Published : 01 May 2026, 08:42 AM
স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রটি আড়ালে রেখে কোনো নীতি নির্ধারণ করলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার সিংহভাগ—৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ—বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বেসরকারি এই বিস্তৃত খাতকে পাশ কাটিয়ে কিংবা ঢালাও অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দিয়ে স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা কার্যত অবাস্তব। উন্নয়নের প্রকৃত পথে হাঁটতে হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু বিকল্প হিসেবে নয়, অর্থবহ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে জনবান্ধব করে তোলা জরুরি।
বেসরকারি খাতের আধিপত্যের পাশাপাশি আমাদের দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার যে বৃহৎ এবং বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে, তার ধরন ও গভীরতা অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শিকড় ছড়িয়ে আছে তৃণমূল পর্যন্ত, যার প্রথম স্তরে রয়েছে ১৩ হাজার ৩৬০টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এগুলো মূলত গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। এর পরের ধাপে তিন হাজার ৩০৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আউটডোর চিকিৎসা, মাতৃসেবা এবং স্বল্পপরিসরের প্রসবসেবা নিশ্চিত করে গ্রামীণ জনপদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তৃণমূল ছাড়িয়ে উপজেলা পর্যায়ে ৪৩২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩০-৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে ইনডোর-আউটডোর চিকিৎসা, সিজারিয়ান ডেলিভারি এবং জরুরি সেবার পাশাপাশি প্যাথলজি সেবাও প্রদান করছে। আরও উন্নত এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য জেলা পর্যায়ে রয়েছে ৬২টি সদর হাসপাতাল, যেখানে ১০০-২৫০ শয্যার ব্যবস্থার পাশাপাশি সার্জারি, গাইনি-অবস্টেট্রিকস ও শিশু চিকিৎসাসহ উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা বিদ্যমান। এছাড়া জটিল রোগ ব্যবস্থাপনা, বিশেষায়িত সার্জারি এবং চিকিৎসা গবেষণার জন্য ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নির্দিষ্ট রোগভিত্তিক যেমন—হৃদরোগ, ক্যানসার বা কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য ৩৯টি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৃতীয় স্তরের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে ১৮ হাজারেরও বেশি, যা দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য একটি সুবিস্তৃত ও শক্তিশালী সেবা নেটওয়ার্ক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই বিরাট কাঠামোর সফলতা কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বিপুল কর্মযজ্ঞের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতি বছর এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি বহির্বিভাগীয় সেবা (OPD) এবং ৮০ থেকে ১০০ লাখ অন্তর্বিভাগীয় সেবা (IPD) প্রদান করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এক বিপুল অবদান। পাশাপাশি বছরে ১২ থেকে ১৫ লাখেরও বেশি প্রসবসেবা এবং ৯০ শতাংশের বেশি শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৬০ জন রোগী সেবা নিচ্ছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা থাকলে এই কাঠামোটিই হতে পারত দেশের সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাপ্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল।
এত বিশাল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো—জনবল বা মানবসম্পদের ঘাটতি, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এবং সেবার গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণেই দেশের জনগণের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়েই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত আজ আর কোনো গৌণ বিকল্প নয়, বরং আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ধারার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (NIPORT) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ৩৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, জেলা পর্যায়ে দুই হাজার ৬০৯টি ও উপজেলা পর্যায়ে ছয় হাজার ৮০৭টি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং এনজিও পরিচালিত ৮৩৮টি প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি এই দুই খাতের এমন সহাবস্থানই এখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত স্বরূপ।
গত এক দশকে দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে দ্রুত। শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়েও অসংখ্য ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর পেছনে যেমন সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি জনগণের কম সময়ে সহজলভ্য ও তুলনামূলক উন্নত সেবার চাহিদাও বড় কারণ। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেবার মান, অতিরিক্ত ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সিজারিয়ান ডেলিভারির অপব্যবহার এবং রোগী শোষণের অভিযোগও সমানতালে বেড়েছে। ফলে জনমনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—বেসরকারি খাতকে আমরা কি কেবল নিয়ন্ত্রণের শেকলে বাঁধব, নাকি একে উন্নত ও আধুনিক করার পথ প্রশস্ত করব? বাস্তবতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, শুধু কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা দমনমূলক ব্যবস্থা দিয়ে কোনো সেবা খাতকে যুতসই করা সম্ভব নয়। বরং এখানে ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কৌশল প্রয়োজন; যেখানে নিয়মশৃঙ্খলার স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি থাকতে হবে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা, সরকারি সহায়তা ও শক্তিশালী অংশীদারত্ব। বেসরকারি খাতকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব।
এই সংকটময় অবস্থায় সেবার মান নিশ্চিত করাটা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী অ্যাক্রেডিটেশন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে নির্দিষ্ট ও কঠোর মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে শুধু অনুমতি দেওয়াই শেষ কথা নয়, এর পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি এবং একটি স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বজায় রাখা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা এখন এক মারাত্মক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিকারে একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানতে বাধ্য থাকবে। সাধারণত একটি পরিবার যদি তাদের মোট আয় বা ব্যয়ের ১০ শতাংশ বা তার বেশি স্বাস্থ্যসেবার পেছনে খরচ করে, তবে তাকে ‘বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়’ (Catastrophic Health Expenditure) হিসেবে গণ্য করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে এমন বিপর্যয়কর ব্যয়ের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ব্যাংক ঋণ বা ক্ষুদ্র ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা পরিবারগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে। ফলে চিকিৎসা খরচ মেটানোর জাঁতাকলে পড়ে অসংখ্য পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের শিক্ষার খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্য বীমা চালু এবং এর পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে জনগণের ওপর সরাসরি চিকিৎসার ব্যয়ের যে প্রবল চাপ, তা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
সেই সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে মানসম্মত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ছাড়, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে।
বেসরকারি খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের বড় দাবি। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রতিটি হাসপাতালে কোন কোন সেবা পাওয়া যায় তার তালিকা, নির্ধারিত খরচ, কর্মরত চিকিৎসকদের যোগ্যতা এবং রোগীর অধিকার সম্পর্কিত তথ্যগুলো সবার দেখার জন্য উন্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করা উচিত। পাশাপাশি কোনো অনিয়ম হলে অভিযোগ গ্রহণ ও তা নিষ্পত্তির জন্য একটি দক্ষ ও ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জনআস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি সক্রিয় ও কার্যকরী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের যে উপচে পড়া ভিড় ও চাপ থাকে, তা সামাল দিতে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে যেমন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমবে, তেমনি বেসরকারি খাতও একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসবে। এই সমন্বিত উদ্যোগই পারে দেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রকৃত সুশাসন এবং জনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
মনে রাখতে হবে যে, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকেই সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। বেসরকারি খাতকে কোনোভাবেই প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং তাদের বিবেচনা করতে হবে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য সহযোগী হিসেবে। তবে এই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে নীতিনিষ্ঠতা, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা এবং নিঃস্বার্থ জনকল্যাণ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এখন সময় এসেছে সমস্ত বাস্তবতাকে অকপটে স্বীকার করে সাহসী ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার। বেসরকারি খাতকে সুশাসনের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে তাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব এবং এটিই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।