Published : 26 Nov 2025, 06:24 PM
দুই দশকে যুদ্ধ শেষে ১৯৭৫ সালে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভিয়েতনাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির নেতৃত্বের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি টেলিযোগাযোগসহ অর্থনীতির নানা খাতে গভীর প্রভাব ফেলে। সঠিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের নীতিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে—বিশেষ করে তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে, যা টেলিকম খাতের অন্যতম প্রধান নিয়ামক।
জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্স অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইউনিক মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৩০ শতাংশ, আর ভিয়েতনামে ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার বাংলাদেশে ৬২ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশে ফোরজি সংযোগ ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ, আর ভিয়েতনামে এ হার ১০৭ শতাংশ। অর্থাৎ ফোরজি সেবা গ্রহণ এবং সার্বিক ডিজিটাল প্রস্তুতির দিক থেকে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভিয়েতনামে মোবাইল খাতের গড় মাসিক আয় বাংলাদেশের মোবাইল খাতের তুলনায় ১.৩ গুণ বেশি। ভিয়েতনামে প্রতি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর গড় আয় (এআরপিইউ) বাংলাদেশের তুলনায় ১.৭৭ গুণ বেশি। প্রতি জিবি ডেটার দাম ভিয়েতনামে ৩১ টাকা, যা বাংলাদেশের (১০ টাকা) তুলনায় তিনগুণ বেশি।
উচ্চতর এআরপিইউ ও ডেটা মূল্যের পাশাপাশি ভিয়েতনামের মোবাইল অপারেটররা ফিক্সড সার্ভিস দিতে পারে, প্রয়োজন মত টাওয়ার স্থাপন, ফাইবার সম্প্রসারণ ও গেটওয়ে পরিচালনা করতে পারে। ফলে সেখানে মোবাইল অপারেটরদের ব্যয় কাঠামো অনেক বেশি দক্ষ ও কার্যকরী। অন্যদিকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের সাশ্রয়ী ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ অনেক সীমিত।
আশাব্যাঞ্জক আয়ের সম্ভাবনা এবং অনুকূল ব্যয় কাঠামোর পাশাপাশি ভিয়েতনামের কর্পোরেট কর হার মাত্র ২০ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে তা তালিকাভুক্ত টেলিকম কোম্পানির জন্য ৪০ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্তদের জন্য ৪৫ শতাংশ। অতএব বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। অথচ তারা ২০২৫ সালে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলাম করেছে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত তরঙ্গ মূল্যের তুলনায় ৩ গুণ কম দামে।
আমরা যেহেতু ভিয়েতনামের টেলিকম বাজারের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি, তাই ধরে নেওয়া যায় ভিয়েতনামের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের নিলামের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয়কেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেবে; বিশেষ করে যখন তাদের টেলিকম বাজার বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২০২৫ সালের মে এবং সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নিলামে ভিয়েতনাম ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ২০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বিক্রি করে প্রতি মেগাহার্টজ মাত্র ৯১.৮৫ কোটি টাকা দামে। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই ব্যান্ডের তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করেছে ২৬৩ কোটি টাকা (প্রতি মেগাহার্টজ), যা ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে দাঁড়ায় ২৮৩ কোটি টাকা, যদিও এই দামে মাত্র ১০ শতাংশ ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
২০২৩ সালের জুন মাসে ২.৩ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলামে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর ভিয়েতনাম এই সিদ্ধান্তে আসে। তখন ২.৩ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল মেগাহার্টজ প্রতি ৮৬ কোটি টাকা, যা অপারেটররা অত্যধিক মনে করে নিলামে অংশগ্রহণ করেনি।
পরে ভিয়েতনাম ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ক্ষেত্রে নিলামের ভিত্তিমূল্য ২.৩ গিগাহার্টজের মূল্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে ১৭.৭ কোটি (প্রতি মেগাহার্টজ) টাকা নির্ধারণ করে। ফলে ২০২৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নিলামটি বিপুল সফলতা পায়। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিয়েতনাম এই ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডটি বিক্রি করেছে মেগাহার্টজ প্রতি ১৭.৭ কোটি টাকায়, আর বাংলাদেশ ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ বিক্রি করেছে মেগাহার্টজ প্রতি ৫৮ কোটি টাকায় অর্থাৎ ভিয়েতনামের তুলনায় ৩.৩ গুণ বেশি দামে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) প্রকাশিত আইসিটি রেগুলেটরি ট্র্যাকার সূচকে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক; বাংলাদেশের স্কোর ৬৫.৫, আর ভিয়েতনামের ৭১.৮৩।
এ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে তরঙ্গের মূল্যও নিম্নমুখী। আরো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিশ্বব্যাপী এখন প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গ থেকে অর্জিত রাজস্ব এক দশক আগের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট যে, বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তরঙ্গের মূল্যে সমন্বয় করার জন্য দ্রুত ও বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করাই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সঠিক পথ।
এখন আমাদের হাতে দুটি বিকল্প আছে; বিটিআরসি চাইলে এই তরঙ্গকে কেবলমাত্র সরকারের উচ্চ রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে প্রাধান্য দিয়ে চড়া দামে নিলামের পথ বেছে নিতে পারে, যেখানে সম্পূর্ণ তরঙ্গ বিক্রি অনিশ্চিত হতে পারে। নয় দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তরঙ্গের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী মূল্য নির্ধারণ করে পূর্ণ তরঙ্গ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারে। যা ডিজিটাল অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করবে আর ডিজিটাল অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও তত সুদৃঢ় হবে।