Published : 24 Jun 2026, 06:24 PM
ডিপ্লোমাধারী ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার সুযোগ দিয়ে হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছিল তা বাতিল করেছে আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ বুধবার বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) করা আপিল মঞ্জুর করে এ আদেশ দেয়।
এ রায়ের ফলে ডেন্টাল সহযোগীরা এখন থেকে কেবল নিবন্ধিত ডেন্টাল সার্জনদের অধীনে সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারবেন। নিজস্ব চেম্বার খুলে স্বাধীনভাবে রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন না।
আপিল বিভাগের এ শুনানিতে ডেন্টাল চিকিৎসকদের পক্ষে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও আনোয়ার হোসেন।
বিএমডিসির পক্ষে আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান ও কাজী এরশাদুল হক এবং রিটকারীদের পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির ও সায়েদা নাসরিন শুনানি করেন।
আপিল বিভাগের রায়ের যৌক্তিকতা ও ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের কাজের পরিধি নিয়ে আইনজীবী আহসানুল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওরা মূলত চিকিৎসকদের সমমানের মর্যাদা চাচ্ছিল–যারা স্বীকৃত মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হন। এই ডিপ্লোমাধারীরা ৩ বা ৪ বছরের ডিপ্লোমাধারী, যারা এসএসসি (মেট্রিক) পাস করার পর এই ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। অথচ তারা চিকিৎসকদের সমমর্যাদা দাবি করছিলেন।"
হাই কোর্টের আগের আদেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “হাই কোর্টের একটি আদেশে তাদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া, রুট ক্যানেল করা ইত্যাদি চিকিৎসা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যা মূলত একজন চিকিৎসকের কাজ।
“হাই কোর্টের ওই রায়ে তাদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করার মত ১০টি কাজের পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন যখন কেউ অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সুযোগ পায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষমতাও চলে আসে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে রিট করিনি, বরং আপিল করেছি।”
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে চালু হওয়া তিন বছর এবং পরে ২০১৩ সালে এক বছরের ইন্টার্নশিপসহ চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) ডিগ্রিধারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং প্রফেশনাল মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ডেন্টাল বা ডিপ্লোমা ডেন্টিস্ট হিসেবে রোগী দেখা এবং ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষমতা চেয়ে ২০১৬ সালে একটি রিট আবেদন হয়।
আবেদনটি করেছিলেন বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল হোসেন। ওই বছরের ১৩ জুন হাই কোর্ট রুল জারি ও শুনানি শেষে তাদের পক্ষে রায় দেয়।
হাই কোর্টের রায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের কাজের ১০টি পরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে দাঁতের প্রাথমিক চিকিৎসা, লোকাল অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে দাঁত তোলা ও ওষুধ দেওয়া, স্কেলিং-পলিশিং, ফিলিং, রুট ক্যানেল ড্রেসিং এবং অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ প্রেসক্রাইব করার মতো বিষয়গুলো ছিল।
কিন্তু হাই কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে বিএমডিসি ২০১৭ সালে আপিল করে।
বুধবার এ আপিলের রায়ের পর ডেন্টাল চিকিৎসকদের আইনজীবী আহসানুল করিম সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার তিনটি কারণের কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আমাদের আপিলের প্রধান ভিত্তিগুলো ছিল¬- প্রথমত, বিএমডিসি আইনের ১৪ ধারা ও চতুর্দশ তফসিল অনুযায়ী এই ডিপ্লোমাধারীদের এমন সনদ প্রদান করা যায় না। দ্বিতীয়ত, হাই কোর্টে তাদের করা রিট আবেদনটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য (মেইনটেইনেবল) ছিল না, কারণ পরিষদের কোনো ‘কজ অব অ্যাকশন’ তৈরি হয়নি। আর তৃতীয়ত, হাই কোর্ট যে আদেশ দিয়েছিলেন, তা আমাদের দেশের সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"
আপিল বিভাগ এসব যুক্তি আমলে নিয়ে হাই কোর্টের রায়টি সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আদালতের এই রায়ের স্পষ্ট অর্থ হলো–ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা চিকিৎসকদের সমপর্যায়ে নিজেদের ডাক্তার বলে পরিচয় দিতে পারবেন না এবং স্বাধীনভাবে চিকিৎসকদের কাজও করতে পারবেন না। তারা কেবল চিকিৎসকদের সহকারী বা সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।"
এর ফলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজের ‘পরিধি নির্দিষ্ট’ হয়ে যাওয়ার কথা বলেন আহসানুল করিম।
তিনি বলেন, “স্বভাবতই তারা এখন থেকে আর স্বাধীনভাবে কোনো প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। চিকিৎসাসেবা প্রদান বা স্বাধীনভাবে রোগী দেখার আর কোনো আইনি এখতিয়ার তাদের থাকবে না।”
ডিপ্লোমাধারীদের প্রেসক্রিপশন লেখার অধিকার সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, “ডিপ্লোমাধারী বিবাদী পক্ষ যদি দাবি করে যে তারা কখনও প্রেসক্রিপশন লেখার অধিকার চায়নি, তবে তাদের সে দাবি অযৌক্তিক। কারণ যখন কাউকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তখন প্রেসক্রিপশন ছাড়া সে রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেবে কীভাবে?"
তিনি বলেন, “আজ যদি আমরা এই আপিল মামলায় হেরে যেতাম, তবে তাদের সেই স্বীকৃতি ও প্রেসক্রিপশন লেখার পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত হতো। কেননা রোগীকে কী ওষুধ দেওয়া যাবে আর কী দেওয়া যাবে না, তা লিখে দেওয়ার নামই তো প্রেসক্রিপশন।”
এদিনের রায়ের পর ডেন্টাল চিকিৎসকদের আরেক আইনজীবী আনোয়ার হোসেন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের কারিকুলাম ও দাবির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আপিল বিভাগে ডেন্টিস্ট ও বিএমডিসির পক্ষে দায়ের করা সিভিল আপিল নম্বর ৬০ এর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আমাদের সিভিল আপিলটি মঞ্জুর করেছেন। এর ফলে ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের পৃথক বা নিজস্ব প্র্যাকটিস করার সুযোগ দিয়ে হাই কোর্ট বিভাগ পূর্বে যে রায় দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেল।"
তিনি বলেন, “তারা কেবল নিবন্ধিত ডেন্টাল সার্জনদের অধীনে সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারবেন। এ কাজের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ের জন্য তারা যদি পরবর্তীতে নতুন করে আবেদন করেন এবং কর্তৃপক্ষ যদি তা বিবেচনা করে, সেটি ভবিষ্যতের বিষয়।”
এ বিষয়ে ডিপ্লোমাধারীদের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব বাংলাদেশ থেকে ৩ বছর মেয়াদী ডেন্টাল ডিপ্লোমা (মেডিকেল টেকনোলজিস্ট
ডেন্টাল) সম্পন্নকারীরা বিএমডিসি আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে হাই কোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট ইতিপূর্বে তাদের বিএমডিসি কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি নির্দেশনা প্রদান করেন।”
হাই কোর্টের সেই নির্দেশনার বিরুদ্ধে আপিল করা হলে বধুবার আপিল বিভাগ সেই আপিল মঞ্জুর করে এবং হাই কোর্টের দেওয়া নির্দেশনাটি বাতিল করেছে, যোগ করেন তিনি।
“ফলে এই ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের বিএমডিসি থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি স্থগিত হয়ে গেল।”
ডিপ্লোমাধারীদের কাজের পরিধি ও প্র্যাকটিস করার সুযোগ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে আইনজীবী আমজাদ বলেন, “তাদের স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করার সুযোগ আইনত অত্যন্ত সীমিত। তাদের মূল সার্টিফিকেটে যেটুকু সুযোগ দেওয়া আছে, তার বাইরে তারা কিছু করতে পারবেন না। তারা কোনোভাবেই রোগীদের ব্যবস্থাপত্র লিখতে পারবেন না এবং অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় কোনো ওষুধও দিতে পারবেন না। তাদের কাজের পরিধি খুবই সীমিত এবং সাধারণ প্রকৃতির-যেমন দাঁত স্কেলিং করা কিংবা দাঁতের প্রাথমিক কিছু যত্ন নেওয়া।”
ডিপ্লোমাধারীরা কী পারবে না পারবে¬, এটার জন্য রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপাতত হাই কোর্টের দেওয়া রায় বাতিল হয়েছে।“