Published : 04 Jul 2025, 06:26 PM
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হলো। এর আগেও ২০১৩ ও ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন হয়, কিন্তু কোনোটাই ২০২৪-এর মতো সরকার পতন পর্যন্ত গড়াতে পারেনি। তবে, নিয়মিত বিরতিতে এই আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, কোটা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘকালীন গভীর অসন্তুষ্টি, বিভাজন ও ন্যায়-অন্যায় দ্বন্দ্ব বিরাজমান রয়েছে।
২০২৪-এর আন্দোলনে সম্ভবত সবচেয়ে উচ্চারিত স্লোগান ছিল, ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা’। আন্দোলন চলাকালীন একটি ভিডিওতে এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের নারীরা আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে, আমাদের এখন আর নারী কোটার দরকার নেই।” ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই এর সাথে সহমত পোষণ করেন। আলোচনা চলে, যেখানে দীর্ঘদিন দুজন নারী দেশ শাসন করেছেন, সেখানে নারীদের আর বৈষম্যের শিকার বলা চলে না। কিন্তু তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা খেয়াল করেননি, ওই দুই নারী প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পারিবারতন্ত্র রয়েছে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নেতৃত্বে এসেছিলেন—নারী কোটায় নন। ফলে তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের নারীদের বাস্তব অবস্থার প্রতীক নন।
বাংলাদেশে কোটা নিয়ে চলমান আন্দোলন ও বিতর্ক প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের গভীর ব্যর্থতার প্রতিফলন। রাষ্ট্র আজও একটি তথ্যভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তঃসম্পর্কীয় কোটানীতির রূপরেখা নির্মাণ করতে পারেনি। বরং রাজনৈতিক চাপে, জনপ্রিয়তাবাদের মোহে, কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের সুবিধাবাদীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একের পর এক দায়সারা কোটানীতি করা হয়েছে। ফলে, যারা প্রকৃতপক্ষে কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার, তাদের অধিকার নিশ্চিত হয়নি, বরং নতুন করে প্রান্তিকায়িত করা হয়েছে।
‘কোটা না মেধা’ এই দ্বিমুখী স্লোগান এক ধরনের বাইনারি তৈরি করেছে, যেখানে অন্তর্ভুক্তিকে মেধার বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ, এই বিতর্কগুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি নতুন, তথ্যভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক কোটা নীতিব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারত।
কিন্তু দেখা গেল, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ, নতুন সরকারের নেতৃত্বে যেভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ জনের একটি কমিটি ঘোষণা করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়, তা সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতির ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে তড়িঘড়ি, প্রশ্নবিদ্ধ ও দায়সারা আচরণ বলে মনে হয়। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে কোটার সংখ্যা কমিয়ে ৭% করা হয়, যার মধ্যে ৫% মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য, ১% আদিবাসীদের জন্য এবং ১% প্রতিবন্ধী ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষদের জন্য নির্ধারিত। বিলুপ্ত করা হয়েছে নারী ও জেলা কোটা।
এই সুপারিশ থেকে প্রতীয়মান হয়, নীতিনির্ধারকরা এখনো প্রতিনিধিত্বকে একটি সংখ্যাগত সমীকরণে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন। নারীদের কোটা বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ওই কমিটি মনে করেন বাংলাদেশে জেন্ডারসমতা অর্জিত হয়েছে। অথচ, বাস্তবে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণে রয়েছে বহু বাধা, রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের প্রতিকূলতা।
একইভাবে, প্রতিবন্ধী ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষদের একত্রে মাত্র ১% কোটায় ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র কার্যত এই দুই ভিন্ন পরিচয়ের জটিল বাস্তবতাকে মুছে দিয়েছে।
আরও স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক সাংস্কৃতিক ও ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় আদিবাসী জনজাতিকে একটিমাত্র শতকরা অংশে সীমাবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে নামমাত্র প্রতিনিধিত্বের প্রতীকী দায় মেটানো হয়েছে। কোন জনগোষ্ঠী কী ধরনের কাঠামোগত বঞ্চনার মধ্যে থাকে, তা বিবেচনা না করে এ ধরনের সাংখ্যিক কোটা বরাদ্দ দেয়া হলে তা নীতি সহিংসতায় পর্যবসিত হয়।
প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো জনমত জরিপ হয়েছে কি? একইসাথে সমাজবিজ্ঞানী, জননীতি বিশ্লেষক এবং কোটা সংশ্লিষ্ট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল কি? যদি দুটির উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এটি সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, গণতান্ত্রিক নয়। অথচ, এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক রূপ দেয়ার জন্যই তো লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল দিনের পর দিন!
আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, এই সংস্কারে কী ধরনের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে? প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা বা প্রয়োজন কি বিবেচিত হয়েছে, নাকি শুধুই সংখ্যাগত যুক্তি ও রক্ষণশীল মূল্যবোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া না গেলে, এই সংস্কারকে কখনোই ন্যায্য বলা যাবে না।
‘কোটা না মেধা—মেধা, মেধা’ স্লোগানে কোটা নিয়ে যে বিভাজনমূলক আলাপ আমরা দেখেছিলাম, তার প্রেক্ষাপটে নতুন এই প্রজ্ঞাপন হয়তো একটা যুক্তিসঙ্গত আপস মনে হতে পারে। তবে কোটা ব্যবস্থা বিলোপ নিয়ে যে পরিমাণ জনসমর্থন আমরা দেখতে পাই, ২০১৮ সালে সকল কোটা বিলোপ করা হলে কোটা বঞ্চিতদের আন্দোলনের আমরা তেমন কোনো সামাজিক সহমর্মিতা বা গণজাগরণ দেখিনি।
ওই সময় ঢাকায় শহীদ মিনারের সামনে কিছু আদিবাসী শিক্ষার্থী প্রতিবাদ জানালে, তা পত্রিকায় ও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সহমর্মিতার বদলে তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা হয় এভাবেই, ‘উপজাতিরা নিজেদেরকে উপজাতি বলতে চায় না, কিন্তু উপজাতি কোটা পাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়ায়’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমেও আদিবাসী শিক্ষার্থীদেরকে টিটকারির শিকার হতে হয়। যদিও এই টিটকারি নতুন নয়, কিন্তু সেবার আদিবাসীদের পক্ষ থেকে সম্মিলিত অবস্থান নেয়ায় তা আরও দৃশ্যমান হয়েছিল। অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লজ্জায় শহীদ মিনারে দাঁড়াননি।
এই ঘটনাগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে অলক্ষ্যণীয়, অগুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের ধারাবাহিকতায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে থাকে এবং প্রশ্ন তৈরি হয়, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরেও আমরা কেন এখনো একটি তথ্যভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য কোটানীতি তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম?
অথচ, কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার জন্য সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, চাকরি ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। আবার, যুদ্ধ বা সংঘাত পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনেও এটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা হিসাবে দরকার পড়ে। শেষোক্তটির উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশের কথাই বলা যাক। ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত দেশে দরকার পড়েছিল ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্গঠন ও বিশ্বস্ত নাগরিক দিয়ে প্রশাসন গঠন। তাই তখন সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ ছিল একটি ‘নৈতিক অর্থনীতি’ নির্ভর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
পরবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে নারী, জেলা, জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী জন্য ও সর্বশেষ লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের জন্য কোটা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনার অভাবে একসময় এটি রাজনৈতিক দরকষাকষিতে পর্যবসিত হয় এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’র অবিবেচিত প্রয়োগে পরিচয়কেন্দ্রিক ক্ষমতার হায়ারার্কি তৈরি হয়।
প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য তৈরি নীতি ধীরে ধীরে উত্তরাধিকারভিত্তিক সুবিধা-ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যা আদর্শ কোটানীতির মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু এর প্রতিকার করতে কোটা বাতিল কিংবা আপোষমূলক সাংখ্যিক বরাদ্দ কোনো সমাধান নয়। দরকার একটি সুস্পষ্ট, পরিকল্পিত, সুসংহত, তথ্যভিত্তিক ও বিবর্তনশীল কোটানীতির রূপরেখা তৈরি করা।
এখানে ‘বিবর্তনশীলতা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, কোটার কার্যকারিতা সময়বিশেষে পর্যালোচনার দাবি রাখে যাতে কতটা অন্তর্ভুক্তি হয়েছে তা পরিমাপ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার আনা যায়।
এ জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘জাতীয় কোটা বিষয়ক কমিশন’ গঠন করা, যেখানে সমাজবিজ্ঞানী, জননীতি বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা থাকবেন। এই কমিশনের কাজ হবে সময়ভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও নীতিসংক্রান্ত সুপারিশ প্রদান করা।
এছাড়া, বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো এর ইন্টারসেকশনালিটির অভাব অর্থাৎ মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয়ের একটি সংবেশিত তুলনামূলক পর্যালোচনার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, জাতিগতভাবে সংখ্যালঘুদের জন্য ১% কোটা বরাদ্দ রয়েছে, কিন্তু ওই কোটায় কোন জনগোষ্ঠী কী পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত হবে তা স্পষ্ট নয়। অথচ, পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন ম্রো ও একজন চাকমা শিক্ষার্থীর বাস্তবতা ভিন্ন। আবার, উত্তরবঙ্গে কোনো কোনো আদিবাসী জাতিকে অচ্ছুৎ হিসাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতেই দেয়া হয় না। আবার, জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য এতে আরও মাত্রা যুক্ত করে। কোনো পরিবারের শিক্ষাখরচ বহনের ক্ষমতা কম থাকলে, ছেলে সন্তান অগ্রাধিকার পায়, মেয়েটি নয়।
এই বৈচিত্র্যময় বঞ্চনাকে উপেক্ষা করে, ‘এক কোটা সবার জন্য’ দিয়ে নীতি বানালে, তা বৈষম্য নিরসন নয়, বরং পুনর্বৈষম্য তৈরি করে।
তাই কোটার আদর্শ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বৈষম্যকে আন্তঃসম্পর্কীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবেচনা করতে হবে। এই নীতিতে কেবল চাকরির জন্য আসন সংরক্ষণ নয়, ওই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও সমতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাবৃত্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা—এসব সহযোগী উদ্যোগ কোটাকে টেকসই নীতিতে রূপ দেবে।
আমাদের কোটা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো স্বচ্ছতার অভাব, যার ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া পরিচয়, দালালচক্র দিয়ে সুযোগ নেয়ার ঘটনা ঘটে, আবার অন্যদিকে সত্যকারের প্রান্তিকরা বঞ্চিত হয়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য দরকার একটি ‘উন্মুক্ত ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রি’, যেখানে নিয়োগ ও কোটার হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য থাকবে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। এছাড়া, প্রতিটি কোটার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সানসেট ক্লজ থাকা উচিত। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময় পরপর পুনর্মূল্যায়ন করে দেখা হবে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অবস্থার কতটা উন্নয়ন ঘটল।
এই ফলাফলনির্ভর বিশ্লেষণের জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ইউএন উইমেন-এর ডেটাবেইজ অনুযায়ী, নেপাল ৫০% কোটা দিয়ে ৩৩.৫ নারী সংসদ সদস্য নিশ্চিত করেছে, পাকিস্তান ১৭% দিয়ে ১৭%। ভারতের লক্ষ্য ৩০% হলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে মাত্র ১৩.৮ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছে। আর যে উগান্ডাকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রায়শ মিম বানিয়ে হাসাহাসি করা হয়, সেখানে ২২% কোটা দিয়ে ৩৪.১% নারীর অংশগ্রহণ অর্জিত হয়েছে। আর, বাংলাদেশে ১৪% সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও তার কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল, তথ্য ও মূল্যায়ন অনুপস্থিত। এ ধরনের অস্পষ্টতার কারণে নীতিনির্ধারণ হয়ে পড়ে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে আমরা জানি না আমাদের কী দরকার এবং কোন পথে এগোচ্ছি।

লিঙ্গভিত্তিক কোটার প্রয়োগে সাম্প্রতিক সময়ে রুয়ান্ডা রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি নারী প্রতিনিধিত্বশীল দেশ। দেশটিতে বর্তমানে পার্লামেন্টে নারীর অংশগ্রহণ ৬৪%, যা তাদের সংবিধানের নির্ধারিত ৩০% সংরক্ষিত কোটা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতির সম্মিলিত প্রতিফলন। এই প্রতিনিধিত্বের ফলাফলস্বরূপ নারীর শিক্ষা, উত্তরাধিকার আইন, পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে। অথচ, খুব বেশি দিন হয়নি, রুয়ান্ডা তাদের ‘সবার অংশগ্রহণে রাষ্ট্র’ দর্শন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে মাত্র ২০ বছরে এই লিঙ্গসমতা অর্জন করে, যদিও স্থানীয় পর্যায়ে এখনো চ্যালেঞ্জ থাকলেও রুয়ান্ডা তাদের প্রতিশ্রুতিতে বদ্ধপরিকর। এ থেকে বোঝা যায়, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসন থাকে, তবে প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত শক্তি সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারে।
অথচ, স্বাধীনতার প্রায় ৫৫ বছরেও এখনো কোটার কার্যকারিতা ও ফলাফল নিয়ে তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের বুঝতে হবে, প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়ন, দুটো আলাদা বিষয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন তা বৈষম্যের বৈচিত্র্যতাকে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
‘কোটা না মেধা’—এই বিভাজনমূলক স্লোগানের পরিবর্তে আমাদের নতুন জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করতে পারি, যেখানে মেধা ও সুযোগ পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক হয়ে একটি ন্যায্য সমাজ নির্মাণে সহায়ক হয়ে উঠবে?