Published : 22 Feb 2026, 08:44 PM
শহীদ মিনার এখন আর শোক ও শক্তির প্রতীক নেই। হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক কুশীলবদের রঙ্গমঞ্চ। একদিকে প্রগতিশীলতার মোড়কে রক্ষণশীলতাকে তুষ্ট করার চেষ্টা, অন্যদিকে আদর্শিক বিপরীত মেরুর নেতাদের হঠাৎ ‘সেকুলার’ সাজার অভিনয়—সব মিলিয়ে একুশের চেতনা এখন কেবলই ‘কোনো কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কৌশল নির্ধারণের রাজনীতি’ যেন।
একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানালেন, পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে দোয়াও করলেন। শহীদ মিনারে দোয়া করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়, তবে মনে হচ্ছে, এখন থেকে এটা রীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি ছিল বেশ আগ্রহ ও কৌতূহল জাগানিয়া। জামায়াতের আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান মূলত এই কৌতূহল জাগাতেই গিয়েছিলেন। এটা তাদের বাংলাদেশের প্রগতিশীল মনোভাবের লোকজনের মন জোগানোর রাজনৈতিক কৌশল।
রাজনীতিবিদরা যখন রাজনৈতিক আচরণ করেন তখন কেবল নিজেদেরই বোধহয় রাজনৈতিক সত্তা মনে করেন। প্রতিপক্ষ, এমনকি সাধারণ মানুষও যে রাজনৈতিক সত্তা তা তারা ভুলেই যান। তাদের মনে থাকে না যে, তারা যেমন রাজনৈতিক আচরণ করতে পারেন, সাধারণ ও বোকাসোকা জনগণও তেমনই রাজনৈতিক আচরণ করতে পারে। রাজনীতিতত্ত্বে পপুলিজম মানে ‘জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব দাবি’। ওই দাবি রাজনীতিবিদরা দমে দমেই করেন। জনগণকে তারা প্রয়োজনে একক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করলেও এটাও জানেন যে জনগণ কখনোই একক নয়।
ধর্মীয়, প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদী—বিভিন্ন স্তরের মনস্তত্ত্ব আছে জনগণের। যে কারণে শহীদ মিনারে গিয়ে দোয়া করলে একপক্ষ খুশি। সর্বস্তরে বাংলাভাষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানালে আরেক পক্ষ খুশি। ইউনেসকো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ২১ ফেব্রুয়ারির বদলে ৮ ফাল্গুন দিয়ে পুনঃস্থাপন করার কথা বললে অন্য আরেক পক্ষ খুশি। এই খুশি করার ব্যাপারগুলো সরকার ও বিরোধীদলের রাজনীতিবিদরা জাতীয় মান ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে, অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, রাষ্ট্রীয় আচরণবিধি, সাংবিধানিক রেওয়াজ এবং নাগরিক আচারের মধ্য থেকে করলেই বরং সুন্দর দেখায়।
আমাদের নতুন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ একুশে ফেব্রুয়ারির এক আয়োজনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তৃতীয় ভাষা হিসেবে আরবি ভাষা প্রচলনের ওপর জোর দিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলার জন্য হয়তো এই পরিকল্পনা তার সরকারের, পরিকল্পনা ঠিকই আছে। কিন্তু তার এই কথা শুধু ওই কারণেই নয়। এটাও কিন্তু কোনো একটা পক্ষের মন জোগানোর জন্যই বলা। এগুলো আসলে রাজনীতির ‘অডিয়েন্স টার্গেটিং স্ট্রাটেজি’। রাজনীতি তাদের কাছে এখন কেবল ‘ম্যাস আইডিওলজি’ নয়, বরং তা ‘মাইক্রো টার্গেটেড ইমোশনাল মেসেজিং’।
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা মাসুদ সাঈদী বাংলা ভাষার ওপর জোর দিতে গিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ৮ ফাল্গুন শহীদ দিবস করার ওপর জোর দিলেন। ইউনেসকোর ঘোষণার পর একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর কেবল আমাদের নয়, সারা বিশ্বের, একুশ এখন বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক। এই আন্তর্জাতিকীকৃত জাতীয় স্মৃতিকে আবার স্থানিক বা লোকালাইজ করার কথা বললে কোনো পক্ষের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস বাড়ে, রাজনৈতিক আবেগ জাগে এবং জাতীয় স্মৃতির পুনর্বিন্যাস হয়। এতেও একটা পক্ষ খুশি।
একুশে ফেব্রুয়ারির এক আয়োজনে আদালত ও উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থাসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিলেন খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী। তিনিও চাইলেন ভাষা জাতীয়তাবাদীদের আবেগকে উসকে দিতে। চাইলেন একটা পক্ষের মন জয় করতে।
এই কয়েকটি ঘটনা ও নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় কী? খেয়াল করলে দেখবেন, যাদেরকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির লোক ভাবি, তারা প্রগতিশীলতার পক্ষে বয়ান দিচ্ছেন; আর যাদের আমরা প্রগতিশীল ভাবি, তাদের বয়ান প্রতিক্রিয়াশীলদের মন জয়ের লক্ষ্যে। কে যে কার মন জয় করতে চায়, কেন যে চায় তা জনতা ভালো জানে।
রাজনীতিবিদদের এই নীতিগত সংকেন্দ্রণ (Ideological Convergence) যদি সিরিয়াসলি নেওয়া হয়, তাহলে বলা যায়, এটা আসলে মাঝখানের মানুষদের ধরার কৌশল। রাজনীতিবিজ্ঞানে এটাইকে বলে ‘মধ্যবর্তী জনমতের উপপাদ্য’ (Median Voter Theorem)। দুই প্রান্তের দলগুলো যখন মধ্যবর্তী জনমত ধরতে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসে, তখন অনেক সময় সুফলের বদলে কুফল মেলে। জনগণ তাদের নৈতিক অবস্থানকেই সন্দেহ করে এবং তাদেরকে ভাঁওতাবাজ ঠাওরায়।
ভাষা দিবস আমাদের আত্মপরিচয়ের জাতীয় স্মৃতি। এটি পুষ্পস্তবক, শ্রদ্ধা, দোয়া, ভাষণ—এসবের চেয়েও অনেক বড়। এই জাতীয় স্মৃতিই তৈরি করেছে শহীদ মিনার, কালো ব্যাজ, পুষ্পস্তবক, শোক বার্তা ও ভাষণ, মাতৃভাষার প্রতি আনুগত্য ইত্যকার নানা প্রতীক। এসব ঘিরে গড়ে উঠেছে ‘প্রতীকী রাজনীতি’। এসব প্রতীককে কেন্দ্র করে ‘দেখানোর রাজনীতি’ বেশি হয়ে গেলে তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। এখনকার মানুষ আগের মতো সাদাসিধে নয়। মানুষ বোঝে কে আন্তরিক, কে কৌশলী। ফলে অতিরিক্ত প্রতীকী নাটক বিশ্বাস তৈরি না করে বরং অবিশ্বাসও তৈরি করতে পারে। নাটকের অভিনেতা যেমন অতি নাটকীয় হয়ে উঠলে শূন্যতাটুকু দর্শকের চোখে ধরা পড়ে যায়, এক্ষেত্রেও তেমনই হয়।
ইতিহাস বলছে শুধু প্রতীক দিয়ে, শুধু ‘দেখানোর রাজনীতি’ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মন জেতা যায় না। নীতি, ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক সততা লাগে। জাতীয় স্মৃতি নিয়ে খেলতে গেলে স্মৃতিও পাল্টা প্রতিরোধও গড়ে তোলে, পাল্টা খেলে দেয়। তার প্রমাণ কিন্তু নিকট অতীতেই আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি খেলতে গিয়ে যেটা করেছে আওয়ামী লীগ।
একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় স্মৃতিগুলোর মান ও নৈতিকতা জনগণের মনে নির্দিষ্ট হয়ে আছে। রাষ্ট্র, ক্ষমতাবান গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দল সেগুলোর পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নিজেদের মতো কোনো বয়ান তৈরি করতে চাইলে, সেগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চাইলে, সেগুলোর নৈতিক মান ও সীমা ভেঙে দিতে চাইলে জনগণ বুঝতে পারে। তারা তখন ক্ষুণ্ন ও বিপন্ন বোধ করে। তারা তখন সেগুলো রক্ষার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নানা বিকল্প, নানা উপায় বেছে নেয়।