Published : 02 Apr 2026, 10:24 AM
অবসর পেলেই আমি হয়ে উঠি একজন পুরোদস্তুর ছাদ-কৃষক, বলা ভালো ছাদ-বাগানি। ছাদকৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকি, মাটি নাড়াচাড়া করি, গাছের গোড়ায় সার দিই। নিজে হাতে কম্পোস্ট বানাই, ভার্মিকম্পোস্ট তৈরির চেষ্টা করি। এই সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা হাড়ে হাড়ে টের পাই যে সার ছাড়া কৃষি একটি নিষ্প্রাণ শব্দমাত্র। গাছ কথা বলতে পারে না, কিন্তু সারের অভাবে তার পাতার রং বদলায়, ডালপালা ঝরে পড়ে, ফলন থমকে যায়। এই কথাটা যদি একটি ছাদের সীমানায় সত্য হয়, তাহলে আঠারো কোটি মানুষের একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রে সেটা কতখানি বিধ্বংসী হতে পারে, সেই হিসাব করতে গেলে মাথা ঘুরে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে এখন আগুন জ্বলছে। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সার বাজারে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম টনপ্রতি প্রায় ৪৮০ ডলার থেকে লাফ দিয়ে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে, বৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশের বেশি। এর পেছনে আছে কোটি কৃষকের ঘাম, আমনের জমিতে সার ছিটানো হাত, আর বোরোর মৌসুমে রাত জেগে সেচ দেওয়ার গল্প।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৮ থেকে ৬৯ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইউরিয়ার চাহিদাই ২৬ লাখ টন, আর ডিএপির চাহিদা ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। দেশটি তার মোট সার চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এই একটি পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বাংলাদেশের কৃষি কতটা ভঙ্গুর ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২২ সালে সার আমদানিতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয়েছিল প্রায় ২৩৯ কোটি মার্কিন ডলার, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের ধাক্কায় যখন বিশ্ববাজারে সারের দাম ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেই বছরের জানুয়ারি মাসেই মাসিক সার আমদানির বিল পৌঁছেছিল ছয় হাজার কোটি টাকার ঘরে।
এবার গ্যাস সংকটের কথাটাও যোগ করতে হবে। দেশে ছয়টি ইউরিয়া কারখানা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে পাঁচটিই সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের পথ এভাবে রুদ্ধ হয়ে গেলে আমদানি নির্ভরশীলতা বাড়ে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ১৬ লাখ ৮৪ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ৮১ হাজার টন, ডিএপি ৪ লাখ ৭১ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন এবং এমওপি ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই মজুত দিয়ে মে থেকে জুন পর্যন্ত চলবে। কিন্তু জুনের পর থেকে যে আমন মৌসুম শুরু হবে, সেখানে সার কোথা থেকে আসবে?
সরকার পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। পাঁচ লাখ টনের মধ্যে তিন লাখ টন জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) ব্যবস্থায় আমদানি করা হবে। বাকি দুই লাখ টন কেনা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। মিসর তিন লাখ টন করে ডিএপি ও টিএসপি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দুই লাখ টন করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি দিতে চাইছে। চীনের সঙ্গে বিদ্যমান ডিএপি আমদানির চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে এবং বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ২০ হাজার টনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে। একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সেটি আটকে আছে। কূটনৈতিক বিকল্প খোলা রাখতে মিসরের সঙ্গে শিগগিরই নতুন চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
তবু কিছু আশঙ্কা থেকেই যায়। সৌদি আরবের সঙ্গে বছরে ছয় লাখ টন ডিএপি আমদানির চুক্তি থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে জটিলতার কারণে সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত। চলতি মাসে ওই পথে ৪০ হাজার টনের একটি লট আনার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে এবং সারের আন্তর্জাতিক দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে।
সারের দাম বাড়লে সেটা কেবল কৃষকের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষিবিদেরা বলছেন, সার সংকটের প্রভাব তেলের মতো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কয়েক মাস পরে যখন ফসলের ফলন কমে, তখন বাজারে চাল, আলু, সবজির দাম বাড়তে থাকে। সেই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের উপর, যারা আয়ের বড় অংশটাই খাবার কিনতে ব্যয় করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে বন্যায় প্রায় দুই লাখ হেক্টর আমন ধান নষ্ট হয়েছিল। সেই ধাক্কায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোটা চালের গড় খুচরা দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। যদি এর উপরে সার সংকটের চাপ যুক্ত হয়, তাহলে পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
এই সংকটের মধ্যে বসে আমি ছাদবাগানী হিসেবে একটা বিষয় গভীরভাবে অনুভব করি। জৈব সার নিয়ে আমাদের যে অনীহা, সেটা কাটিয়ে ওঠার এখনই সময়। কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট, গোবর সার, কচুরিপানা থেকে তৈরি জৈব উপাদান, এগুলো কেবল পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়, এগুলো বাংলাদেশের কৃষির সার্বভৌমত্বের অস্ত্র। জৈব সার মাটির জৈব পদার্থ বাড়ায়, দীর্ঘমেয়াদে উর্বরতা রক্ষা করে এবং রাসায়নিক নির্ভরতা কমায়। বাংলাদেশের মতো দেশে গ্রামে গ্রামে জৈব সারের কাঁচামালের অফুরন্ত ভাণ্ডার ছড়িয়ে আছে, অথচ সেই সম্পদকে আজও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। দেশের কৃষিজ উন্নতির জন্য জৈব সারের গুরুত্ব অপরিসীম এবং এই সংকটের মুহূর্তকে যদি একটা রূপান্তরের শুরু হিসেবে না ধরা হয়, তাহলে প্রতিটি নতুন সংকটে আমরা আবার একই শূন্যতা থেকে শুরু করব।
তাহলে নীতিনির্ধারকেরা এখন কী করতে পারেন? সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার কাজটা কেবল সংকটকালীন ব্যবস্থা না ভেবে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে নিতে হবে। একটি বা দুটি দেশের উপর এতটা নির্ভরশীল থাকা যে কতটা ঝুঁকির, এই সংকট আবারও সেটা প্রমাণ করল। দেশের গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধার করে সার কারখানাগুলো সচল রাখার কোনো বিকল্প নেই। পাঁচটি কারখানা বন্ধ থাকার মানে হলো, কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে যা দেশেই তৈরি হতে পারত। একই সঙ্গে জৈব সারের উৎপাদন ও বিতরণকে একটি জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে নিতে হবে। কৃষকের হাতের কাছে সস্তায় জৈব সার পৌঁছে দেওয়া গেলে রাসায়নিক সারের চাহিদার চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। বোরো ও আমনে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন সার ব্যবহার হয়। এর একটি অংশও যদি জৈব বিকল্পে সরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমদানির চাপ কমে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয় এবং মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষা পায়।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষকের সমস্যা নয়, এটা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন। যে দেশ তার নিজের মানুষকে খাওয়াতে পারে না, সে দেশের উন্নতির গল্প ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া আর কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কবে থামবে, হরমুজ প্রণালি কবে আবার নিরাপদ হবে, সেটা কেউ জানে না। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি এই সংকটকে সুযোগ হিসেবে না দেখেন, তাহলে আগামী বছরের আমন মৌসুমে মাঠে দাঁড়িয়ে কোনো কৃষক হয়তো শূন্য হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, সার নেই কেন?