সন্জীদা খাতুনকে নিয়ে হাসান আজিজুল হকের এ লেখাটি নেওয়া হয়েছে আবুল আহসান চৌধুরী ও পিয়াস মজিদ সম্পাদিত ‘বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে’ নামে প্রকাশিত সন্জীদা খাতুন সম্মাননা স্মারক বই থেকে। বইটি ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশ পায়। হাসান মারা যান এর পরের বছর ১৫ নভেম্বরে। সন্জীদা চলে গেলেন আজ।
Published : 25 Mar 2025, 08:59 PM
সন্জীদা আপার সঙ্গে কবে প্রথম পরিচয়, এ কথা জানতে চাইলে আমি বলতে পারবো না। মনে করলে মনে হয়, চিরদিনই তো ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তবে ওঁর বাবা কাজী মোতাহার হোসেন অসাধারণ লোক ছিলেন। নিজের মনেই থাকতেন, কিছু মনে করতে পারতেন না। সুন্দর চেহারা। গোছানো দাড়ি। তাঁর সম্পর্কে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একবার পাকিস্তানে ফিলোসফি বিষয়ক কনফারেন্সের আয়োজন হলো। দর্শন নিয়ে আলোচনা। বিশিষ্টজনরা এসেছেন। ওটা পশ্চিম পাকিস্তানে হয়নি, পূর্ব পাকিস্তানে আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে পাকিস্তানের একজন বড়ো লেখক এসেছিলেন। নামটা ভুলে গেছি। খুব জানাশোনা লোক। অনেক পড়াশোনা। বক্তৃতা দিতে গিয়ে, একথা-ওকথা বললেন। ইকবাল নিয়ে কথা হচ্ছিল। কাজী মোতাহার হোসেন সেখানে ছিলেন।
বক্তার বলা শেষ হলে কাজী মোতাহার হোসেন অনুমতি নিয়ে দাঁড়ালেন স্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজিতে বললেন, 'আপনি এতো লোকের কথা বললেন, পাকিস্তানি অনেক মেধাবীদের কথা তুললেন, কিন্তু আপনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা একবারও বললেন না। তাঁর সম্পর্কে একটা শব্দও বললেন না। তার মানে আপনি তাঁর সম্পর্কে জানেন না। তাই, এতক্ষণ আপনি যা বললেন, তাতে আপনার অজ্ঞতাকে জাহির করা ছাড়া কিছুই হলো না।' ওহ এমন করে বললেন। এমন নিরীহভাবে, শান্তভাবে। মনে হলো কোনো রাগ নেই। কিন্তু যা বলার বলে দিয়েছেন।
তিনি অবশ্য রাগতেন না কখনো। খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন তো। বড় মনের মানুষ। তাঁর মেয়ে সন্জীদা খাতুন, তিনিও বাবার অনেক গুণ পেয়েছেন।
আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ঘটনাটি সন্জীদা আপার মুখেই শোনা। একবার রাস্তায় বাবার (কাজী মোতাহার হোসেন) সঙ্গে দেখা। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন, তিনি সন্জীদা খাতুনকে দেখে আদাব দিলেন। বাবার মুখে আদাব শুনে মেয়ে তো অবাক। বাড়ি ফিরে মাকে বললেন, 'আচ্ছা মা, বাবার মাথা কি একেবারে খারাপ হয়ে গেছে?' মা বললেন, 'কেনরে, কী হয়েছে?'
'না পথে বাবার সঙ্গে দেখা। তিনি আমায় আদাব দিলেন।'
মা বললেন, 'বলিস কীরে তোকে আদাব দিলো?'
তারপর কাজী সাহেব বাড়িতে ফিরলে তাঁর স্ত্রী বললেন, 'তোমার কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে? রাস্তায় মেয়ের সঙ্গে দেখা, তুমি তাকে আদাব দিলে?'
উনি বললেন, 'চেনাচেনা লাগলো তো।'
গল্পটি মনে হলে আমি এখনো আপনমনে হাসি। এরকম বুড়ো মানুষ হয়।
একটা সময় আমরা ফাহমিদা খাতুনকে (সন্জীদা খাতুনের ছোটোবোন) ভালো করে চিনতাম। গানের জন্য। তার রবীন্দ্রসংগীত আমরা খুব পছন্দ করতাম। তাঁর একটা ক্যাসেট এখনো আমার কাছে আছে। সন্জীদা আপাও গান করেন। অনেকবার তাঁর গান শুনেছি। আজকাল অবশ্য তিনি গাইতে চান না।
একবার ঢাকা থেকে রাজশাহীতে তাঁকে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। পাঁচ-ছয় বছর আগে। রাজশাহীতে বসে তিনি বাংলা গানের ইতিহাসটা বললেন। তিন-চারজনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। যাকে যে গানটা গাওয়াতে হবে, তাকে বলছিলেন, এই 'তুমি এই গানটা গাও। তুমি ওটা গাও।' সেবার তিনি আমাদের বাংলা গানের বিবর্তনটা দেখালেন। রবীন্দ্রনাথের। গান তো কোনো ব্যাপার নয় তাঁর কাছে, গোটা বাংলা গানের বিবর্তনও তিনি খুব ভালো জানেন। ভালো জ্ঞান রাখেন। এই বাংলা-ওই বাংলা মিলে যে গান, নিজস্ব বাঙালিত্ব। বাউল গান, এসব সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা বেশ গভীরে। আমরা আশা করেছিলাম, তিনি নিজে গাইবেন। কিন্তু তিনি গাইলেন না। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আমরা তো আপনার গান শুনবো। তিনি বললেন, 'আমার গান তো সব সময়ই শোনেন। আজ না হয় আমি এই নতুন ছেলেগুলোর সঙ্গে একটু পরিচয়ই করিয়ে দিলাম।'
সন্জীদা খাতুন আমার খুব ঘনিষ্ঠ মানুষদের একজন। আপন মানুষদের একজন। তিনি আমাকে একটি বইও উৎসর্গ করেছেন। নামটি সম্ভবত 'স্বদেশ সমাজ সংস্কৃতি'। তিনি আমায় ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন। ভালোবাসেন। আমিও তাঁকে দিদি বলে জানি।
একবার আমার ওপর একটা সাক্ষাৎকার হচ্ছিল। বেশ ভালো করে কোনো একটা চ্যানেল নিচ্ছে। সেখানে আমার সম্পর্কে তারা জানতে চাইছে, তখন সন্জীদা আপা যা বললেন, তাতে আমি লজ্জায় মরে যাই আরকি। বলে যে, আমার 'পরবাসী' গল্পটা পড়ে তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। ওয়াহিদুল হক ভাই, সন্জীদা আপার স্বামী, তিনি খুব যাযাবর ধরনের মানুষ ছিলেন। শিল্প-সংস্কৃতির টানে এখানে সেখানে ছুটে যেতেন। ওই সময় একদিন নাকি আপা অভিমানের স্বরেই বলেছিলেন, 'তুমি তো এভাবে ঘুরে বেড়াও, কোনো খোঁজ থাকে না। তাহলে আমি সংসার ছেড়ে হাসানের সঙ্গে চলে যাবো।' কিন্তু তখনো তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, আলাপ হয়নি। পরে তিনি আমায় এটা বলেছিলেন।
তিনি মজা করে এই কথাটি এখনো বলেন। আমার গল্প তাঁর ভালো লাগতো। আমি ভক্ত ছিলাম তাঁর গানের। গানের সম্বন্ধে জ্ঞান, গান সম্পর্কে চিন্তা, যে গানটি গাইছেন তাঁর সঙ্গে মনপ্রাণ উজাড় করে দেওয়ার ব্যাপারটি তাঁর আছে। তাঁর সব বোনেরাই ভালো গান করেন। কিন্তু সবার মধ্যে সন্জীদা আপা অনন্য উচ্চতায় আছেন। গভীর অধ্যবসায়, অধ্যয়ন, গবেষণা তাঁকে সর্বশ্রদ্ধেয় করেছে।
আগের মতো এখন তো আর ছুটে বেড়াতে পারি না। তবে সন্জীদা আপার সঙ্গে এখনো মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হয়। তিনি বলেন, এই হাসান কেমন আছেন? কী লিখছেন? ছায়ানটের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ছায়ানটে তাঁর ছেলে পার্থের সঙ্গে আলাপ হয়। পার্থের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগের প্রধান এবং এক সময়ের ব্যক্তিগত শিক্ষক মফিজ আহমেদের মেয়ে লিসার। লিসা আমার মেয়ের বান্ধবী ছিল। সেই দিক থেকেও ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। লিসা তো এখন নামকরা শিল্পী। আমার মেয়েটি আর গান করলো না। পেশা হিসেবেও নিতে পারলো না, নেশা হিসেবেও না। সে যাই হোক।
সন্জীদা আপা শান্তিনিকেতনে পড়েছেন। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাকরণগত ও ভাবগত যে সম্পর্ক, ছন্দ, সুর, গান এ নিয়ে খুব অসাধারণ বই লিখেছেন 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ’। তিনি একখণ্ড আত্মজীবনীও লিখেছেন 'সহজ কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে'। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছেন। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে লিখেছেন। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর একটি বড় গবেষণা কাজ আছে। বই আকারে বেরিয়েছে, 'সত্যেন্দ্র-কাব্য-পরিচয়'। যা বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই। বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি নিয়েও তাঁর দৃষ্টি গভীরে প্রোথিত। তিনি খুব ভালো গদ্য লেখেন। তার মানে তিনি একদিক থেকে সব্যসাচী লেখকও। সেই সঙ্গে, খুব ভালো চিন্তাও করতে পারেন। গুণী শিক্ষক। দক্ষ সংগঠক। অনেক গুণান্বিত মানুষ। আমরা তাঁকে অনেক উপরে স্থান দিই।
রবীন্দ্রসংগীতই নয়, গান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান গভীর। তাঁর অনেক আলোচনা পড়ে আমরা ঋদ্ধ হয়েছি। গান সম্পর্ক জেনেছি। রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে জেনেছি। এতটা গভীরভাবে, এতটা মন দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে কাজ করেছেন, এপার বাংলা বা ওপার বাংলায় বিকল্প কাউকে আমি পাইনি। আমাদের দেশে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচলন, বৃদ্ধি-সবকিছুর সঙ্গেই সন্জীদা খাতুন নামটি সাংঘাতিকভাবে জড়িয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ছিলেন সংস্কৃতির অন্তপ্রাণ। ওয়াহিদুল হক চলে গেছেন। এখন সন্জীদা খাতুন আছেন।
সৌভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে তাঁর একটা খুব স্নেহের সম্পর্ক হয়েছে বা আছে। অনেক ঘটনা আছে। তাঁর কিছু তিক্ত, কিছু মধুর, সব মিলিয়েই। ছায়ানটে আমাকে দু-একবার ডেকেছিলেন, আমি গিয়েছি। পার্থ ডেকেছিল আমি গিয়েছি। বিশেষ করে তাঁর বড় মেয়ে অপালা, কর্কট রোগ যাকে কেড়ে নিল, সে আমাকে বাবার চাইতেও বেশি ভালোবাসতো। মামা ডাকতো। ওর যে আমি কী মামা ছিলাম! সেই অপালা...। আমি অপালার টানে মাঝে মাঝে ঢাকা আসতাম। সন্জীদা আপার সঙ্গে আমার দেখা হোক বা না হোক, অপালার সঙ্গে আমার দেখা হতোই হতো। অপালার বিয়েটিয়ে হলো। তার একটা মেয়েও আছে। ওর মৃত্যুর পর কেরানীগঞ্জে একটা গানের স্কুল হয়েছে। তার নামে। সেই স্কুল উদ্বোধনের দিনে গিয়েছিলাম। সন্জীদা আপা বলেছিলেন, 'হাসান মেয়ের মতো স্নেহ করতো অপালাকে। ও না আসলে হবে না।' ওখানে গিয়ে সন্জীদা আপার সঙ্গে কথাও হলো।
এই সম্পর্ক এখনো টিকে আছে। ভালোভাবেই আছে। ঢাকায় থাকি না বলে হয়তো তাঁর সঙ্গে ঘনঘন দেখা সাক্ষাৎ হয় না। আর ঢাকায় এলেই যে তার কাছে যেতে পারি তাও না। আর উনি এখন বয়সের ভারে, শুনেছি, চলাফেরাও করতে কষ্ট হয়। তাঁকে যে যত্রতত্র পাওয়া যাবে এমনটা নয়। ঢাকার বাইরে যাওয়াটাও তাঁর জন্য সহজ নয়। তাই তাঁকে ওই অর্থে বিরক্ত করি না। ডাকি না। আমাদের জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের শাখাটা রাজশাহীতে আছে। সেখানে দু-একবার তাঁকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম।
একবার জয়পুরহাটে সম্মেলন হলো। সেখানে সন্জীদা আপা গিয়েছিলেন। আমিও গিয়েছিলাম। খুলনার ফুলতলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি। একবার একটা অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরালয়টি পরে সরকার নিয়ে নেয়। অনেক জায়গা সামনে। ফাঁকা জায়গায় সফেদা গাছ লাগিয়েছে। গাছের গোড়াটা বাঁধিয়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কিছু স্মৃতি নিদর্শন সংরক্ষণ করেছে। আগে প্রত্যেক বছর আমায় ডাকতো। আমি যেতাম। আমার বাড়িও তো ফুলতলায়।
সন্জীদা আপার বাসায় বহুবার গিয়েছি। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনে থাকতেন, তখনো। একবার বোধ হয় হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে তাঁর বাসায় গেলাম। তিনি রান্না করে খাওয়ালেন। পরে আমি অপালার কাছেই যেতাম বেশি। আর দেখা করে আসতাম। ছায়ানটের অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। এখনো ছায়ানটের সাধারণ পরিষদে আমায় রেখেছে। মাঝে মাঝে চিঠি পাই। বাংলাদেশের হৃদয় হতে- যে পত্রিকাটি ছায়ানট থেকে বেরোতে সেটার জন্য দু-একটা লেখা লিখেছিলাম। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। আমি তো অতটা লিখি না। রবীন্দ্রনাথের ওপর আমি তিনটি বড়ো বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি।
আজ আমি যাকে নিয়ে লিখতে বসেছি, তাঁর মনটা আকাশের মতো উদার। একটা মানুষকে মনে রাখার জন্য একটি গুণই যথেষ্ট। সন্জীদা খাতুন বহু গুণে গুণান্বিতা। সংগীত, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির সব শাখাতে তিনি আপন আলোয় আলোকিত করেছেন। ছায়ানটের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার আপন মমতায়, পরম যত্নে। শিক্ষক হিসেবেও তিনি শত শত শিক্ষার্থীর হৃদয়ের আসনে ঠাঁই পেয়েছেন। শিল্পের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর জন্ম বারবার হয় না।
সন্ন্জীদা খাতুন একজন, অদ্বিতীয়া।