Published : 20 May 2026, 12:28 AM
শেরপুর সীমান্ত সড়কে কর্মরত এক প্রকৌশলী সম্প্রতি একটি বাস্তব সমস্যা সামনে আনলেন। কয়েক দিনের মধ্যে কুড়িটির বেশি ট্রাফিক সাইনবোর্ড নতুন করে বসাতে হয়েছে—প্রতি রাতে হাতির পাল এসে সেগুলোয় গা ঘষছে, আর চাপে খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ছে। দিনে স্থাপন, রাতে উৎপাটন; চক্রটি চলছে নিয়মিতই। করদাতাদের টাকায় দিনের পর দিন একই খুঁটি বসানো হচ্ছে, আর প্রতি সকালে সেই খুঁটি পড়ে থাকছে সড়কের পাশে।
প্রথম দেখায় এটিকে 'ভাঙচুর' মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তা নয়। হাতিরা যা করছে, তা তারা শত শত বছর ধরে করে আসছে। শেরপুর–মেঘালয় সীমান্ত অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন হাতি-চলাচল করিডোর। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া ও এলিফ্যান্ট ফ্যামিলির যৌথ উদ্যোগে ২০১৭ সালে প্রকাশিত Right of Passage: Elephant Corridors of India (দ্বিতীয় সংস্করণ) প্রতিবেদনে ভারতে সক্রিয় ১০১টি হাতি-করিডোর চিহ্নিত হয়েছে; এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতেই রয়েছে ২৩টি, যেগুলোর কয়েকটি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে চিহ্নিত করিডোরের সংখ্যা ১২টি। এমন একটি করিডোরের মাঝখান দিয়েই শেরপুর সীমান্ত সড়ক নির্মিত হয়েছে এবং সড়কের পাশে, ঠিক হাতির শরীরের উচ্চতায়, চকচকে গোলাকার স্টিলের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় তিন টন ওজনের একটি প্রাণীর কাছে এগুলো ট্রাফিক অবকাঠামো নয়; বরং কার্যত আদর্শ গা-চুলকানোর স্থাপনা।
অর্থাৎ সমস্যাটি হাতির আচরণে নয়, প্রকৌশল নকশার পূর্বানুমানে। বাংলাদেশে সড়ক অবকাঠামো পরিকল্পনায় ভূপ্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর চলাচল-পথের মতো প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক নকশা-পর্বে যথাযথ গুরুত্ব পায় না। শেরপুরের ভেঙে পড়া সাইনবোর্ড সেই গুরুত্বহীনতার একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু পরিমাপযোগ্য পরিণতি।

অথচ সমাধান প্রকৌশলগতভাবে কঠিন নয়, ব্যয়বহুলও নয়। সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হবে সংবেদনশীল করিডোর-অংশে সাইনবোর্ডকে মাটি-সংলগ্ন খুঁটি থেকে সরিয়ে সড়কের ওপর ঝুলন্ত গ্যান্ট্রি বা উঁচু কাঠামোতে স্থাপন করা, যেন তা হাতির শরীরের নাগালের বাইরে থাকে। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বান্দিপুর–মুদুমালাই করিডোরে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঊর্ধ্ব-স্থাপিত সাইন ব্যবহৃত হচ্ছে। যেসব স্থানে মাটি-সংলগ্ন পোস্ট অপরিহার্য, সেখানে গোলাকার পোস্টের পরিবর্তে চারকোনা বা বহুভুজ পোস্ট ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে বন্যপ্রাণী-অবকাঠামো গবেষণায়; কোণাযুক্ত পৃষ্ঠ গা-ঘষার জন্য তুলনামূলক অস্বস্তিকর বলে পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তা ছাড়া পোস্টের ভিত্তি আরও গভীর ও দৃঢ় করা সম্ভব, যেন আকস্মিক ধাক্কাতেও সম্পূর্ণ পোস্ট উপড়ে না যায়।

মরিচ-গ্রিজ বা পাটের আবরণের কথাও প্রায়ই আসে। তবে সেটি মূলত ফসল বা গোলার দিকে আসা হাতিকে ঠেকানোর পদ্ধতি—যে হাতি খাবারের সন্ধানে শুঁড় বাড়িয়ে এগোয়। গা-চুলকাতে আসা হাতি ভিন্ন উদ্দেশ্যে আসে; তাই এই পদ্ধতি সাইনবোর্ডের জন্যও একইভাবে কাজ করবে কি না, তা স্থানীয় পরিসরে পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
খরচের দিকটিও বড় বাধা নয়। একটি সাইনবোর্ডের গড় আয়ু কয়েক দিন থেকে কয়েক মাসে উন্নীত হলে পুনঃস্থাপনের সামগ্রী, শ্রম ও পরিবহন বাবদ বার্ষিক যে ব্যয় বাঁচবে, তাতেই গ্যান্ট্রি বা চারকোনা পোস্টের বাড়তি বিনিয়োগ এক বছরের মধ্যে উঠে আসবে। আইইউসিএন-এর এশিয়ান এলিফ্যান্ট ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (AsETWG) ২০২৪ সালে প্রকাশিত Handbook to Mitigate the Impacts of Roads and Railways on Asian Elephants-এও সড়ক ও রেলপথের মতো linear infrastructure-এ বন্যপ্রাণী-বান্ধব নকশার ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, প্রকৌশল সমাধান হাতের নাগালে থাকা সত্ত্বেও সেগুলো প্রয়োগে বাধা কোথায়? বাধা মূলত প্রশাসনিক মূল্যায়ন-কাঠামোয়। বর্তমান ব্যবস্থায় সাফল্যের মাপকাঠি হলো ‘কয়টি সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে’, ‘সেগুলো কয়দিন টিকে থেকেছে’ নয়। ফলে একই সাইন বারবার বসালেও কাগজে কাজের অগ্রগতি দেখা যায়। বাস্তবে যা প্রকৌশলগত পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন, প্রশাসনিক প্রতিবেদনে তা কর্ম-অগ্রগতি হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে যায়। সাফল্যের মাপকাঠিটিই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের জাতীয় হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা ২০১৮–২০২৭-এ মানুষ-হাতি সংঘাত নিরসনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বন বিভাগের মধ্যে হাতি-করিডোরে অবকাঠামো নকশার যৌথ মানদণ্ড আজও তৈরি হয়নি। এই শূন্যতা পূরণের জন্য বড় বাজেট কিংবা বিশেষ আইনি কাঠামোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল আন্ত-দপ্তরীয় সমন্বয় এবং কয়েকটি প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা।

ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকেই শুরু করা সম্ভব। শেরপুর সীমান্ত সড়কের দুই-তিন কিলোমিটার অংশে কয়েক ধরনের নকশা পাশাপাশি বসানো যেতে পারে—কিছু পুরোনো গোলাকার পোস্ট, কিছু চারকোনা পোস্ট, কিছু উঁচু গ্যান্ট্রি-নির্ভর সাইন। নব্বই দিনের পর্যবেক্ষণ শেষে ফলাফল প্রকাশ পেলে কোন নকশা কতটা কার্যকর, তা তথ্যপ্রমাণসহ নথিভুক্ত হবে। ব্যয় বাড়বে সামান্যই, অথচ ভবিষ্যৎ সড়ক-প্রকল্পের জন্য একটি প্রমাণ-ভিত্তিক মানদণ্ড দাঁড়িয়ে যাবে।
শেরপুরের পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের আরও বেশ কিছু সড়ক একইভাবে হাতি-করিডোরের ওপর দিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চুনতি, ফাঁসিয়াখালী ও মেধাকচ্ছপিয়া করিডোর; কেরানীরহাট–বান্দরবান মহাসড়ক ললুতিয়া-বরদুয়ারা করিডোর; লামা সড়ক ফাঁসিয়াখালী-মানিকপুর করিডোর; এবং কক্সবাজার–টেকনাফ মহাসড়ক তুলাবাগান-পেনেরছড়া করিডোর অতিক্রম করেছে। সদ্য নির্মিত দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথের ক্ষেত্রেও একই কাঠামোগত প্রশ্ন উঠে এসেছে। হাতির চলাচল-পথ বদলাবে না, সড়কও সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। তাই সমন্বয়ের কাজটি অবকাঠামো পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা এখন আর কেবল সংরক্ষণের বিষয় নয়, প্রকৌশল-পরিকল্পনারও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন।
শেরপুরের সেই সহকর্মী সম্ভবত নকশা বদলানোর পক্ষেই থাকবেন। কারণ একই সাইন তিনি ইতিমধ্যে কুড়িবারের বেশি বসিয়েছেন।