Published : 17 Apr 2026, 09:42 PM
২৫ মার্চের কালরাত্রিতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো খবর জানা যাচ্ছিল না। ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি। এ সময় তার পরিণতি নিয়ে ব্যাপক জল্পনা তৈরি হয়। যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, মুজিবের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এ সময় সংবাদমাধ্যমে কিছু ভুল এবং বিভ্রান্তিকর খবরও প্রকাশ পায়। একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ হলেও উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর অকল্পনীয় ভুয়া খবর প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন—২৮ মার্চ ১৯৭১, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্র ‘যুগান্তর’ আট কলামে সংবাদ শিরোনাম করেছিল, ‘ঢাকায় পাক সামরিক শাসক নিহত’। এ সময় অনেক সংবাদমাধ্যম তাদের খবরে উল্লেখ করে, শেখ মুজিবুর রহমান রণাঙ্গনে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসব সংবাদ যে অতিরঞ্জিত ও ভুয়া ছিল, তা বলা বাহুল্য।

তবে ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল ভিন্ন এক বাস্তবতায় শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করে পাকিস্তান। এদিন পাকিস্তানের প্রধান ইংরেজি দৈনিক ‘ডন’ প্রথম পাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবির ক্যাপশনে বলা হয়, করাচি বিমানবন্দরে আটক অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান। এই ছবিটি ১২ এপ্রিল ১৯৭১ অবরুদ্ধ ঢাকার ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে গ্রেপ্তারের ১৭ দিন পর পাকিস্তান কেন এই ছবি প্রকাশ করল, তা নিয়ে নানান মত আছে। অনেক ইতিহাস গবেষকের ধারণা, ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার খবর প্রকাশের পর মুক্তিসংগ্রামকে দুর্বল করতে ইয়াহিয়া খানের সরকার এই ছবি প্রকাশ করেছিল। আবার অনেকেই উল্লেখ করে থাকেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানাবার জন্য পাকিস্তানের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ছবি প্রকাশে বাধ্য হয় পাকিস্তানের জান্তা সরকার। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে করাচি হয়ে নেওয়া হয়েছিল ইসলামাবাদে। সেখানকার লায়ালপুর (বর্তমানে ফয়সালাবাদ) কারাগারে তাকে বন্দি এবং পরে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের পুরোটা সময় কারাগারে বন্দি থাকলেও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রধান চরিত্র ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যার প্রথম আনুষ্ঠানিক উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর বৈঠকে। সেই বৈঠকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে প্রথম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হাউ ইজ মুজিব, ইজ হি অল রাইট?’ (পৃষ্ঠা ৩১, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি)।

তাজউদ্দীন-ইন্দিরা বৈঠকে তাজউদ্দীন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের পাঠিয়েছেন। এই বৈঠকের পরপরই শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে প্রবাসী সরকারের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের যে শপথ হয়, সেখানেও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় শেখ মুজিবের নাম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৭ এপ্রিল সারা দুনিয়ার সাংবাদিকদের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র পঠিত হয়েছিল, তার বড় অংশজুড়ে ছিল শেখ মুজিবের সংগ্রাম ও স্বাধীনতার আহ্বানের বর্ণনা। তাতে বলা হয়েছিল, “যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান” (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র)।
প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তার কার্যকর উপস্থিতি এবং তার স্লোগান ও দলীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ মুখে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হলেও যুদ্ধদিনে তাকে নিয়ে বিরোধ ও দলাদলি কম হয়নি। মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় বিরোধ ও আত্মঘাতী দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল মুজিববাহিনীকে ঘিরে, যার নেতৃত্বে ছিলেন চার যুবনেতা।

১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর প্রথম সংকট শুরু হয়েছিল এর নেতৃত্ব নিয়ে। শেখ ফজলুল হক মণি ও অন্যান্য যুবনেতার দাবি ছিল, তারাই শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকৃত প্রতিনিধি। সবকিছু পরিচালিত হতে হবে তাদের অধীনে। এমনকি তাজউদ্দীনের প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়েও তাদের আপত্তি ছিল। একটু খেয়াল করে দেখুন তো, মুজিবনগর সরকারের শপথের দিন প্রধান চার যুবনেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক কলকাতাতেই ছিলেন। কিন্তু তারা কি মুজিবনগর সরকারের শপথে উপস্থিত ছিলেন? এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য আমার জানা নেই। খুব সম্ভবত ছিলেন না। যদি তাদের কেউ উপস্থিত থেকেও থাকেন, কোনোদিন এই চার নেতাকে প্রবাসী সরকার নিয়ে কিছু লিখতে বা বলতে শুনেছেন কি? খুব সম্ভবত নয়।
মুজিবনগর সরকার ও মুজিববাহিনী নিয়ে বিরোধের একই চিত্র পাওয়া যায় যুদ্ধদিনে তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সহযোগী (দাপ্তরিক পদ প্রিন্সিপাল এইড) ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’ বইয়ে। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও আ স ম আবদুর রব ‘মুজিব বাহিনী’ নামে আলাদা বাহিনী গড়ে তোলেন। ভারতের দুটি স্থানে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেনারেল ওভান [এসএস উবান] এই প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। আজ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারছি না মুজিব বাহিনী নামে এই আলাদা বাহিনীর কোনো প্রয়োজন ছিল কি না। তবে যদ্দুর জেনেছি, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে শেখ মণির লবি ছিল। তাকে বুঝানো হয় যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সে সময় নেতৃত্ব দিতে অসমর্থ হবে অথবা এই নেতৃত্ব কোনো প্রকার আপস করতে পারে। তাকে আরও বুঝানো হয়, যে যুবশক্তি স্বাধীনতার উন্মেষ ঘটিয়েছে, তারাই কেবলমাত্র সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। প্রয়োজনে এই নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারবে। তাছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হলে এই নবশক্তি চীন বা নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও সার্বভৌম সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করবে। পরে আরও জেনেছি, ভারত সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয় যার অর্থ হলো— ‘এক বাক্সে সকল ডিম না রাখা’। (পৃষ্ঠা ৫২, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি)
মুজিবনগর সরকারের এই বিরোধ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই বজায় ছিল। অনেক সময় এই বিরোধ খুবই নোংরা ও অন্তর্ঘাত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ৭১’ গ্রন্থে। তিনি উল্লেখ করেছেন, শুরুতে প্রবাসী সরকারে ছিল উপদলীয় সংঘাত। পরে মুজিববাহিনী গঠিত হলে তৈরি হয় মুক্তিযুদ্ধের দ্বৈত কমান্ড। কারণ মুজিববাহিনীর ওপর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। তবে এই বাহিনীর প্রতি ভারতীয় উচ্চমহলের সমর্থন ছিল জোরালো, যা রণাঙ্গনে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। আর যেহেতু মুজিববাহিনী ১১টি সেক্টরের অধীনেও ছিল না, তাই সমন্বয়হীনতা ও ভুল বোঝাবুঝি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে আত্মঘাতী সংঘাত তো ছিলই। মঈদুল হাসান উল্লেখ করেছেন, ‘মুজিব বাহিনী’র সদস্য হিসেবে পরিচয়দানকারী এক যুবক আগ্নেয়াস্ত্রসহ সহসা একদিন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে হাজির হয়ে জানায় যে, তাদের এক নেতা তাজউদ্দীনের প্রাণ সংহারের প্রয়োজন উল্লেখ করা মাত্র স্বেচ্ছায় সে এই দায়িত্ব নিয়ে সেখানে এসেছে, যাতে তাজউদ্দীনের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। তাজউদ্দীন তখন অফিসে সম্পূর্ণ একা। তাজউদ্দীন কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে এই যুবক তাকে আরও জানায় যে, এ বিষয়ে সে পূর্ণ স্বীকারোক্তি করার জন্য প্রস্তুত এবং কৃত অপরাধের জন্য কর্তৃপক্ষ যদি তার কোনো শাস্তি বিধান করেনও, তবু তাতে তার কোনো আপত্তি নেই। তাজউদ্দীন আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের পর অস্ত্রসমেত যুবকটিকে বিদায় দেন। সেই সময় ‘মুজিব বাহিনী’র বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কোনো কোনো ইউনিটের এবং আওয়ামী লীগের একাংশের ক্ষোভ ও বিদ্বেষ এতই প্রবল ছিল যে, এই ঘটনা প্রকাশের পর পাছে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তা রোধ করার জন্য তাজউদ্দীন ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ গোপন করেন। (পৃষ্ঠা ১২০, মূলধারা ৭১)
মুজিবনগর সরকারের দিনগুলোতে তাজউদ্দীন ও মুজিববাহিনীর সংঘাতের ইতিহাস আরও দীর্ঘ, যা এই নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ কম। তবে এই দ্বন্দ্ব যে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার পর তাজউদ্দীন আহমদকে যে প্রবলভাবে কোণঠাসা করা হয়েছিল, সে ইতিহাস অজানা নয়। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়েছিলেন যুদ্ধদিনে বাঙালি জাতির কাণ্ডারি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যুবনেতা ও শেখ পরিবারের যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা খুব সম্ভবত আজও চলমান। শুধু একটি তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটিবারের জন্যও মুজিবনগর সরকারের শপথস্থল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে যেতে পারেননি, যেখানে তার নামেই যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকার।
তথ্যসূত্র:
সংযোজন: এই লেখাটি প্রকাশের পর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক লিনু হক ফেইসবুকের মন্তব্যে মাহবুবউদ্দীন আহমদ বীর বিক্রমের লেখা ‘স্মৃতির পাতায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইয়ের উল্লেখ করে জানিয়েছেন, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে চার যুবনেতার দুজন শেখ ফজলুল হক মণি ও সিরাজুল আলম খান উপস্থিত ছিলেন।