Published : 17 Dec 2025, 08:31 PM
গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা আমাদের দেশীয় সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে ‘অপমানিত’ বোধ করেছেন এবং নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগ করতে চান। বঙ্গভবনে তার আর ভালো লাগে না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রপতিকে ফোন করা হয় এবং তিনি ফোনে উত্তর দেন এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনটি সঠিক বলে নিশ্চিত করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে রয়টার্সকে সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “প্রায় সাত মাস হল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার সঙ্গে কোনো ধরনের সাক্ষাৎ করেননি; তার প্রেস ডিপার্টমেন্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে নিজের ছবি সরিয়ে ফেলার কথাও বলেন তিনি।”
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন “সব কনস্যুলেট, দূতাবাস ও হাই কমিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি ছিল। এগুলো হঠাৎ করে এক রাতের মধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়।” তিনি আরও বলেন, “এতে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। মানুষজন ভাবতে পারে, রাষ্ট্রপতিকে হয়তো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি খুব অপমানিত বোধ করেছি।”
গত বছর ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে যা যা ঘটেছে সেগুলো মোটামুটি সবারই জানা। রাষ্ট্রপতি নিজেই সাক্ষাৎকারে কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন।
একজন রাষ্ট্রপতি পদে থেকে এভাবে সংবাদমাধ্যমে এমন সংবেদনশীল সাক্ষাৎকার দেওয়ার নজির নিকট অতীতে নেই। রাষ্ট্রপতির সকল সংবাদ, বিবৃতি তার প্রেস সচিবের মাধ্যমে অথবা সরকারের তথ্য অধিদফতরের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে তিনি সেটি করেননি।
যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন সেকথা বলা যায়। তার ‘অপমানিত বোধ’ প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা দরকার। রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে তিনি কি বলতে পারেন তিনি অপমানিত অথবা রাগান্বিত? এক কথায় বলতে গেলে ‘না’। পারেন না।
সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের আবেগ-অভিমানের কথা বলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার শপথ ভঙ্গ করেছেন বললেও ভুল হবে না। অন্যদিকে তাকে হেয় করে যা করা হয়েছে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সংবিধানের তফসিল অনুযায়ী শপথ করেছেন, “সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান” করবেন এবং “ভীতি, বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ” করবেন। শপথ ভঙ্গের অর্থ হলো, তিনি সংবিধান লঙ্ঘণ করেছেন যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য অথবা কাম্য নয়।
তবে গত বছর ৫ অগাস্টের পর থেকে রাষ্ট্রপতি নামক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদটিকে যেভাবে ছোট করা হয়েছে সেটিও বাংলাদেশের জন্য একটি কালো অধ্যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের অনুসারীরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সব কাজের বিরোধিতা করতে গিয়ে বঙ্গভবন থেকে আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতিদের ছবি নামিয়ে ফেলেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। সরকার অথবা ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ পাঠানো হয়নি। এর অর্থ হলো খবরটি সত্য। তারা শেখ হাসিনার পছন্দের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসাবে দেখেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসাবে নয়।
কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে থেকে কেউ ইচ্ছা করলেও কোনো দলের হয়ে খুব বেশি কাজ করতে পারবেন না। তাকে কাজ করতে হবে সংবিধানিক কাঠামোর অধীনে। অথবা ওই ব্যক্তি যদি নিজেকে জাহির করতে যান তাহলেও বিপত্তিতে পড়বেন। ব্যবস্থাটি এমনই।
বর্তমান সংবিধান অনুসারে একজন রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রধানের পরামর্শেই সকল দায়িত্ব পালন করতে তিনি সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।
ওই পদে যিনিই বসুন না কেন তাকে ব্যক্তি হিসাবে দেখা সঠিক বিবেচনা নয়। তিনি চাইলেই তার মতো কথা বলতে পারেন না। যেমন ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিন বিএনপির আমলে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করেন। ওই একই রাষ্ট্রপতি ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করেন। বিএনপির একজন ঘোরতর সমর্থক এবং জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রচার করা ইয়াজউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ সরকারের ‘পরামর্শ (নির্দেশ)’ মোতাবেক সেটি করতে বাধ্য ছিলেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ইচ্ছার স্বাধীনতাও নেই। যেমন আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন দেখেছি, তিনি যখন পর পর দুটো সিগারেট চাইতেন তখন তার এডিসি (সামরিক বাহিনীর অফিসার) তাকে দিতেন না। ওই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তিনি একদিন তার এডিসি মেজর মোরশেদের কাছে একটি সিগারেট চাইলেন। মেজর মোরশেদ মুখের ওপর বলে দিলেন, “স্যার, এখন হবে না। আরও দুই ঘণ্টা পর।” এর কারণ আবদুল হামিদের জন্য সিগারেটের একটি লিমিট দিয়ে দিয়েছিলেন তার ডাক্তার এবং সেটি বাস্তবায়ন করার কাজ এডিসিদের। আমি তখন তার সামনে বসা। সিগারেট না পেয়ে আমাকে বললেন, “কোন জায়গায় পড়লাম! একটা সিগারেটও নিজের মতো খাইতে পারি না।…বউ কষ্ট কইরা দুইটা ডিম মামলেট (অমলেট) করে পাঠায়। আমি খাওয়ার আগে টেস্টার খাইয়া দেখে ঠিক আছে কি না। আমার জন্য কতটুকু থাকে!”
বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত বিষয়ে একজন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সত্তা নেই বলা যায়। আবেগী হবেন না, ভয় পাবেন না, রাগান্বিত হবেন না বলে তাকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্য কেন শপথের ব্যবস্থা করা হয়? কারণ এই সকল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিবর্গ আবেগী হলে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভুল হতে পারে। যৌক্তিক ও জনসাধারণের জন্য মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত নিতে তারা সমর্থ নাও হতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও অন্যান্য ব্যক্তিরা রেগে যান, আবেগী হয়ে যান—এমন ধারণা জনসমক্ষে চলে আসাটা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। এমনটা হলে কায়েমী স্বার্থবাদী বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপ তাদেরকে বিভিন্নভাবে হেয় অথবা হেনস্তা করার চেষ্টা করবে। ভয়ভীতি প্রদর্শন করবে। আর সেগুলোকে আমলে নিয়ে আবেগ দিয়ে যদি দেখা হয় তাহলে জনস্বার্থ ব্যাহত হতে বাধ্য।
একজন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, স্পিকার, মন্ত্রী ও অন্যান্য ব্যক্তিদের এই সকল বিষয় থেকে মুক্ত থাকার যোগ্যতা থাকতে হবে। কারণ তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের আচরণ এবং সর্বোপরি জনগণের ভাগ্য।
মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে না দেখে একজন আওয়ামী লীগ-নিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রপতি নামক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিকেই খাটো করেছে। এই প্রবণতা দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়।
অন্যদিকে মো. সাহাবুদ্দিনও নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে বিবেচনা না করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের বিভিন্ন কার্যক্রমগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের অধিকারী ব্যক্তির কাছে প্রত্যাশিত নয়। তিনি যদি ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে সংবিধানের প্রতি অবিচল থেকে তার ওপর ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোকে পাত্তা না দিতেন, তাতেই তার পরিপক্কতা প্রকাশ পেত এবং রাষ্ট্রপতি হিসাবে তার যোগ্যতা প্রমাণ হতো।
দেশ যখন নির্বাচনমুখী এবং দেশের মানুষ যখন একটি নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে ওই সময়ে এমন একটি সাক্ষাৎকার তিনি নাও দিতে পারতেন। তার অনুপস্থিতি দেশে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সেটি তার বোঝা উচিত।
তিনি সেটি না করে প্রমাণ করেছেন রাষ্ট্রপতি হতে গেলে যে ধৈর্য, পরিপক্কতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দরকার সেটি মো. সাহাবুদ্দিন হয়তো রপ্ত করতে পারেননি। রাষ্ট্রপতি যদি পেশাদার রাজনীতিবিদ হতেন তাহলে এসকল প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে এবং কোনো কিছু ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে সবকিছু সামলাতে পারতেন।
রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে অনেক অপমানজনক মন্তব্য আমরা শুনেছি। এর জন্য রাষ্ট্রপতি তো দায়ী নন। মো. সাহাবুদ্দিন যা করতে পারতেন তা হলো তিনি এগুলো ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে পারতেন। তার প্রতি প্রদর্শিত অসম্মানের জন্য তিনি জনগণের সহানুভূতি পেতেন, সম্মান পেতেন।