Published : 07 Jul 2025, 03:07 PM
আজকের দিনে আমরা আয়করকে একটি আধুনিক ও ন্যায্য রাষ্ট্রচর্চার অংশ হিসেবে দেখি। নাগরিকদের অংশগ্রহণ, কল্যাণমূলক ব্যয় এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের জন্য কর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া—এই ধারণা আমাদের চিন্তায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, আয়কর ব্যবস্থার উদ্ভব গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির ধারক হিসেবে নয়; বরং এটি গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণমূলক কাঠামোর মধ্য দিয়ে।
ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন ব্রিটেনে আয়কর ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল, তখনই উপনিবেশ ভারতবর্ষে ১৮৬০ সালে প্রথম সংগঠিত আয়কর ব্যবস্থা চালু করে ব্রিটিশ সরকার। এর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায়, ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন এই নতুন কর প্রণয়ন করেন। এই করব্যবস্থার আওতায় বার্ষিক মাত্র ২০০ রুপি আয় হলেই কর দিতে হতো, যার হার নির্ধারিত হয়েছিল ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত। (‘হাউ ব্রিটিশ রুল চেঞ্জড ইন্ডিয়াস ইকোনমি: দ্য প্যারাডক্স অফ দ্য রাজ’— তীর্থঙ্কর রায়, ২০১৯)। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহ দমনের খরচ আদায় করা এবং ঔপনিবেশিক শাসনকে নিজের আয়েই পরিচালনাযোগ্য করে তোলা।
এই ঘটনা নিছক কর আরোপের সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল এক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল, যার ভিত্তিতে বলা হতো, উপনিবেশগুলোকে নিজেদের শাসনের খরচ নিজেরাই বহন করতে হবে। (‘কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড মডার্ন সোশ্যাল থিওরি’— জন হোমউড ও জি. কে ভামব্রা, ২০২১)। এই নীতির বাস্তবায়নে উপনিবেশবাসীরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই কর দিচ্ছিল, যেখানে ব্রিটিশ নাগরিকরা তখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী আয়কর ব্যবস্থার অধীনে ছিল না। ব্রিটেনে স্থায়ী আয়কর চালু হয় ১৯১৪ সালে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খরচ মেটাতে সেটি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। (‘ট্রাস্টিং লেভিয়াথন: দ্য পলিটিক্স অফ ট্যাক্সেশন ইন ব্রিটেন’, ১৭৯৯-১৯১৪— মার্টিন ডন্টন, ২০০১)।
এই দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরে এক গভীর রাজনৈতিক বৈষম্য: যারা কর দিচ্ছে, তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো কণ্ঠস্বর নেই। এই বাস্তবতায় আয়কর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক অঙ্গ নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের একটি নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ভামব্রা ও হোমউড তাদের ‘কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড মডার্ন সোশ্যাল থিওরি’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের যেসব ভিত্তি আমরা আজ ‘নাগরিকত্ব’, ‘আমলাতন্ত্র’ বা ‘কল্যাণনীতি’ হিসেবে জানি, তার অনেকটাই গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা ও অনুশীলন থেকে। উপনিবেশগুলো হয়ে উঠেছিল একেকটি পরীক্ষাগার, যেখানে কর আদায়, জনশুমারি, শৃঙ্খলা, আইন প্রয়োগ এবং সমাজ নিয়ন্ত্রণের নানা পদ্ধতির চর্চা হতো। এইসব পদ্ধতি পরে ইউরোপে আমদানি করা হয় আরও পরিশীলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ হিসেবে। (‘দ্য কলোনিয়াল স্টেট অ্যাজ আ সোশ্যাল ফিল্ড’, জর্জ স্টেইনমেটজ, ২০০৮)।
গবেষক প্রিয়া সাতিয়া এবং মনু গোস্বামী দেখিয়েছেন, কীভাবে ভারতসহ উপনিবেশগুলো থেকে আদায়কৃত রাজস্ব সরাসরি ব্রিটেনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হতো—বিশেষত রেলপথ নির্মাণ, শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কল্যাণনীতির ভিত্তি নির্মাণে। কিন্তু একইসঙ্গে উপনিবেশবাসীদের জন্য এই করব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল একপাক্ষিক ও অবিচারপূর্ণ একটি শোষণমুখী কাঠামো—যেখানে ছিল না কোনো সামাজিক সুরক্ষা বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। (‘টাইম'স মনস্টার: হাউ হিস্টোরি মেকস হিস্টোরি’, প্রিয়া সাতিয়া, ২০২০; ‘প্রডিউসিং ইন্ডিয়া: ফ্রম কলোনিয়াল ইকোনমি টু ন্যাশনাল স্পেস,’ মনু গোস্বামী, ২০০৪)
ভারত ছাড়াও, আফ্রিকার নানা উপনিবেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘পোল ট্যাক্স’ বা মাথাপিছু কর চালু করা হয়। এসব কর ছিল রিগ্রেসিভ, অর্থাৎ ধনী-গরিবের ভেদাভেদ না করে সকলের ওপর সমানভাবে চাপানো হতো এবং প্রায়শই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আদায় করা হতো। আবার আমেরিকার ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতেও স্ট্যাম্প অ্যাক্ট ও সুগার অ্যাক্টের মাধ্যমে কর আরোপ করা হয়েছিল, যা ছিল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়া করের ক্লাসিক উদাহরণ—যা রীতিমতো একটি বিপ্লব ডেকে আনে।
এইসব ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো একরকম সহিংস, অসম ও ঔপনিবেশিক বিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতা থেকে চোখ সরিয়ে রাখা মানে ইতিহাসের এক বড় অংশকে উপেক্ষা করা। ভামব্রা ও হোমউড এই বাস্তবতার স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাব করেন ‘রিপারেটিভ সোশিওলজি’—একটি ধারণা যা আমাদের বলে, রাষ্ট্রিক তত্ত্ব ও সমাজচিন্তার কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে হবে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে।
এইসব তথ্য মনে করিয়ে দেয়, উপনিবেশিত জনগণ শুধু শ্রম বা সম্পদ নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক আর্থিক ব্যয়ও বহন করেছে। অথচ ওই রাষ্ট্রই পরে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ইতিহাসের এই অংশটুকু জানার এবং বুঝে নেওয়ার মধ্য দিয়েই সম্ভব হবে একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সত্যনিষ্ঠ রাষ্ট্রিক কাঠামোর কল্পনা।