Published : 22 Apr 2026, 06:39 PM
কলকাতায় এই ধরণের পহেলা বৈশাখ আর কখনো দেখা যায়নি। এবারের পহেলা বৈশাখে অন্য রাজ্য থেকে আসা হাজার হাজার বিজেপি নেতা ও কর্মীকে দেখা গেছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় এবং বৈশাখী মিছিলে; কেউ ডালায় রুই মাছ সাজিয়ে রাস্তায় নামলেন, কেউ ইলিশ মাছ হাতে। কেউ কেউ বলছেন—‘তুমি বাঙালি তো আমরাও বাঙালি।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ জয়গান করলেন। অবশ্য এইসবের উপলক্ষ্য যত না পহেলা বৈশাখ, তার চেয়েও বেশি রাজনীতি; কারণ ততদিনে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের প্রথম পর্ব হবে ২৩ এপ্রিল, ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় পর্ব হবে এবং ভোট গণনা হবে ৪ মে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল দলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এই নির্বাচনে ২৯৪ আসনে তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনে আরও লড়ছে কংগ্রেস, সিপিএমসহ একাধিক বাম দল এবং আছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের দুটি রাজনৈতিক দলও। সিপিএম হয়তো বিগত নির্বাচনের তুলনায় ভোট বেশি পাবে, মূল লড়াইটা নিশ্চিতভাবে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেই।
বলছিলাম, বৈশাখে মাছ নিয়ে মিছিল করার কথা। পশ্চিমবঙ্গে, তাও আবার বিজেপির এমন মিছিল করার আলাদা একটা তাৎপর্য আছে। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যেই মাছ-মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ। এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ দিয়েছে বিহার, যেখানে অনেক বাঙালি বসবাস করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ইস্যুটা ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। তৃণমূল বলছে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসলে বিহারের মতোই মাছ বিক্রি বন্ধ করে দেবে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—চিন্তা করা যায় সেখানে বাজারে মাছ থাকবে না?
পশ্চিমবঙ্গের মাছের রাজনীতি নিয়ে এক সংবাদ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে বিবিসি। তাতে বলা হয়েছে, ‘বাংলায় মাছ কেবলই এক খাদ্যবস্তু নয়—এটি এখানকার রন্ধনশৈলীরই যেন প্রাণধারা; ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রাত্যহিক জীবনের পরতে পরতে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, যা একই সঙ্গে বাংলার পরিচয় ও নিজস্বতার অনন্য স্মারক।’
সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মাছ নিয়ে এখন এক রাজনৈতিক নাটক চলছে—যেখানে বিজেপি প্রার্থীরা হাতে মাছ উঁচিয়ে ধরে জনগণের উদ্বেগকে প্রশমিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে ঝালমুড়ির কদরও বেড়েছে। নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে রাস্তার পাশের এক দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই ঝালমুড়ি খাওয়ার ছবিসহ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটাকে মোদীর নির্বাচনি নাটক বলে কটাক্ষ করেছেন।
এসব তো হলো নির্বাচনের ‘সাইড শো’ বা পার্শ্ব প্রদর্শনী। তবে এইবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আলোচিত বিষয় হলো—ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন যার সুন্দর একটা নামকরণ করেছে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’, সংক্ষেপে ‘এসআইআর’। ভোটার তালিকা সংশোধন করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে যেমন বিহার ও আসামে অনেক নাগরিককে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগ সংখ্যালঘু মুসলমান। এখন ‘এসআইআর’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।
‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাম তোলাতে নিরীহ সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। তালিকায় নাম থাকবে কি থাকবে না—তা নিয়ে যে প্রবল উৎকণ্ঠায় পড়তে হয়েছে, সেটাকেই এই নির্বাচনে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস যথারীতি নির্বাচনি বড় ইস্যু করেছে।
‘এসআইআর’ বা বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের আড়ালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৬০ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ৮.৫৭ শতাংশ। নাগরিকত্বের ‘সঠিক’ নথিপত্র দেখাতে না পারা বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মূলধারা থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মনে হলেও, এর নেপথ্যে থাকা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত। বিপুল সংখ্যক এই ‘নাগরিকত্বহীন’ মানুষকে নিয়ে ভবিষ্যতে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তার ঢেউ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানার সমূহ আশঙ্কা তৈরি করছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটার তালিকা সংকট কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ৬০ লাখ লোকের মধ্যে যারা ভোটার তালিকায় শেষ পর্যন্ত স্থান পাবেন না, তাদের ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার দেশটিতে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করবে। পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে, আশঙ্কা করা হচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীও আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো কথিত ‘অবৈধদের’ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন।
এই ‘এসআইআর’ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে কলকাতার রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, বাদ পড়া ভোটারদের বেশিরভাগ মুসলমান এবং এরা তৃণমূলের সমর্থক। এই প্রক্রিয়ায় তৃণমূল কোনো কোনো আসনে ৩০ থেকে ৬০ হাজার ভোটার হারাতে পারে। অনেকে বলছেন, অন্য সম্প্রদায়ের লোকও আছে বাতিলের তালিকায়। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ‘এসআইআর’ হিতে বিপরীত হতে পারে বিজেপির জন্য। যেসব সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা বিপুল হারে ভোট দিতে যাবে তৃণমূলকে সমর্থন জানাতে।
নির্বাচনে সবার চোখ থাকবে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—এই দুই কেন্দ্রে। ভবানীপুর মমতার নিজস্ব কেন্দ্র, সেখানে তার বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে লড়ছেন খোদ শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন এবং মাত্র ১৯৫৬ ভোটে হেরেছিলেন। তবে এইবার শুভেন্দু অধিকারীর নিজস্ব কেন্দ্র নন্দীগ্রামে বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগ দিয়ে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে লড়ছেন পবিত্র কর, যিনি কিছুদিন আগেও ছিলেন শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহচর।
বিজেপি বিগত তিনটা রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে চেষ্টা করছে মমতাকে হারাতে। যদিও প্রতিটা নির্বাচনে তারা আগের চেয়েও ভালো করেছে, কিন্তু কোনোভাবেই যেন মমতাকে হটানো যাচ্ছে না। বিগত লোকসভা নির্বাচন হয়েছে ২০২৪ সালে, জনমত জরিপে মমতার অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। তারপরও তৃণমূল লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছিল। এইবার মোদীর দল আরও সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে। বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের এইবারের নির্বাচনি প্রচারণার তীব্রতা বিগত কয়েকটা নির্বাচনকে ছাড়িয়ে গেছে।
নির্বাচনি জনমত যাচাইয়ে বিভিন্ন সমীক্ষায় যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল দলের কিছুটা প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে, তবে যতই দিন যাচ্ছে বিজেপি পার্থক্যটা কিছুটা কমিয়ে আনছে। ‘এসআইআর’ জনমত সমীক্ষাকে আরও কঠিন করে তুলছে। কারা যে ফাইনাল ভোটার লিস্টে থাকবেন, আবার কারা যে বিক্ষুব্ধ হয়ে অধিক হারে ভোটে অংশগ্রহণ করবেন—এইসব সমীকরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভারতের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ দুদিন আগে কিছু সংস্থার গৃহীত জনমত প্রকাশ করে। তার কিছু নমুনা—সি-ভোটার: তৃণমূল ১৫৮, বিজেপি ১১৫; এক্সিস: তৃণমূল ১৪৩, বিজেপি ১৪৭; রিপাবলিক-সিএনএক্স: তৃণমূল ১৩৩, বিজেপি ১৪৩; এবিপি-সি ভোটার: তৃণমূল ১৫৮, বিজেপি ১১৫। সব জরিপের গড় নিয়ে 'টাইমস অফ ইন্ডিয়া' জানিয়েছে এইবারের বিধান সভার ভোটে তৃণমূল পেতে পারে ১৪১টি আসন, বিজেপি পেতে পারে ১৩৮ টি, সিপিএম পেতে পারে ১৩ । জনমত সমীক্ষাতে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি সিপিএম (কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সিস্ট) ‘কিং মেকার’ হয়, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
এইবারের নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য খুব সহজ হবে না। সবার মনে একই প্রশ্ন—মমতা কি এইবার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন? ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর রাজ্যে উন্নয়ন ও দুর্নীতি নিয়ে তাঁকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ১৫ বছরে তিনটি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন ও দুটি লোকসভা নির্বাচন করেছেন। বেশ কয়েকবার ভোটের আগে জনমত জরিপে তিনি পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন এবং প্রতিটা নির্বাচনেই জয় পেয়েছিলেন। এইবারও যদি তিনি তার জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন, তাতে কেউ কি আশ্চর্য হবেন?
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক