ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া শহীদদের দেশে রক্ষা পাচ্ছে কি অন্য জাতির মাতৃভাষাগুলো? অন্য জাতির শিশুরা কি পড়ছে তাদের মায়ের ভাষায়?
Published : 21 Feb 2025, 02:37 AM
বর্ণমালা নিয়ে ম্রো আদিবাসী সমাজে প্রচলিত লোককাহিনী দিয়েই শুরু করছি। ম্রোরা বিশ্বাস করে চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পৃথিবী বা ভূমণ্ডলের সবকিছু সৃষ্টির পেছনে রয়েছেন এক মহাশক্তিমান। তাদের কাছে তিনি থুরাই বা সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্ট মানুষজাতিসহ জীবকূলকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে বর্ণমালা সংবলিত ধর্মীয় গ্রন্থ দান করবেন বলে মনস্থির করেন। তিনি ওই পুস্তক বা ধর্মীয় গ্রন্থ গ্রহণের জন্য পৃথিবীর সব জাতির নেতাকে উপস্থিত থাকার জন্য একদিন আহ্বান জানালেন।
জুমের ফসলাদি উঠছিল তখন। তাই কাজের ব্যস্ততায় ওই অনুষ্ঠানে ম্রো জাতির নেতা যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারেননি। অন্য জাতির নেতারা নিজ নিজ গ্রন্থ নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু ম্রো প্রধান যখন উপস্থিত হন, ততক্ষণে সৃষ্টিকর্তা বা থুরাই স্বর্গে ফিরে গেছেন।
পরদিন সকালে সৃষ্টিকর্তা গরুর মাধ্যমে ম্রোদের কাছে তাদের ধর্মগ্রন্থ পাঠানোর উদ্যোগ নিলেন। গ্রন্থে ১২ মাসিক চাষাবাদ, ধর্মীয় নীতিমালা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উল্লেখ ছিল। ধর্মীয় সব বিধিনিষেধ ও উপদেশবাণীও লেখা ছিল কলার পাতায় লেখা ওই গ্রন্থে। সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে গরুটি গ্রন্থখানা নিয়ে রওনা হলো।
সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে গরুটি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পথে ছিল বড় একটি বটগাছ। তার ছায়ায় গ্রন্থের ওপর মাথা রেখে মনের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ে গরুটি। যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় তার পেট চোঁ চোঁ করছে।
কী করবে সে? কোনো উপায় না পেয়ে কলাপাতার ধর্মীয় গ্রন্থখানাই সে খেয়ে ফেলে। বর্ণমালা ও ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও ওই পুস্তকে নির্দেশনা ছিল বৎসরে তিনবার ধান, তিনবার তুলা, তিনবার তিল-তিসি ফসল তোলা যাবে এবং মাত্র একবার নিড়ানি দিতে হবে।
পুস্তক ছাড়াই গরু যখন ম্রোদের কাছে উপস্থিত হলো, তখন সে সব বিষয়ই ভুলে গেছে। কোনো উপায় না দেখে গরু ম্রোদের কাছে গিয়ে বলল, ‘গতকাল পুস্তক প্রদান অনুষ্ঠানে তোমরা যে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে পারনি এজন্য থুরাই তোমাদের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছেন। তোমাদের গ্রন্থ দেওয়া হবে না বলে তোমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয় জানানোর জন্যই তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।’
ম্রোরা নির্দেশাবলি জানতে চাইলে, গরুটি সব নির্দেশনা গুলিয়ে ফেলে। এরপর বলে, ‘জুম থেকে একবার ফসল উত্তোলন করা যাবে এবং জুমের ফসলাদি রক্ষণাবেক্ষণসহ বহুবার নিড়ানি দিতে হবে।’ এ নির্দেশনা জানিয়েই সে ফিরে যায় সৃষ্টিকর্তার কাছে।
এদিকে ম্রোরা অপরাপর জাতির সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের পার্থক্যটা লক্ষ করল। ভুল নির্দেশনায় তাদের ফসল তো হলোই না বরং ক্ষতির মুখে পড়ল তারা। এ নিয়ে অভিযোগ জানাতে তারা যায় থুরাই বা সৃষ্টিকর্তার কাছে। সব শুনে থুরাই বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তিনি গরুকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে অভিশাপ দিলেন, “যতদিন ম্রো জাতি বর্ণমালা সংবলিত ধর্মীয় গ্রন্থ না পাবে, ততদিন পর্যন্ত তোমাদের (গরুর) শাস্তি হবে। গ্রামের মধ্যখানে লিম্পুতে (পাড়ার মাঝখানে) পিঞ্জরে আবদ্ধ করে, তোমাদের চারদিকে ঘুরে ঘুরে ম্রোরা সারারাত নাচবে, ভোরের ঊষারে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করবে তোমাদের। আর তোমাদের মিথ্যাশ্রিত জিহ্বা কেটে খুঁটির মাথায় গেঁথে রাখবে তারা। মিথ্যা বলায় এটাই তোমাদের ‘উপযুক্ত শাস্তি’।”
ম্রোদের বিশ্বাস এ ঘটনার পর থেকেই তারা গো-হত্যা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। পাশাপাশি তাদের সমাজে মিথ্যা বলা পাপের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এখন ম্রোদের অনেকেই ক্রামা ধর্ম গ্রহণ করেছে। এ ধর্মালম্বীদের বর্ণমালা ও ধর্মীয় গ্রন্থ রয়েছে। ফলে তারা গো-হত্যা থেকে বিরত থাকে।
ম্রোদের মতো এদেশে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষদের রয়েছে শত শত বছরের ঐতিহ্যে লালিত নিজস্ব আচার, উৎসব ও সংস্কৃতি। আমরা শিশুদের ঈশপের গল্প পড়তে উৎসাহিত করে থাকি। কিন্তু সমতল ও পাহাড়ের জাতিগুলোর লোককথা বা তাদের সাহিত্য কতটা তুলে ধরতে পেরেছি ওই প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যায়।
এদেশেই মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছে আমাদের পূর্বসূরীরা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিকে সারা পৃথিবীতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে আমাদের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আমাদের ‘শহীদ দিবস’ আজ সারা বিশ্বের ‘মাতৃভাষা দিবস’।
কিন্তু ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া শহীদদের এদেশে রক্ষা পাচ্ছে কি অন্য জাতির মাতৃভাষাগুলো? অন্য জাতির শিশুরা কি পড়ছে তাদের মায়ের ভাষায়? চলুন, একটু চোখ রাখি বিষয়টিতে।
বাংলাদেশে আদিবাসী ভাষাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৪টি ভাষাই বিলুপ্তির পথে। বান্দরবানে বসবাসরত ম্রো আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র দুজন নারী ও চারজন পুরুষ ‘রেংমিটচা’ ভাষায় কথা বলেন। তাদের মৃত্যুর পর এ ভাষাটি যেন হারিয়ে না যায় ওই কারণে বছর দুয়েক আগে রেংমিটচা ভাষার একটি ‘শব্দের বই’ প্রকাশ করেছেন ম্রো-ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো। কিন্তু ভাষাটি রক্ষায় কোনো সরকারি উদ্যোগের খবর আমরা পাইনি।
বাংলা ভাষার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলার অন্যান্য আদিবাসীদের ভাষা থেকে বহু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাভাষায়। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে। পণ্ডিতেরা মনে করেন, সাঁওতালি ভাষা বাংলা ভাষার ব্যাকরণে প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশি শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষা থেকে আগত। অথচ আজ হারিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী জাতির ওই ভাষাগুলোও। এরই মধ্যে কোচ ও রাজবংশীদের ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রায় পুরো বিলুপ্ত হয়ে গেছে আদিবাসীদের ‘কুড়ুখ’ ও ‘নাগরি’ ভাষা।
আসলে ভাষা যেমন একটি সতত প্রবহমান বিষয় তেমনি একই অঞ্চলের নানান গোষ্ঠীগুলোও পরষ্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের আদিবাসীদের অনেক ভাষাও তেমনি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে কয়েকটি ভাষা পরস্পর এতটাই ঘনিষ্ঠ যে এগুলোকে ‘উপ-ভাষিক’ বৈচিত্র্য বলা যায়। যেমন ‘তঞ্চঙ্গা’ মূলত ‘চাকমা’ ভাষারই অংশ, ‘রাখাইন’ মারমা ভাষার, ‘লালং’ বা ‘পাত্র’ গারো ভাষার এবং ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ মণিপুরী ভাষার এবং ‘হাজং’ ভাষাকে বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে অভিহিত করা যায়।
বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক, তিব্বতি-চীন, দ্রাবিড় ও ইন্দো-ইউরোপীয় সব ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাই রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাসমূহ দুটি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে মোন-খমের ও মুণ্ডারি শাখা। বাংলাদেশে এই শাখার ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাসি ভাষা। এ ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই। তবে বর্তমানে এ ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়।
তিব্বতি-চীনা ভাষাগোষ্ঠী আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। যেমন: বোডো, কুকি-চীন, সাক-লুইশ ও লোলো-বার্মিজ শাখা। মান্দি বা গারো, ককবোরক (ত্রিপুরা), লিঙ্গাম, পাত্র বা লালং, কোচ, রাজবংশী প্রভৃতি ভাষাসমূহ বোডো শাখার অন্তর্ভূক্ত। মৈতেয় বা মণিপুরি, লুসাই, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রো, পাংখো প্রভৃতি ভাষাগুলো কুকি-চীন শাখাভুক্ত।
বাংলাদেশের রাখাইন, ওঁরাওদের কুড়ুখ, পাহাড়িকা ও মাহালি ভাষা দ্রাবিড় ভাষা পরিবারে অন্তর্ভুক্ত। রাখাইন ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। রাখাইন ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। ওঁরাওদের কুড়ুখ ভাষাটি আদি ও কথ্য ভাষা। আর বাংলাদেশে ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত ভাষার মধ্যে বাংলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এই পরিবারে আদিবাসীদের মধ্যে চাকমা ভাষা এবং সাদরি ভাষাও রয়েছে। মণিপুরিদের বিষ্ণুপ্রিয়া, হাজং প্রভৃতি ভাষাও এই শ্রেণিভুক্ত।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছে ইউনেসকো। এজন্য ২০১৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষাবর্ষ’ ঘোষণার পর ‘২০২২-২০৩২’ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেসকো। কিন্তু সেটি পালনে সরকারি উদ্যোগগুলোর গতি তেমন নেই বললেই চলে।
বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন-২০১০’ প্রণয়ন করে। কিন্তু ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’ দেশের আদিবাসী ভাষাগুলোর যে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা জরিপ শুরু করেছিল, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এ দেশে কয়টি আদিবাসী জাতি আছে, তাদের ভাষার সংখ্যা কত—এসব ভাষার অবস্থাই বা কেমন, তা সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগের কোনো খবরও আমরা পাইনি।
ভাষা রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ তেমন না হলেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের বিষয়ে কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ রয়েছে। সরকার সব শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে প্রথম দফায় পাঁচটি মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং ওই অনুযায়ী শিশুদের পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করে ২০১২ সালে। এর জন্য প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথম দফায় পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো এই পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ চূড়ান্ত হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ম্রো, মণিপুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি, বমসহ ছয়টি ভাষায় এবং তৃতীয় পর্যায়ে কোচ, ওঁরাও (কুড়ুখ), হাজং, রাখাইন, খুমি ও খ্যাং ভাষার পর অন্যান্য ভাষাতেও প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে। ওই অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের ৫টি ভাষায় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতেই প্রাক-প্রাথমিকে আদিবাসী শিশুদের হাতে নিজ নিজ ভাষার বই তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি সম্ভব হয় ২০১৭ সালে।
এ বছর ওই পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠদানের বইও বিতরণ করা হয়। তা শুধু প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। চাকমা ও মারমাদের নিজস্ব হরফে বইগুলো লেখা হলেও বাকি জাতির বইগুলো লেখা হয়েছে বাংলা, ইংরেজি ও রোমান হরফে। ভাষা রক্ষায় এটিও ভালো উদ্যোগ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু ওই ভাষার শিক্ষক বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি কাজে আসছে না। একইভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকি ভাষাভাষীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজও চলছে ঢিমেতালে। ফলে সার্বিকভাবে আদিবাসী শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। অথচ একই দেশে বাঙালি শিশুরা পড়াশোনা করছে চিরচেনা মায়ের ভাষায়। তাই সবার জন্য মাতৃভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না।
আদিবাসী ভাষাগুলো কতটা বিপন্ন— এ নিয়ে কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস’-এর বাংলাদেশ শাখা প্রায় ৩০টি আদিবাসী ভাষার ওপর একটি জরিপ চালায়। জরিপ চলে ‘ফিশম্যান মানদণ্ড’ মোতাবেক। একটি ভাষার অবস্থা কী, সেটি বোঝাতে এই মানদণ্ডের রয়েছে আটটি স্তর। কোনো ভাষা চতুর্থ স্তরের পরের স্তরে চলে গেলেই ওই ভাষা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ওই মানদণ্ডের প্রথম স্তরের বিবেচনার বিষয় ছিল, ভাষাটি ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় কিনা। বিপন্নতার শুরু যে পঞ্চম স্তরে, সেখানে বিচার্য বিষয়— ভাষাটির মাধ্যমে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি এবং ওই ভাষায় সাহিত্য রয়েছে কিনা। বাস্তবতা হলো এই মানদণ্ড মোতাবেক বাংলাদেশের প্রায় সব আদিবাসী মাতৃভাষাই আছে বিপন্নের স্তরে।
নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ছাড়া শিক্ষাসহ অন্য কোনো কাজেই নিজ ভাষা ব্যবহার করতে পারে না আদিবাসীরা। আবার এসব ভাষায় বাংলা ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রবলভাবে। বয়সে প্রবীণ আদিবাসীরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নতুন প্রজন্ম তাদের ভাষাটির ব্যবহার তেমন একটা জানে না। দেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী চাকমাদের ভাষায় সাহিত্য রয়েছে। কিন্তু ওই সাহিত্য খুব কম লোকের কাছেই পৌঁছেছে। জরিপে অংশ নেওয়া চাকমাদের পঞ্চাশ শতাংশ বলেছে, তারা নিজ ভাষার নানা উপকরণ পড়েছে; কিন্তু সেগুলো তাদের কঠিন মনে হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ বলেছে, শুধু প্রার্থনার সময় তারা মাতৃভাষা ব্যবহার করে।
‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস’-এর জরিপে দেখা যায়, আদিবাসীরা প্রয়োজনীয়তার চাপে পড়ে নিজ মাতৃভাষা থেকে এখন বাংলাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে এর প্রভাব সমতলের আদিবাসীদের মধ্যেই বেশি। সাঁওতালদের ৪৯ শতাংশই মনে করে, নিজ মাতৃভাষার চেয়ে আজ বাংলাই বেশি প্রয়োজনীয়। উত্তরবঙ্গের কোদা ও কোল জাতির কেউই এখন আর নিজ ভাষায় পড়তে বা লিখতে পারে না। একই অবস্থা টাঙ্গাইলের কোচ ও দিনাজপুরের কড়া, ভুনজার, মুসহরদের।
আবার বেশিরভাগ আদিবাসী তাদের মাতৃভাষা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনে দ্বিতীয় আরেকটি ভাষা হিসেবে বাংলা জানে বা লিখতে বাধ্য হয়। কেউ কেউ তিনটি ভাষাও জানে। যেমন, বান্দরবানের খুমিরা নিজ ভাষা ছাড়াও মারমা ও বাংলা জানে। উত্তরবঙ্গের ওরাওঁরা বাংলা, সাঁওতালি এবং সাদরি ভাষায় কথা বলে।
সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা— এই পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠী ছাড়া অন্যদের ভাষা বিপন্নের দ্বারপ্রান্তে। ঘরের মধ্যে ছাড়া তাদের মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্মের আদিবাসীরা শিক্ষার সুযোগ ও বাস্তবতার কারণে নিজের ভাষার চেয়ে বাংলা ও ইংরেজি চর্চাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ফলে এখন আদিবাসীদের ভাষার উচ্চারণে শুধু পরিবর্তনই ঘটছে না; বরং তাদের শব্দভাণ্ডারে অনেক বাংলা শব্দও স্থান করে নিয়েছে। আবার যেসব আদিবাসী দীর্ঘদিন ধরে শহরে বসবাস করছে, পারিপার্শ্বিকতার নানা কারণে তাদের মাতৃভাষা আজ তারা প্রায় ভুলতে বসেছে।
তাই নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষায় আদিবাসীদের নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে প্রথমে। কোনো কোনো অঞ্চলে তেমন কিছু উদ্যোগের খবরও পাই আমরা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত ‘চাকমা বর্ণমালার জন্য ইনজেবের লড়াই’ শিরোনামে সমির মল্লিকের প্রতিবেদনটি বেশ প্রেরণাদায়ক। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে ১৯ বছর ধরে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে চাকমা বর্ণমালা শিখিয়েছেন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার পূর্ব কাঠালতলী গ্রামের তরুণ কৃষক ইনজেব চাকমা। মাতৃভাষার প্রচারের জন্য ‘নোয়ারাম চাকমা সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। এর মাধ্যমে খাগড়াছড়ি ছাড়াও রাঙামাটি ও বান্দরবানের তিন পার্বত্য জেলায় ২১৮টি কেন্দ্রের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ১১৮ জনকে চাকমা বর্ণমালা শেখান ইনজেব ও তার সংগঠন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, হেডম্যান, কারবারি ও চেয়ারম্যানদেরও চাকমা বর্ণমালা শেখানো হচ্ছে। ইনজেবের লক্ষ্য, ২০৫০ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চার লাখ ৮৩ হাজার চাকমার সকলকে নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নিজ জাতির মাতৃভাষা রক্ষায় ইনজেবের এই উদ্যোগ অন্য আদিবাসী জাতিগুলোর জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে।
ভাষা রক্ষায় আদিবাসী পরিবারগুলোকে মাতৃভাষার চর্চা অব্যাহত রাখা জরুরি। এ ছাড়াও প্রয়োজন অতিদ্রুত আদিবাসীদের ভাষাগুলো সুরক্ষার পাশাপাশি আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান পুরোপুরি নিশ্চিত করা, আদিবাসী এলাকায় বিদ্যালয় স্থাপন এবং সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ। আর এজন্য সত্যিকার আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। তবেই ভাষার এ দেশে রক্ষা পাবে সব জাতির মাতৃভাষা। তা না হলে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের স্বীকার হয়েই থাকবে আদিবাসী ভাষা, সাহিত্য ও শিশুশিক্ষা।