Published : 19 Apr 2026, 06:29 PM
গেল সপ্তাহের শেষ দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত একটি সংবাদে চোখ আটকে গেল। শিরোনাম ছিল, “সামাজিক মাধ্যমে ডেকে নিয়ে ‘একের পর এক ধর্ষণ ও প্রতারণা’, যুবক গ্রেপ্তার।” সংবাদটি পড়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম। মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে এবং ব্যক্তিগত তথ্যকে জিম্মি করে কীভাবে নারীকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়, এটি তার একটি ভয়ংকর উদাহরণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিকটিমদের প্রত্যেকেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং তাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্র ধরে ঘটনার যে বিবরণ জানা যায় তা হলো: রাশেদুল ইসলাম রাব্বি নামের ওই যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া নারী পরিচয়ে একাধিক আইডি খুলে তরুণীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেন। এরপর কৌশলে তাদেরকে নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতন চালাতেন এবং তার ভিডিও ধারণ করতেন। পরে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভিকটিমের ফেইসবুক আইডির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওই নারীর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতেন। নারী কণ্ঠে কথা বলে বা মেসেজের মাধ্যমে তিনি নতুনদের বিশ্বাস অর্জন করতেন। অর্থাৎ, একজনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া পরিচয় ব্যবহার করে তিনি ওই বন্ধু তালিকার অন্যদের সঙ্গে একই কৌশলে প্রতারণা করতেন।
ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। অপরাধের ধরনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাব্বি কোনো উন্নত হ্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেননি। বরং তিনি মানুষের আবেগ এবং তথ্যের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন। বর্তমানে স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের একটি ‘ব্যক্তিগত সিন্দুক’। সিন্দুকের চাবি যখন অপরাধীর হাতে চলে যায়, তখন ভিকটিমের ব্যক্তিগত তথ্যই তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো এই অপরাধের চক্রাকার পদ্ধতি। যেখানে একজন নারীর ফোন দখলের পর অপরাধী ওই ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে তার বন্ধুতালিকায় থাকা অন্য নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এখানে ভিকটিমের বিপদের কারণ কোনো অপরিচিত শত্রু নয়, বরং তার অতি পরিচিত বন্ধুর ছদ্মবেশে থাকা কেউ। মূলত জেন জি প্রজন্মের অনলাইন বন্ধুত্বের যে সংস্কৃতি, রাব্বি ওই আবেগের জায়গাতেই আঘাত করেছেন।

রাব্বির এই অপরাধ কাঠামোটি নতুন কিছু নয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কেভিন মিটনিক ও প্রখ্যাত লেখক উইলিয়াম এল. সাইমন তাদের ‘দ্য আর্ট অফ ডিসেপশন’ (২০০২) বইয়ে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘ইমপার্সোনেশন’ (ছদ্মবেশ ধারণ) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাদের মতে, একজন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার সরাসরি প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের ‘সহজেই বিশ্বাস করার প্রবণতাকে’ বেশি ব্যবহার করেন। রাব্বিও কোনো প্রযুক্তিগত জটিলতা ছাড়াই কেবল মানুষের সহজাত বিশ্বাসকে জিম্মি করেছেন। তিনি যখন একজনের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেন, তখন তিনি শুধু একটি ডিভাইস দখল করেন না, বরং ওই ব্যক্তির পুরো সামাজিক পরিচয়কে কবজায় নেন। মিটনিকের যুক্তি অনুযায়ী, পরিচিত কারও কাছ থেকে আসা মেসেজ নিয়ে মানুষ সাধারণত সন্দেহ করে না। আর এই অতি-বিশ্বাসই ডিজিটাল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
এখানে দুটি বিষয় কাজ করছে—প্রথমত ‘বিশ্বাস’ এবং দ্বিতীয়ত ওই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তৈরি করা ‘নিরাপত্তার ছিদ্র’। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আমরা যারা ‘মিলেনিয়াল’ প্রজন্মের, শৈশবে দেখেছি টাকা-কড়ি কিংবা স্বর্ণালঙ্কার ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো কাগজপত্র লোহার সিন্দুকে সংরক্ষণ করা হতো। আমরা এটাও দেখেছি, মানুষ ব্যক্তিগত তথ্য লিখে রাখা ডায়েরিও সযত্নে আড়ালে রাখতেন। অর্থাৎ, এটি স্পষ্ট যে বিগত নব্বইয়ের দশকেও ব্যক্তিগত জীবন আর জনজীবনের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমানা ছিল। বর্তমানে প্রযুক্তির বিকাশ এই সীমানাটিকেই ক্রমশ অস্পষ্ট করে তুলছে। মূল গোলযোগটা আসলে এখানেই।
যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ফোনের আবির্ভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান এবং সব স্তরে এর সহজলভ্যতা ও অতিনির্ভরশীলতার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। জেন জি প্রজন্মের কাছে তাদের স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সিন্দুক। তবে অতীতের মতো সিন্দুক হারানো এখন আর শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি এখন একজন মানুষের সম্মান কিংবা পুরো অস্তিত্ব হারানোর শামিল। আসলে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা, পেশাগত বিকাশ, এমনকি মানসিক সুস্থতার একটি বড় অংশই ডিজিটাল ডিভাইস, বিশেষ করে মোবাইল ফোন কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আর এই অতিনির্ভরশীলতা ও অনলাইন-নির্ভর উন্মুক্ত সংস্কৃতির সুযোগটিই নেয় রাব্বির মতো সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়াররা।
তাহলে এই প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায় কী? একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়েই যদি তার মধ্যে মিডিয়া পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা যায়, তাহলে সে সহজেই নিরাপত্তার বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারবে। আর এজন্যই ‘মিডিয়া লিটারেসি’ বা মিডিয়া সাক্ষরতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পাঠদান প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এ ধরনের শিক্ষা থেকে শিশুর মধ্যে শৈশব থেকেই বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা তৈরি হবে, যা তাকে হুট করে আবেগপ্রবণ হওয়া থেকে বিরত রাখবে। এছাড়াও কোন তথ্য প্রকাশ করা যাবে আর কোনটি আড়ালে রাখতে হবে, ওই পরিমাপ করার সামর্থ্য তৈরি হবে। আবার ব্যক্তিগত তথ্য কোন ডিভাইসে রাখলে নিরাপদ থাকবে, পাসওয়ার্ডের সুরক্ষা এবং তা কাকে দেওয়া যাবে বা যাবে না—এগুলোও তারা বিচার করতে সক্ষম হবে। শুধু নিজেকে রক্ষা করাই নয়, অন্যের গোপনীয়তাকে সম্মান করা এবং এর বিপরীতের ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষা যদি স্কুল থেকেই শুরু হয়, তবেই আমরা একটি দায়িত্বশীল ও সুস্থ ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব।
নতুন প্রযুক্তি থেকে সন্তানদের দূরে রাখা সম্ভব নয়, কারণ এটি জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাদের যদি ছোটবেলা থেকেই ‘মিডিয়া লিটারেসি’র মাধ্যমে সচেতন করে তোলা যায়, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের চারপাশে একটি সচেতনতার সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে পারবে।
সামাজিক মাধ্যমে ডেকে নিয়ে 'একের পর এক ধর্ষণ ও প্রতারণা', যুবক গ্রেপ্তার