Published : 09 Nov 2025, 08:45 PM
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে যে জাতি রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ওই জাতির সামনে আজও এক গভীর প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই নিরাপদ? এই নিরাপত্তার প্রশ্ন কেবল সীমান্তগত বা সন্ত্রাসবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আরও গভীর ও কৌশলী এক উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্নটি হলো, কোনো বৃহত্তর শক্তি কি এমন কোনো পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ‘চরমপন্থীদের হাতে পতিত দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। একইসঙ্গে ওই অজুহাতে বহিরাগত শক্তি হস্তক্ষেপ করে আমাদের সার্বভৌমত্ব নিজেদের হাতে নিতে পারে?
প্রশ্নটি আজ শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাধারণ নাগরিকেরও চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বাস্তবতা দিন দিন জটিল হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অবলম্বন করছে। দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে একটি সংবেদনশীল ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশও একটি কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের মিলনস্থল হওয়ার কারণে বাংলাদেশ একটি অনন্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় সবসময়ই। বঙ্গোপসাগর এখন কেবল জাহাজ চলাচলের পথ নয়; এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—এসবই বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যদি কোনো বৃহৎ শক্তি বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল ও চরমপন্থাপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করতে চায়, তাহলে তা আন্তর্জাতিকভাবে হস্তক্ষেপের জন্য ‘নৈতিক যুক্তি’ তৈরির উপকরণে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চরমপন্থা নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর থেকেই এই ইস্যুটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও অতীতের কর্তৃত্ববাদী সরকার কখনো কখনো জঙ্গিবাদের নামে সাজানো নাটক সৃষ্টি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করেছিল।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশের বাইরে বা ভেতরের কেউ কি আবারও নতুন করে চরমপন্থার একটি চিত্র আঁকছে এবং ওই প্রচেষ্টার পেছনে উদ্দেশ্য কী? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘চরমপন্থার’ অভিযোগ এক ধরনের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দুর্বল করে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থনহীন করে তোলে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ার উদাহরণগুলো এই ধরনের কৌশলের ফলাফল হিসেবে সামনে দেখা যায়; সেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলো ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ বা ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র নামে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু পরিণতিতে ঘটেছিল মানবিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্রীয় ভাঙনও।
বাংলাদেশে যদি এমন কোনো চিত্র গড়ে ওঠে যেমন চরমপন্থার পুনরুত্থান, দুর্বল প্রশাসন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, তবে বহিরাগত শক্তিগুলোর জন্য ‘হস্তক্ষেপের যুক্তি’ তৈরি হয়ে যাবে। এটাই এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আজকাল বিভক্ত, তিক্ত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, জাতীয় স্বার্থ প্রায়ই দলীয় স্বার্থের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। এই বিভাজনই বহিরাগত শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ; একটি জাতি যখন নিজের ভেতরে বিভক্ত, তখন তাকে বাইরে থেকে দুর্বল করা সহজ হয়ে যায়।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে গভীরভাবে ভাবতে হবে, বহির্বিশ্বে কি এমন কোনো প্রচেষ্টা চলছে যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে ‘চরমপন্থা’ বা ‘অগণতন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়? যদি এমন শঙ্কা সত্যি হয়, তাহলে দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কারণ কোনো একক দলই একার কৌশলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে না; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব, যা দলীয় সীমা পেরিয়ে গিয়ে সবার অংশগ্রহণ ও সংহতি দাবি করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আজ রাজনৈতিক কৌশলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা কীভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উপস্থাপিত হবে, তা প্রায়ই নির্ধারণ করে তার পরবর্তী পরিণতি। বাংলাদেশেও বহুবার দেখা গেছে যে আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে মানবাধিকার, নির্বাচন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে। এসব রিপোর্ট কখনো সত্যে ইতিবাচক নয়, কখনো অতিরঞ্জিত; কিন্তু ফলাফল একই—বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশটিকে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। এটাই ‘ন্যারেটিভ বিল্ডিং’ বা বয়ান নির্মাণের প্রাথমিক ধাপ, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপের পথ প্রশস্ত করে।
বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব—এসবই দেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সংঘাতের উপজীব্য হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে, অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের বন্দর ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভারতও নিজের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই জটিল ভারসাম্যের ভিতরে যদি রাজনৈতিক সহিংসতা বা ধর্মীয় চরমপন্থার পুনরুত্থান দেখা দেয়, তাহলে তা বড় শক্তিগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের অজুহাত হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এখন এটি তথ্য-যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, অর্থনৈতিক চাপ এবং মিডিয়া অপারেশনের সম্মিলিত রূপ। কোনো দেশকে আক্রমণ করতে গেলে ট্যাঙ্ক পাঠানোর দরকার নেই; তার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধ্বংস করা হয় তথ্যের মাধ্যমে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ইমেজ ধ্বংস করার মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোতেও এই নতুন বাস্তবতা লক্ষ্য রেখে পরিকল্পনা করা জরুরি। যদি রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নিজেদের সংঘাতেই ব্যস্ত থাকে, তবে রাষ্ট্রের সূক্ষ্ম নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোই অবহেলিত হয়ে থাকবে।
ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভাজন ছিল, সেখানে বহিরাগত প্রভাব প্রবেশ করে সহজেই। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা, আফগানিস্তানের দুরবস্থা ও লিবিয়ার বিপর্যয়—এসবই একই শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পার হলেও, অর্থনীতি উন্নত হয়েছে এবং সমাজ অগ্রসর হয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কি ওই উন্নতির সমানতালে বেড়েছে?
যদি রাজনৈতিক দলগুলো আজও নিজেদের ক্ষমতার লড়াইকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো বাহ্যিক শক্তি বাংলাদেশকে ‘অস্থিতিশীল’ বলে ঘোষণা করে পদক্ষেপ নিতে পারে; তখন আর আফসোস করার সময় থাকবে না। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিক—সবারই এখন এই প্রশ্নটি নতুনভাবে ভাবতে হবে, আমরা কি এমন এক পথে এগুচ্ছি যেখানে আমাদের দেশকে একদিন ‘চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্র’ হিসাবে উপস্থাপিত করা হতে পারে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে এখনই কৌশল বদলাতে হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানে লেখা একটি শব্দ নয়; এটি প্রতিদিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতি এবং নাগরিক চেতনার প্রতিফলন।
আজ যদি আমরা এটি অবহেলা করি, তবে আগামীকাল হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ অন্য কেউই নির্ধারণ করবে। মোটকথা, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা, জাতীয় ঐক্য এবং বহির্বিশ্বের কৌশলগত খেলাগুলো বোঝার ক্ষমতার ওপর। এক জাতি হিসেবে এখনই বোঝা প্রয়োজন যে সার্বভৌমত্ব কেবল স্বাধীনতার ফল নয়; এটি প্রতিনিয়ত সচেতনতা, সতর্কতা ও আত্মসম্মানের মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়।