Published : 16 Nov 2025, 12:38 PM
অবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর ঠেলাঠেলি, গড়িমসি এবং নানাবিধ হুংকারের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ জারির ঘোষণা দিয়েছেন। সেদিনই রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ক অধ্যাদেশও জারি করেন।
উল্লেখ্য ১৩ নভেম্বর ২০২৫ যেদিন মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন এবং সেদিনই আদালত জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ জারি হচ্ছে শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘোষণার দিন ধার্য্য করেছে। আবার ওই দিনই দেশের বাইরে পলাতক শেখ হাসিনা গং তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী কায়দায় ঢাকা শহরে লকডাউন পালনের কর্মসূচিও ঘোষণা করে। এসব ঘটনা কাকতালীয় মনে হলেও এগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং এসব ঘটনার ফলাফল আগামী দিনে রাজনীতির গতিপ্রকৃতির নির্ণায়ক হতে পারে।
যা আছে আদেশে
এই আদেশের প্রারম্ভিকতায় বলা হয়েছে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনায় যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে সেটার জন-অনুমোদনের নিমিত্তে একটা গণভোট আয়োজন করা দরকার। দরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সেই পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের আবশ্যিকতা থাকায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ তৈরি হয়েছে।
গণভোটে কি বিষয়ে মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে, সেজন্য চারটি প্রশ্নমালাও এই আদেশে যুক্ত হয়েছে যা থাকবে গণভোটের ব্যালটে। মানুষ এই চার প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবে।
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
এই আদেশ কতগুলো বিষয় সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। প্রথমত, গণভোট আয়োজন করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা। দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ তৈরি করা। পিআর পদ্ধতিতে (নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে) ১০০ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষ তৈরি করা। গণভোটের ফলাফলে ‘হ্যাঁ’-সূচক ভোট জয়যুক্ত হলে এই সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের নিয়েই একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা এবং ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের মুন্সিয়ানা
দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নানামুখি চাপের মুখে রেখেছে। সরকার নানাভাবে সেটা মোকাবেলা করেছে। ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে অর্জিত জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবার পরও বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য ছোটদলের বড় নেতারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকারকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। এই চাপের মুখেও শেষে এসে মুহাম্মদ ইউনূস উল্টো কার্ড খেলেছেন। তিনি ৭ দিনের সময় বেধে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হওয়ার আহবান জানান। দলগুলো সেটা করতে ব্যর্থ হলে সরকার নিজেই এই আদেশ জারির ব্যবস্থা নেয়। এমনভাবে এই আদেশ জারি করে, যেখানে সবার কিছু কিছু দাবি রাখা হয়েছে এবং কিছু দাবি বাদ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়েছে একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন; সরকার সেটা করেছে। জামায়াত চেয়েছে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন; সেটা হয়েছে। এনসিপি চেয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসাবেই কাজ করবে জাতীয় সংসদ; সেটাও হয়েছে। আবার সব দলেরই অসন্তোষের জায়গাও আছে। যেমন জামায়াত জাতীয় সংসদের আগে গণভোট চেয়েছে, নিম্নকক্ষেও পিআর পদ্ধতিতে আসন বিন্যাস চেয়েছে। দুটোর কোনোটিই সরকার রাখেনি। বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায়নি, উচ্চকক্ষে পিআর চায়নি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর সাংবিধানিক আয়োজন চায়নি–সরকার সেসবে কর্ণপাত করেনি। বিএনপি চেয়েছিল নোট অব ডিসেন্ট, অর্থাৎ ভিন্নমত অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা হোক, সরকার সেটাও মানেনি। এনসিপি চেয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করবেন। কারণ, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। সরকার তা শোনেনি। রাষ্ট্রপতির নামেই আদেশ জারি হয়েছে।
কি করবে রাজনৈতিক দলগুলো
রাজনৈতিক দলগুলো প্রাথমিকভাবে সরকারের আদেশে তাৎক্ষণিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেও ধীরে ধীরে এই আদেশ মেনে নেওয়ার পক্ষেই আছে বলে মনে হচ্ছে। কেননা, তারা নির্বাচনে যেতে চায় এবং নির্বাচনের আগে আর কোনরকম সংশয় বা বিতর্ক এড়াতে চায়। বিশেষত বিএনপি কোনভাবেই নির্বাচন হওয়া না হওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এরকম কোনো পরিস্থিতির মুখে পড়তে চায় না বলে মনে হচ্ছে। জামায়াতসহ অপরাপর দলগুলোও এই ঝুঁকি নিতে চাওয়ার কথা না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই গণভোটে সবাই কি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত তৈরি করবে? কিংবা ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলে যে সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিস্থিতির তৈরি হবে, সেটা কি ভোটে জেতা দলগুলোকে স্বস্তি দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে, আরেকটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। সেটা হচ্ছে কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্ন ও ফ্যাসিবাদের নায়ক-সহনায়কদের বিচার প্রসঙ্গ এবং তার বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া।
যা ঘটবে...
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না সেটা এখন পরিষ্কার। খোদ প্রধান উপদেষ্টাই সেটা বিদেশিদের জানিয়ে দিয়েছেন। তাহলে সেটার বিপরীতে তাদের কৌশল কী হবে?
বিচারের রায়ে শেখ হাসিনা এবং ক্রমান্বয়ে তার দলের বড় নেতাদের সাজা হলে, সেই পরিস্থিতিতে তাদের কর্মসূচি কি হবে?
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে ততই দেশে থাকা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক থেকে ভোট পেতে আগ্রহী বড় রাজনৈতিক দলগুলো কি ধরণের কৌশল নেবে?
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে ততই এই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেবে। হাসিনাগংয়ের বিচার এবং তার বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যদি চোরাগোপ্তা হামলার রাজনীতি চালু করে সেটা যে তাদের জন্য বুমেরাং হবে নিশ্চিত করেই বলা চলে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ জনগণের চাপের মুখে পড়বে তারা। এই সময় আওয়ামী ভোটের জন্য তাদের প্রতি প্রীতি দেখানো রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোন আচরণ জনমনে বিরক্তির উদ্রেক করবে। সেটার প্রতিফলন ভোটের বাক্সে পড়তে পারে।
সব চাপের মুখে কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যদি অহিংসভাবে জাতীয় সংসদ ভোট বর্জনের ডাক দেয়, তবে বড় রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগত চাপের মুখে পড়বে। কেননা, নিজ দলের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই ভোটব্যাংকের ভোট আদায়ে সচেষ্ট হলে সেটা দলীয় প্রার্থীদের বেকাদায় ফেলতে পারে।
মোদ্দাকথা হচ্ছে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতি বদলে যাবে গণভোটের কারণে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে উচ্চকক্ষ, সাংবিধানিক পরিষদ গঠন, সাংবিধানিক সংস্কার, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিতকরণের প্রয়াস নির্বাচনে জেতা ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্রশাসনকে দারুণ চাপের মধ্যে ফেলবে।
অন্যদিকে, গণভোটে ‘না’ ভোট জিতলে সংসদ নির্বাচনে জেতা দল যে গতিতে ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাতে চাইবে, সেটা সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে নয়া অচলাবস্থা তৈরি করতে পারবে। তার সঙ্গে যুক্ত হবে পতিত ফ্যাসিবাদের উপদ্রব।
ফলে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন বহুমুখীন সংকটে। অর্থনীতি, সুশাসনের বাইরেও সংবিধান সংশোধন আদেশ, গণভোট বাংলাদেশের রাজনীতিকে যে বহুমাত্রিক জটিলতার মধ্যে ফেলবে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো যদি ক্ষুদ্রস্বার্থের বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে, তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও তার যাত্রাপথ সুগম হওয়া কঠিন হবে।