Published : 23 Apr 2026, 09:56 AM
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী করার দীর্ঘদিনের যে আকাঙ্ক্ষা, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামে অফিস চালুর সিদ্ধান্ত সে আকাঙ্ক্ষাকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে যাচ্ছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দোহাই দিয়ে আদতে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত করার এই আয়োজন স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে শুধু খর্বই করবে না, বরং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাকেও উসকে দেবে।
অথচ উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের বসার স্থানের নামে অফিস কক্ষ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তপ্রায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই অফিস ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামে অভিহিত হবে। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা তুমুল উৎসাহে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। একজন সংসদ সদস্য তো বসার সুযোগ পেয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ি পাওয়ার আব্দার জুড়ে দিয়েছেন। সরকারের অঘোষিত মুখপাত্র, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ সম্পর্কে নিজেদের পূর্ব সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিলেও বিষয়টি বিবেচনার কথাও বলেছেন। মোটের ওপর সংসদ সদস্যরা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রচলিত রীতি-নীতির তোয়াক্কা করছেন না। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য অফিস কক্ষ চালুর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কেমন হতে পারে, তা কি বিবেচনায় নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়? স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী করার ব্যাপারে বিএনপির ঘোষণা এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে কতটুকু প্রাসঙ্গিক? সরকার কি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চায়—এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকেই। কারণ, এর আগে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোনো প্রকার কারণ দর্শানোর নোটিশ ব্যতিরেকেই বরখাস্তের সুযোগ রাখা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ নিয়ে কোনো সরকারেরই আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ নেই। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করলেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করেনি। এতে করে যে অধ্যাদেশবলে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা আর সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। পরে আবার আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে উপজেলা পরিষদ কার্যত সংসদ সদস্যদের দয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বে চলে যায়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করে কার্যত স্থানীয় সরকারের সর্বজনীন চরিত্র নষ্ট করে। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রতীক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেও আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো অপরিবর্তিত রাখে। উপরন্তু, যেকোনো স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে বিনা নোটিশে বরখাস্ত করে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ সরকারের হাতে রাখা হয়। এমন বাস্তবতার মধ্যে সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিস চালুর বিষয়টি স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতায় শুধু হস্তক্ষেপ নয়, উপজেলা পরিষদে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্যও অস্বস্তিকর হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিটে জনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রেখে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনাও এতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিজেও একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। অত্যন্ত উৎফুল্ল চিত্তে তিনি জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থানে বললেন, সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিস চালুর বিধান না থাকায় ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাদের বসার জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। একে তিনি সম্মানজনক বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং আপনারা ইউএনওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
এই যে ইউএনওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা সংসদে দাঁড়িয়ে একজন মন্ত্রী বললেন, তার প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে যারা কাজ করেন তারা শুধু অনুভব করতে পারবেন। জাতীয় সরকারের সংরক্ষিত দায়িত্ব পালনে এমনিতেই স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তটস্থ থাকতে হয়। সংসদ সদস্যদের অন্যায় হস্তক্ষেপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকের গলদঘর্ম অবস্থা হয়। এখন সংসদ সদস্য সাহেবরা নিজ নিজ অফিসে অবস্থান করে যখন নানা সিদ্ধান্ত দিতে থাকবেন এবং সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতিতে তার অফিসের কর্তৃত্ব নেওয়া দলীয় নেতাকর্মীরা যখন বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবেন, তখন কেমন হতে পারে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা—তা সহজেই অনুমেয়। এখন যেহেতু নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান পরিষদে নেই, তাই সমস্যার কিছুটা আপাতত দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু যখন উপজেলা চেয়ারম্যান ও দুই ভাইস চেয়ারম্যান তাদের নির্ধারিত অফিস করবেন এবং সংসদ সদস্য সাহেব তার নির্ধারিত কার্যালয়ে অফিস করবেন, তখন উপজেলা পরিষদের চারটি অফিসে জনপ্রতিনিধিদের কর্মী, সমর্থক, দলীয় নেতাকর্মী আর সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের আগমনে কেমন অবস্থা হবে? সরকারের দপ্তরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে সংসদ সদস্যদের জন্য অফিস চালু করা হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেক জায়গায় সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে করে উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত করা দপ্তরগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হবে।
সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে টেবিল চাপড়ে অফিস পাওয়ার খুশি উদযাপন করলেও এর মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ কতটুকু স্বকীয়তা হারাবে তা নিয়ে কেউ চিন্তা করছেন না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে অনেকটা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে হাঁটছে সরকার। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করবেন, বিধি-বিধান তৈরিতে ভূমিকা রাখবেন। তারা কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নন। তাহলে একটি মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বাধীন ভবন ব্যবহার করলে তাদেরকেও এই মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত বিধি-ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। সংসদ সদস্যদের ‘বসার জায়গা’ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে—মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পরিদর্শনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরি করা হবে। এখানেও স্পষ্ট বলা হয়নি যে এটি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। ছলচাতুরি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে এটা সংসদ সদস্যদের চাওয়া হিসেবে চালিয়ে দেওয়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যও চরম আঘাত এবং প্রচলিত আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। এই ব্যবস্থা কি মাননীয় সংসদ সদস্যদের জন্য সম্মানজনক?
উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ স্থাপন শুধু নীতিগতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নয়, সংবিধানের অন্তর্নিহিত কাঠামোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ একটি প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা পরিষদের যে ভবনটি একটি উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র, সেখানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরিষদের অন্যান্য সদস্য ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা বসেন। জাতীয় সংসদের যিনি সদস্য, তিনি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সদস্য। কোনো প্রশাসনিক ইউনিটের কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই এবং সেই ধরনের অংশগ্রহণ নৈতিক ও আইনগতভাবে বৈধও নয়।
সংস্কারের কথা বলে সরকারি দল ও বিরোধী দল যখন পরস্পরকে তুলোধুনো করছে এবং সংবিধানের কথা বলে সরকার যখন অনেক জরুরি ও পূর্ব-প্রতিশ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে, তখন কেন সকলে মিলে এমন বেআইনি বন্দোবস্ত ডেকে আনছেন তা বোধগম্য নয়।
তাছাড়া সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের তিনশ আসনের একটি আসনের বিপরীতে। অনেক আসন আছে যেখানে আসনটি একাধিক উপজেলা নিয়ে গঠিত, কিছু আসন আছে বিভিন্ন উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত, আবার কিছু আসন সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত। তাহলে এসব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের অফিস কোথায় এবং কোন পর্যায়ে স্থাপিত হবে? একটি উপজেলায় দুজন সংসদ সদস্যের এলাকা পড়লে ওই উপজেলায় কি দুটি অফিস করতে হবে? আবার সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের অফিসের প্রশ্নও আসতে পারে। এতে করে একটি হযবরল অবস্থা তৈরি হবে।
এই প্রক্রিয়ায় লাভবান হবে কারা? সংসদ সদস্যদের অফিস দিলে স্টাফ দিতে হবে। স্টাফদের নিয়োগ দেবেন আমলারা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণও করবেন আমলারা। সহজ কথায়, সংসদ সদস্যরা তখন আমলাদের খপ্পরে পড়ে যাবেন। আর সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্ম-যোগাযোগ যত বৃদ্ধি পাবে, আমলারা তত জনগণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিকে অবলম্বন করে অসাধু কর্মকর্তারা তোষণে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। এতে সেবা প্রত্যাশীরা দুর্ভোগের শিকার হতে পারেন। সংসদ সদস্যরা উপজেলা পরিষদে বেশি সময় থাকতে পারবেন না; কিন্তু এর সুফল ভোগ করবে আমলা ও সংসদ সদস্যের অফিসে আশ্রয় পাওয়া ব্যক্তিরা। তখন সংসদ সদস্যের অফিসকে ব্যবহার করে একটি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে সংসদ সদস্যরা সমাদৃত হওয়ার চেয়ে সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। কর্মীরাও নানা বলয়ে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের আশায় সিন্ডিকেট তৈরি করবে।
সবকিছু সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য আর অর্বাচীনদের আবদারে পূরণ করলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্টের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রও মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণেতা; আইন ভঙ্গকারী হিসেবে সংসদ সদস্যদের দাপ্তরিক স্বীকৃতি মর্যাদাজনক নয়। এমনিতেই সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ির সুবিধা না থাকলেও আইন অনুযায়ী মাসিক ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়। সরকারি অফিস বরাদ্দ করা না হলেও নির্বাচনি এলাকায় অফিস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা পান ১৫ হাজার টাকা। সরকার ইচ্ছে করলে এই নিয়ম তুলে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক অফিস করে দিতে পারে। সরকার এজন্য একটা বরাদ্দ দিতে পারে এবং একজন-দুইজন কর্মীর ব্যবস্থাও করতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো অবস্থাতেই সরকারি অফিসে সংসদ সদস্যদের জন্য অফিস করা সম্মানজনক নয়। চূড়ান্ত বিচারে এটি হবে গণতান্ত্রিক চর্চার অন্তরায় আর উপজেলা প্রশাসনকে করায়ত্ত করার সুযোগ।