Published : 15 Sep 2025, 05:34 AM
জামায়াত, এনসিপি ও তাদের সমমনা আরও ছয়টি দল যে চার দফা দাবিতে আন্দোলনের মাঠে নামতে যাচ্ছে, তার শেষ দাবিটি হচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
দাবিগুলোর প্রথমটি হলো অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। অন্য তিনটি দাবি—সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরি করা এবং ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
১৪ দলের একমাত্র উল্লেখযোগ্য দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাকি দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছাড়া কারও নাম মনে করতে পারবে এমন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। এই দুটি দলের দুই শীর্ষ নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন ও জাসদের হাসানুল হক ইনু এখন জেলে। ফলে ফ্যাসিবাদের দোসরদের মধ্যে বাকি রইল একমাত্র জাতীয় পার্টি।
সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের করা তিনটি নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার দায় জাতীয় পার্টিকে নিতে হবে। ফলে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ইতিহাস নতুন নয়। খোদ আওয়ামী লীগ জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েকদিন আগে নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে কার্যত নিষিদ্ধ করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে বিজয়ের ফলে জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বেশি সময় লাগেনি অবশ্য। তবে এর আগে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অস্তিত্ব বেশ লম্বা সময়ের জন্য বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পরে ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে আরও কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামী তৎপর হয়। জামায়াতের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আইডিএলের ব্যানারে তাদের ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দলটি অবশ্য পাকিস্তান আমলেও দুইবার নিষিদ্ধ হয়েছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বহুদিন ধরে কোণঠাসা জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমানে সক্রিয় প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে এক পঙক্তিতে তাদের নাম উচ্চারিত হয়। তবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বদৌলতে রাজনীতিতে ফিরতে পারা এবং খালেদা জিয়ার সরকারে দুটি মন্ত্রীর পদ পাওয়া জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে এগোচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গী হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীদের হাতে গড়া নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। চার দফার আন্দোলনে এই দুই দলের সঙ্গে থাকছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফতের দুই অংশ—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস। এই ছয়টি দলের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের মোটামুটি জনসমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মজার বিষয় হচ্ছে, ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি যেসব বিষয়ে বিরোধিতা করছে, সম্ভাব্য যুগপৎ আন্দোলনে আসা আট দল সেগুলোই দাবি আকারে আনছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সুতরাং এটা বলা যায়, এই কর্মসূচির অভিমুখ বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। নিশ্চিতভাবে এর ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মাঝে আনুষ্ঠানিক বৈরিতা শুরু হবে।
প্রস্তাবিত ধাঁচে এই যুগপৎ আন্দোলন শুরু হলে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে এতদিন যে বিরুদ্ধতা ও মৌখিক তর্কবিতর্কে দেখা যেত, তা পূর্ণ রাজনৈতিক চেহারা পাবে বলে অনুমান করা যায়। তাতে সমাজে বাড়তি উত্তাপ ও উত্তেজনাও ছড়াবে সম্ভবত। নিশ্চিতভাবে এটা ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত শক্তির জন্য একটি বিজয় হিসেবেই আবির্ভূত হবে।
চার দফা দাবি আদায়ে যুগপৎ এই কর্মসূচি ঘিরে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকারও। ১৪ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান বৈঠকে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনে নামার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই আন্দোলনে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল একা হয়ে পড়তে পারে। সংবাদমাধ্যম দলটির নাম না বললেও সেটি যে বিএনপি, তা বুঝাতে অসুবিধা হয় না।
আটটি দলের সম্ভাব্য এই যুগপৎ আন্দোলনের চালকের আসনে থাকছে জামায়াতে ইসলামী। এই যুগপৎ আন্দোলন জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য করছে, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। গেলেও এটা নির্বাচনি জোট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বেশ সম্ভাবনা আছে। গত দশকগুলোয় জামায়াত কেবল অন্যের নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলন করেছে বা জোটবদ্ধ থেকেছে। এবার সে নিজেই এ রকম একটা উদ্যোগ নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সামর্থ্য দেখাতে চাইছে বলেই ধারণা করা যায়।
জামায়াত ও এনসিপিসহ সমমনাদের চার দফা দাবির মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি একেবারেই সম্মত হবে না। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি সবসময়ই থাকে এবং মেনেও নেওয়া হয়। বাস্তবে কী ঘটে, তা দেখতে ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাহলে বাকি থাকে চার দফার একটি দাবি, ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরই জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হতে পারত। তা হয়নি। বরং সেবার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জেলে থাকার পরও দলটি সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় পার্টির আবির্ভাব কোনো গণআন্দোলনের ফসল নয়; বরং এটি সামরিক বাহিনী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের এক অনিবার্য ধারাবাহিকতা।
১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তার আগে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার—যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বিশ্বস্ত উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত। এরশাদ তাকে সরাতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইমদু কাণ্ড’—যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের সরকারি বাসভবনে এক কুখ্যাত সন্ত্রাসীর উপস্থিতি দেখিয়ে রাষ্ট্রপতিকে বিতর্কিত করা। এই ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে এরশাদ আবদুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং নিজের ক্ষমতার পথ পরিষ্কার করেন। পরে ক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করতে ১৯৮৬ সালে গঠন করেন জাতীয় পার্টি। তবে এরপর বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি এরশাদ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে পৃথক দুই জোটের যুগপৎ আন্দোলনে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় জাতীয় পার্টি এবং পার্টির প্রধান এরশাদকে কারান্তরীণ করা হয়।
তবে দলটি টিকে যায় ভালোভাবেই। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা ৩৫টি আসনে বিজয়ী হয়। সেবার বিএনপি ১৪০, আওয়ামী লীগ ৮৮ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮ আসন পায়। সরকার গঠনের জন্য বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করতে হয়েছিল। তবে তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টিকে ফেলে দেওয়া সম্ভব ছিল না বিএনপির পক্ষে। কারণ জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির মিত্রতা কখনও এতটা নির্ভরযোগ্য ছিল না যে তারা নিশ্চিন্তে ওই দলটিকে ভরসা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পরের বার ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের জন্য জাতীয় পার্টির শরণাপন্ন হতে হয়। সেবার আওয়ামী লীগ ১৪৬, বিএনপি ১১৬, জাতীয় পার্টি ৩২ আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩ আসন পায়।
১৯৯১ থেকে জাতীয় পার্টি একবার বিএনপি, আরেকবার আওয়ামী লীগের ছায়াতলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছে। এরশাদের জীবদ্দশায় দেখা গেছে, যখনই তিনি আওয়ামী লীগের সামান্য বিরুদ্ধাচারণ করেছেন, তখনই তার জেলে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে। এরশাদের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন দলটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। এরই মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন, এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
বিএনপির জন্য কৌশলগত কারণে জাতীয় পার্টির পক্ষে অবস্থান নেওয়া যেমন কঠিন, তারচেয়েও কঠিন দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবিকে সমর্থন করা। তাছাড়া জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হলেই যে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে তুষ্ট করা যাবে, তা নয়। বরং এই দলগুলো এরপর জুলাই সনদ ও পিআর পদ্ধতি আদায়ের জন্য ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে পারে। তারপরও যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়, যেমনটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, তা একতরফা নির্বাচনে পরিণত হতে পারে, যেমনটি ২০১৪ সালে হয়েছিল।
কাজেই আন্দোলনকারী দলগুলো হয়তো চার দফার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করবে জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিতে। জাতীয় পার্টিকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে পারলে সরকার ঘোষিত সময়মতো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলেও, বিএনপিকে একতরফা নির্বাচনের পথে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না এবং টেকসইও হবে না। এর মানে হচ্ছে—রাজনীতির ময়দানে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন কেবল নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে আসছে না, বরং এটি একটি কৌশলগত হিসাব-নিকাশের বিষয়।