Published : 29 Dec 2025, 09:12 PM
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার ঘাটতি নেই। বরং ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা টাকার পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে সেই টাকা বিনিয়োগের উপযুক্ত খাত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুন নাগাদ আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কাগজে-কলমে হিসাব করলে ধারণা হয়, ব্যাংকিং খাত যেন আবার স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক চিত্র সামনে আসে। বিপুল পরিমাণ তারল্য থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না। ফলে আপাত ব্যাংকখাত নিয়ে যে স্বস্তি বাইরে থেকে দৃশ্যমান, তার গভীরেই লুকিয়ে আছে অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত।
কারণ এই টাকা ঘুরছে না। নতুন কোনো কারখানা গড়ে উঠছে না। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংকে জমা টাকা সংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী, কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে নিষ্ক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এমন জায়গায় নেমেছে, যা কয়েক বছর আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আসলে উদ্যোক্তাদের মনের অবস্থার প্রতিচ্ছবি।
উদ্যোক্তারা এখন নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কারণ ঝুঁকি নেওয়ার জন্য যে আত্মবিশ্বাস দরকার, সেই জায়গাটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপোড়েন আর ব্যাংক খাত সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎটা ঝাপসা হয়ে আছে। যখন আগামী ছয় মাস বা এক বছরের চিত্র পরিষ্কার নয়, তখন কেউই সহজে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় না।
এই স্থবিরতার বিপরীতে একটি দৃশ্য কিন্তু চোখে পড়ছে। ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায়। তিন মাসেই আমানত বেড়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এক অর্থে এটি আস্থার ফিরতি পথের ইঙ্গিত। মানুষ আবার ব্যাংকে টাকা রাখছে, কিছু ক্ষেত্রে আগের ভয় কাটিয়ে। সুদের হারও তুলনামূলক আকর্ষণীয় হওয়ায় অনেকেই নগদ ঘরে না রেখে ব্যাংকে রাখাকেই নিরাপদ ভাবছেন।
কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। এই আমানত বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে না। টাকা ব্যাংকে ঢুকছে, কিন্তু সেখান থেকে অর্থনীতির মাঠে নামছে না। ফলে ব্যাংকের ভেতরে চাপ বাড়ছে, আর বাইরে অর্থনীতির গতি মন্থরই থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর আচরণও বদলে গেছে। তারা এখন তুলনামূলক নিরাপদ পথ বেছে নিচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। এতে ঝুঁকি কম, আয় নিশ্চিত। কিন্তু এর ফল হলো, ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য আরও বাড়ছে, আর বিনিয়োগের গল্প আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের আয়ের ওপরও। সাম্প্রতিক অনিরীক্ষিত হিসাব বলছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। কারণ খুব সহজ। ব্যাংকের ব্যবসা হলো টাকা ধার দেওয়া। সেই ধার দেওয়াই যখন কমে যায়, তখন আয়ও কমে। এদিকে সরকারও ব্যাংকিং খাত থেকে তুলনামূলক কম ঋণ নিচ্ছে। বরং বেশি সুদ দিয়েও সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরকারের নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, আর একই সময়ে সঞ্চয়পত্রের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকায়। স্বল্পমেয়াদে এটি সরকারের জন্য সুবিধাজনক হলেও, ব্যাংকের ভেতরে জমে থাকা অলস টাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
তবে সব দিক অন্ধকার নয়। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের শুরুতে রেমিটেন্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে প্রায় ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই তথ্যগুলো অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংকেত, যেমনটি বারবার উল্লেখ করেছেন বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষকরাও।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই ইতিবাচক সংকেতগুলো এখনো বিনিয়োগকারীদের মন পুরোপুরি বদলাতে পারছে না। কারণ বিনিয়োগ শুধু টাকার প্রাপ্যতা দিয়ে হয় না। হয় আস্থা দিয়ে, নীতির স্থিরতা দিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা দিয়ে।
আরও একটি বাস্তবতা এখানে উপেক্ষা করা যায় না। সব ব্যাংকের অবস্থা একরকম নয়। সরকারি ও বড় বেসরকারি ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত থাকলেও কিছু শরিয়াহভিত্তিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে ভুগছে। এই বৈষম্য পুরো ব্যবস্থার ওপর ছায়া ফেলে। মানুষ ভাবে, যদি কয়েকটি ব্যাংকে সমস্যা থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই কি নিরাপদ?
এই জায়গায় নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু সুদের হার কমল কি না, সেটাই দেখেন না। তারা দেখেন সিদ্ধান্তগুলো কতটা ধারাবাহিক, সংস্কারগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য, আর ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কথাও আলাদা করে বলা দরকার। এই খাতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। অথচ ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতায় এই খাতটাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। ব্যাংক নিরাপদ গ্রাহক খোঁজে, উদ্যোক্তারা নিরাপদ সময়। মাঝখানে পড়ে থাকে সম্ভাবনার গল্পগুলো।
যদি এই অলস টাকা দীর্ঘদিন এভাবেই ব্যাংকের ভেতরে আটকে থাকে, তাহলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজের গভীরে পৌঁছাবে। কর্মসংস্থান বাড়বে না, আয় বাড়বে না, আর ভেতরে ভেতরে চাপ জমতে থাকবে। কাগজে-কলমে অর্থনীতি শক্ত দেখালেও বাস্তবে মানুষ সেই শক্তির ছোঁয়া পাবে না। কেউ কেউ বলেন, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগও ফিরবে। হয়তো ফিরবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, আস্থা একবার নড়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনতে শুধু সময় যথেষ্ট নয়। দরকার স্পষ্ট নীতি, দৃশ্যমান সংস্কার আর ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত।
সবশেষে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা বিপুল অঙ্কের অর্থ নিজেই কোনো সংকট তৈরি করে না। প্রকৃত সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। অর্থনীতির শক্তি কেবল পরিমাণে নয়, তার প্রবাহ ও গতিশীলতায় নিহিত। ফলে এই স্থবির অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে প্রবাহিত করা না যায়, তাহলে যে সম্ভাবনা আজ ইতিবাচক মনে হচ্ছে, তা একসময় অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ হয়ে উঠতে পারে। সারকথা হলো, দেশে অর্থের অভাব নেই। এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো এমন একটি আস্থাভিত্তিক ও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে এই অর্থ বাস্তব উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।