Published : 02 Sep 2025, 12:56 PM
বান্দুং থেকে তিয়ানজিন—এই দুটি শহর কেবল মানচিত্রের বিন্দু নয়, বরং এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক। বান্দুং, ১৯৫৫ সালে, সদ্য স্বাধীন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে নেতারা মিলিত হয়েছিলেন এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে—যেখানে পশ্চিমা বা সোভিয়েত শক্তির ছায়া থাকবে না, বরং দেশগুলো স্বনির্ভরতা, সমানত্ব এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে নিজেদের পথ চলবে।
সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী ঝোউ এনলাই হাত ধরে দাঁড়িয়ে বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন। তারা পঞ্চশীল নীতির ভিত্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, হস্তক্ষেপ করবেন না, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করবেন এবং সমতা ও সহযোগিতার নীতি বজায় রাখবেন। বান্দুং তখন কেবল একটি সম্মেলন নয়, এটি ছিল একটি প্রতীক, যে এশিয়া নিজস্ব পথে এগোতে চায়। মনে করুন, দুটি নদী হাত মিলিয়ে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছে—এভাবেই সেই সময়ের আশা ও উদ্দীপনা ছিল।
কিন্তু স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র সাত বছরের মাথায়, ১৯৬২ সালে হিমালয়ের বরফে ঢাকা অঞ্চলে ভারত-চীনের সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। চীনা সেনাদের আকস্মিক অনুপ্রবেশ বান্দুং-এর প্রতিশ্রুতিকে ভেঙে দেয়। এই যুদ্ধ কেবল সীমান্তের জন্য ছিল না; এটি ছিল পারস্পরিক বিশ্বাসের অবসান, সন্দেহের জন্ম এবং দুই বৃহৎ এশীয় শক্তির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার সূচনা। ভারতীয় মনে গেঁথে যায় যে চীনই প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী, পাকিস্তান নয়। এই ধারণা পরবর্তী দশকগুলোর ভারত-চীন ও ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
শীতল যুদ্ধের সময়ে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকেছিল। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি ভারতের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এই সহযোগিতা ছিল জীবনরেখার মতো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত এক একমুখী বিশ্বের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে পড়ে, যেখানে আমেরিকা একমাত্র পরাশক্তি। এই নতুন বাস্তবতায় ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ধীরে ধীরে নতুন মোড় নেয়।
নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব বাড়তে থাকে। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথম, চীনের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থান। দ্বিতীয়, চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারসাম্য নষ্ট করছিল। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব ছিল এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে ভারত বরাবরই ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করেছে। এটি কখনো সরাসরি চীন-বিরোধী জোটে যোগ দেয়নি। ভারত দুই দিকেই তাকিয়ে থেকেছে, অনেক সময় সম্ভাব্য মিত্রদেরও বিভ্রান্ত করেছে।
১৯৬২ সালের যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন ভারতীয় কূটনীতিতে এখনও কাজ করে। চীনের প্রতি গভীর অবিশ্বাস ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও নীতিকে তাড়া করে। উদাহরণস্বরূপ, গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ—যেখানে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়—এটি শুধু সাম্প্রতিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘসময় ধরে থাকা অবিশ্বাসেরই ফল। পাঁচ বছর ধরে ভারত-চীন সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়। এই জটিল সম্পর্কের মধ্যে ভারতের পদক্ষেপ হলো কৌশলগত বিরতি, যাতে উভয় পক্ষের মধ্যে অপ্রত্যাশিত সংঘাত এড়ানো যায়।
২০২৫ সালে, এবারের তিয়ানজিন বৈঠক তাই এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মোদী ও শি জিনপিং মুখোমুখি বসেন গালওয়ান সংঘর্ষের পর প্রথমবার। এই বৈঠক কেবল সীমান্ত বিরোধ মিটানোর প্রচেষ্টা নয়, বরং এক বহুমেরু বিশ্বে দুই দেশ কীভাবে একসাথে চলতে পারে, তার পরীক্ষাও বটে। অতীতের ছায়া, যেমন ১৯৬২ সালের যুদ্ধ, গালওয়ান, নাথুলা—সবই ভারতের জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে। এই স্মৃতিগুলো ছাড়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লেখা সম্ভব নয়।
ভারতের রাজনৈতিক কৌশলও জটিল। ভারতে মনে আছে—এক মহাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি এটিকে আবার সামনে নিয়ে আসে। ভারতের রপ্তানির ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়, যা মোদী সরকারের জন্য বড় ধাক্কা। এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক লেনদেনভিত্তিক এবং প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। ভারতের জন্য এটি পুরোনো ভয়কে আবারো জীবিত করেছে।
তিয়ানজিন বৈঠক থেকে কিছু বাস্তব সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সীমান্তে ‘যুদ্ধ না করার’ সমঝোতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন, নিয়মিত উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ—এই সব হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের নীতি কমিশন এবং চীনের পরিকল্পনা সংস্থার মধ্যে সংলাপ চালু হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা সম্ভব। ভারতের জন্য চীনের দুর্লভ মৃত্তিকা সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ, যা বৈদ্যুতিক যান, সেমিকন্ডাক্টর ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে কাজে লাগবে।
কিন্তু চীনেরও শর্ত আছে। ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার, দালাই লামার উত্তরাধিকারে বিরোধ, দক্ষিণ চীন সাগর বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান—সবই ভারতীয় রাজনীতির জন্য সংবেদনশীল। সামান্য ছাড়ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তিতে আঘাত দিতে পারে। ফলে সম্ভাব্য ফলাফল হবে একটি আংশিক উষ্ণতা, যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংলাপ সীমিত থাকবে।
ভারত ও চীন দুজনেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয়। ব্রিকস, জি-২০, এসসিও—সবক্ষেত্রে দুজনেই অংশগ্রহণ করে। দুজনেই গ্লোবাল সাউথের নেতা হতে চায় এবং পশ্চিমা শক্তির প্রভাব কমাতে আগ্রহী। তবে বাস্তবে পার্থক্যও আছে। চীনের শক্তি মূলত অর্থনৈতিক, ভারতের শক্তি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। চীনের দৃষ্টিতে ভারত-আমেরিকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সতর্কবার্তা, আর ভারতের দৃষ্টিতে পাকিস্তানকে সমর্থন করা ও গালওয়ানের স্মৃতি সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
তিয়ানজিন বৈঠক বান্দুংয়ের মতো কোনো নতুন যুগ শুরু করবে না। এটি গালওয়ানের ক্ষত সারাবে না, নয়াদিল্লির ওপর আমেরিকার প্রভাব কমাবে না। তবে এটি নীরব বাঁকবদল হতে পারে—এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন দুই দেশের বোধোদয়ের বিষয় যে, সরাসরি সংঘর্ষের চেয়ে ঘর্ষণই কম ক্ষতিকর। হয়তো ইতিহাস তিয়ানজিনকে মনে রাখবে সমাধানের জন্য নয়, বরং নতুন দরজা খোলা রেখেছে—এটি কীভাবে সংঘাত স্থগিত করেছে এবং ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করেছে—সে জন্য।
যেমন ধরুন, নদীর দুটি প্রবাহ ধীর হলেও মিলিত হয়ে সমুদ্রের দিকে এগোয়—একইভাবে ভারত ও চীনও একে অপরের সঙ্গে ধাপে ধাপে যোগাযোগ ও সংলাপ চালিয়ে সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। আবার একটি উদাহরণ হতে পারে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ছোট ছোট আলোচনার মাধ্যমে দূরত্ব কমানো—যেমন প্রতিবেশী বাড়িতে চড়াই-উৎরাই কমিয়ে শান্তি বজায় রাখা। এভাবেই কৌশলগত বিরতি বা ‘সন্ত্রাসবিহীন’ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কৌশলগত দিকগুলোর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। শুধুমাত্র সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, ভারতের জন্য এখন অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামরিক অংশীদারত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা ভারতের স্বনির্ভরতা বাড়াতে পারে, যেমন নবায়নযোগ্য শক্তি, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প খাতে। এর ফলে ভারত কেবল নিজের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, বরং আঞ্চলিক প্রভাবও শক্তিশালী করবে।
একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ভারসাম্য করতে সাহায্য করছে। সামরিক চুক্তি, কোয়াড জোট, পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং সামরিক প্রস্তুতিতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলনও। এই তিনটি স্তর—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, এবং ভারতীয় স্বনির্ভরতা ও কৌশল—একত্র হয়ে এশিয়ার ভবিষ্যতের মানচিত্র তৈরি করছে। এতে বোঝা যায়, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
বান্দুং-তিয়ানজিনের গল্প কেবল ইতিহাস নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন উত্তেজনা ও সংঘাত জন্মায়। এই শিক্ষা থেকে ভারতের কূটনীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনায় কৌশলগত ধৈর্য, নিয়মিত সংলাপ এবং অংশীদারত্বের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট ছোট সংঘাত এড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক শুল্কনীতি একটি বাস্তব উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ চাপ বা লেনদেনমূলক নীতি ভারতকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, কোনো শক্তির ওপর একতরফাভাবে নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। এটি আবারও প্রতিফলিত করেছে—কৌশলগত স্বাধীনতা ও বহুপক্ষীয় সমীকরণ অপরিহার্য। অর্থাৎ, চীনের সঙ্গে অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, এবং নিজের স্বনির্ভরতা—এই তিনটি একসঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাই ভারতের চ্যালেঞ্জ।
যদি ভারত এবং চীন উভয়ই এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে, তবে ভবিষ্যতের এশিয়া হয়তো রক্তময় সংঘাত নয়, বরং কৌশল, কূটনীতি এবং সহযোগিতার মাধ্যমে লেখা সম্ভব। তিয়ানজিন বৈঠক এমন একটি বার্তা সামনে এনেছে—যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা যে সংঘাতের চেয়ে ঘর্ষণ কম ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। এটি শুধুমাত্র ভারত-চীন সম্পর্কের জন্য নয়, বরং পুরো এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
এখন ‘মাথামোটা’ শাসকরা এই সত্যটা বুঝবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন।