বের হন। বেশিসংখ্যক জার্সি পরা মানুষ দেখেই বুঝতে পারা যায়—আজ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল চত্বরে বাংলাদেশের খেলার দিন বড় পর্দার ব্যবস্থা করা হতো। ছেলে–মেয়েদের অনেকেই বাংলাদেশের জার্সি পরে আনন্দ–উৎসব করে খেলা দেখত।

ক্রীড়া ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মার্কেটিং তেজি হওয়ায় জার্সি এখন অনেক বড় বিষয়। এর সঙ্গে আবেগ, ফ্যাশন ও ব্যবসা জড়িত। যে কারণে জার্সি নিয়ে বিতর্কও হয়। মনে আছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জার্সি তৈরি হয়েছিল অনেকটা পাকিস্তানের জাতীয় দলের ব্যবহৃত রঙের খুব কাছাকাছি একটি রঙে। সেটা নিয়ে তীব্র বিতর্কের পর সেই জার্সি বদলে ফেলা হয়েছিল।
২০২৬ সালের টি–২০ বিশ্বকাপ বাংলাদেশ খেলছে না—এটা পুরোনো কথা। অন্তর্বর্তী সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায় এরই মধ্যে চরম সংকটের মুখে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আবেগসর্বস্ব ও উগ্র জাতীয়তাবাদ-কেন্দ্রিক এই সিদ্ধান্তে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেট বিশ্বে একাকী ও অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়েছে। আত্মঘাতী এই সিদ্ধান্তের মাশুল বাংলাদেশকে আরও কতভাবে দিতে হবে, কে জানে। যদিও ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দাবি, বাংলাদেশ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমরাই জিতেছি! কিন্তু তার যে বিধ্বস্ত মুখাবয়ব আর শারীরিক ভাষা নিয়ে তিনি কথা বলেন, তাতে খুব সহজ করেই বুঝতে পারা যায়—বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক বড় একটা সর্বনাশ তিনি এরই মধ্যে করে ফেলেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্বকাপ বর্জনে বাংলাদেশের অর্জন ও বিসর্জনের খতিয়ান ক্রীড়া ভাষ্যকাররা করবেন। সেটা আমার কাজ নয়। আমি সামান্য একজন ক্রিকেটপাগল বাঙালি, যে কিনা আবেগের বশে প্রতি বিশ্বকাপে একটি জার্সি কিনত। ২০২৬ বিশ্বকাপে কোন দলের জার্সি কিনব—সেটা বলে দিতে পারেন, জনাব বুলবুল। মাঠে কোন দল চার–ছয় পেটালে, স্ট্যাম্প উড়ালে ‘ইয়েসসস’ বলে চিৎকার দেব—সেটা কি বলে দেবেন, মহামান্য আসিফ নজরুল?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি, ক্রিকেটের এই সংকটে পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশের পাশে আছে। তারা নাকি প্রতিটি ম্যাচ জয়ের পর সেই জয় বাংলাদেশকে উৎসর্গ করবে। তাহলে কি পাকিস্তানের জয়ে আমরা উল্লাস করব?
একটি বিশ্ব খেলা থেকে ক্রিকেটারদের বঞ্চিত করা, কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার হিসাব হয়তো একদিন কাউকে না কাউকে দিতে হবে। আপাতত, আক্ষেপ করা ছাড়া কারও কিছু করার নেই।