Published : 25 Apr 2026, 03:52 PM
আমরা সবাই পোকার বা কার্ড বা তাস খেলার সঙ্গে পরিচিত। ধরা যাক, একজন খেলোয়াড় প্রতিটা চাল, ভেলকি ও কার্ডের গোপন কলাকৌশল আয়ত্তে আনতে দশকের পর দশক ব্যয় করেছেন। ফলে ওই খেলায় তিনি অর্জন করেছেন অসামান্য এক শৈল্পিক নৈপুণ্য।
অন্যদিকে, তার প্রতিপক্ষ সবেমাত্র খেলতে শুরু করেছে এবং কাণ্ডজ্ঞান, দম্ভ ও ভুল প্রত্যাশার ওপর ভর করে জেতার কামনা করছে। অথচ এসব জিনিস দক্ষতা ও নৈপুণ্যের কোনোদিন বিকল্প হতে পারে না। এখানে কথিত অর্বাচীন খেলোয়াড়টি যুক্তরাষ্ট্র, আর অভিজ্ঞ ও দক্ষ খেলোয়াড়টি ইরান। এই খেলা অর্থাৎ আলোচনা সংঘটিত হয়েছিল ২০২৬ সালের শুরুতে। এই খেলার পুরস্কার ছিল পারমাণবিক বোমা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সেই ব্যাকচ্যানেলে খেলা বা আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।
ওই আলোচনার একপাশে ছিল দীর্ঘ সময় ধরে পারমাণবিক নথিপত্র সামলানো ইরানের অভিজ্ঞ কূটনৈতিক সম্প্রদায়। অন্যপাশে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবসায়ী জামাতা। তিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রশিক্ষণহীন এক কর্মকর্তা। তাই ফলাফল ছিল অনেকটাই নির্ধারিত। দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন না ঘটলে ওই আলোচনাতে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের প্রশ্নই উঠত না; এমনকি টেকসই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোও সম্ভব ছিল না। যুক্তিটা সরল: পররাষ্ট্রনীতিতে জ্ঞান, দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞতার মূল্য আছে।
পরিষ্কার বোঝা যায়, জেনিভাতে মার্কিন-ইরানের ভাষা ও আচরণগত দূরত্ব পরবর্তীকালে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল হামলাকে প্ররোচিত করেছিল। তবে মাঝখানে একটি যুদ্ধবিরতি হয়, যা খুবই ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল। ট্রাম্প এখন যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষণা করেছেন।
আশা করা হচ্ছে, একই মার্কিন কূটনৈতিক দল পাকিস্তানে আলোচনায় বসবে। অভিজ্ঞ কূটনীতিক, অস্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং চুক্তি আলোচনায় কিছু অংশগ্রহণকারীর মতে, ফলাফল পূর্বের মতোই থাকবে। কেননা মূল সমস্যাটি কূটনৈতিক দলের ধ্যানধারণা ও কৌশলের দূরত্বের মধ্যে নিহিত রয়েছে।
ইরানি কূটনৈতিক দলের কথা বললে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই আলোচনার শিরোমণি। তিনি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি আলোচনাতে উপস্থিত ছিলেন। জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি ২০১৫ সালে করা হয়েছিল। তখন মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের অধীনে আরাগচি উপপ্রধান ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এবং বিস্তৃত কর্মজীবনে প্রতিটা দরকষাকষির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আরাগচির সঙ্গী সংসদীয় স্পিকার, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রাক্তন জেনারেল ও তেহরানের প্রাক্তন মেয়র মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার সঙ্গে নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব মোজতবা খামেনির সরাসরি যোগাযোগ আছে। অন্যরা হলেন—জেনিভায় জাতিসংঘে ইরানের প্রাক্তন স্থায়ী প্রতিনিধি ইসমাইল বাঘাই ও আন্তর্জাতিক আইনে দক্ষতা অর্জনকারী বেহজাদ সাবেরি আনসারি। তিনি অতীতে জেসিপিওএ দলকে বিভিন্ন ইস্যুতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এসব অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা ব্যক্তি ইরানিদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার জীবন্ত রূপ। একজন হৃদরোগ সার্জন যেমন ধমনি ও শিরার পার্থক্য বোঝেন, একইভাবে তারা পারমাণবিক চুল্লি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার পার্থক্য নিখুঁতভাবে জানেন।
এবার আমেরিকান প্রতিনিধিদলের কথা বলা যাক। প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় কর্মজীবন গড়ে তোলেন। জামাতা কুশনারের পরিচয় পূর্বেই দেওয়া হয়েছে। তার বিখ্যাত মন্তব্য ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোতে তিনি আগ্রহী নন। ইসলামাবাদ পর্বের নেতৃত্বদানকারী, রাজনীতিতে আগমনের পূর্বে মেরিন কোর ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালে ক্যারিয়ার গড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
সমঝোতার টেবিলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মতো সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়গুলো জড়িত ছিল। অথচ তাদের কারোরই এসব বিষয়ে কোনো পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছিল না। ওমানের রাজধানী মাস্কাটে প্রাথমিক পর্বগুলোতে মার্কিন দলের প্রযুক্তিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নজর কাড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে শোনা যায়, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি উইটকফকে পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং চুল্লির মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দেন। অথচ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, মজুতের সীমা এবং নিয়ন্ত্রণ সময়কালের ধারণা ব্যতীত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভবই ছিল না।
কথা শুধু এখানেই শেষ নয়। পেশাদার কূটনীতিকরা তুলে ধরেন, আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল জেসিপিওএ চুক্তির ত্রুটি অনুসন্ধান ছাড়াই ইরানের ওপর সোজাসাপ্টা দাবি চাপানো এবং দেশটির আত্মসমর্পণের জন্য অপেক্ষা করা। অথচ বাস্তবভিত্তিক সমঝোতার জন্য উভয় পক্ষের আসল চাহিদা এবং প্রকাশ্য চাহিদার মধ্যে ফারাক বোঝা দরকার ছিল।
অ্যারন ডেভিড মিলার অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে ছয়জন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, উপদেষ্টাগণ চরমপন্থী অবস্থানের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ট্রাম্পকে সজাগ করার আগ্রহ দেখাননি। আরও জঘন্য নজিরটি ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পূর্বের দিনগুলোতে। ওই সময়ে দুটি মার্কিন সংস্থার বরাতে উইটকফ ও কুশনার ট্রাম্পকে বলেন, ইরানিরা সময় নষ্ট করছে এবং চুক্তিতে আসতে রাজি নয়। তারা এগারোটা পারমাণবিক বোমা তৈরির ইউরেনিয়াম মজুতের দম্ভ দেখাচ্ছে।
তবে সেই কক্ষে উপস্থিত তৃতীয় পক্ষগুলো একই কথাকে ভিন্নভাবে তুলে ধরে: ইরানিরা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করার প্রস্তাব দিচ্ছিল। একই কথা, কিন্তু দুইটা বিপরীত অর্থ। একটা ব্যাখ্যা যুদ্ধের দিকে টেনে নেয়; অন্যটা যুগান্তকারী সাফল্যের দিকে। এভাবে প্রেসিডেন্টের কাছে ইরানের অবস্থান ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা অথবা উপস্থাপন করা ব্যক্তিরাই যুদ্ধের জন্য দায়ী। জানা যায়, ওই সময় ভুল বোঝাবুঝি যেন না হয়—সেই তাগিদ থেকে মধ্যস্থতাকারী পক্ষ হিসেবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমেরিকায় ছুটে যান। কিন্তু ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্ত ততক্ষণে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
আমেরিকানরা পোকার পদ্ধতি ব্যবহার করে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে নিচ্ছে। এটা লুকানো কার্ড, ধাপ্পাবাজি এবং স্বল্পমেয়াদি বাজির খেলা। তাদের ধারণা, একটা বড় গুটির চাল অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগের হুমকি বা হঠাৎ কোনো কৌশলে পুরো খেলা জিতে নেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ইরান খেলছে ভিন্ন এক খেলা। তাদের জাতীয় মানসিকতায় ওই খেলা গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। পারস্যের জাতীয় খেলা কুস্তিতে কখনো এক আঘাত মেরে বা একবারের আক্রমণে জয় পাওয়া সম্ভব হয় না। বরং কাঙ্ক্ষিত জয় আসে নিরন্তর কৌশলী হয়ে, অবস্থান বুঝে খেলে, ধীরে ধীরে চাপ শোষণ করে এবং প্রতিপক্ষের শক্তিকেই নিউটনের সূত্রের মতো কাজে লাগিয়ে।
একজন কুস্তিগীর যেমন প্রতিপক্ষের ভারসাম্য পাঠ করেন, তার আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করেন এবং তারপর সুযোগ বুঝে আঘাত করেন; ইরান ঠিক সেভাবেই দুই দশক ধরে কূটনীতি পরিচালনা করে আসছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আলোচনার টেবিলেও ফন্দিফিকির, দীর্ঘসূত্রতা ও অস্পষ্ট বার্তা দিয়ে ইরান পোকার কৌশল ব্যবহার করে। আমেরিকানরা যখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি করেছিল, ইরান সেসময় আংশিক স্থগিতাদেশের প্রস্তাব রাখে। ওয়াশিংটন যখন জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যায়, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে চাপ দেয়। প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল কুস্তির চাল। কোনো হঠকারী প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং ছিল চাপ বৃদ্ধির পরিকল্পিত কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে পুনরায় আলোচনায় বসতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, আমেরিকানদের পোকার দৃষ্টিভঙ্গি ইরানের প্রতিটি ছাড়কে দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কুস্তির মতো ধীর ও পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া সহ্য করতে পারে না। তাই এই ধারাটা শুরুতে সর্বোচ্চ দাবি তুলে ধরে, পরে হতাশায় নিমজ্জিত হয়। সবশেষে পতন ঘটে অথবা সামরিক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের গভীরতাকেই ইঙ্গিত করে। দেশটির বেসামরিক কূটনীতিকরা যখন হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তের চুক্তি করেন, একই সময়ে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়। পেশাদাররা ঠিকই জানেন আসল ক্ষমতা কার হাতে এবং কোন সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না। আর সেই মানচিত্রের অভাবে আমেরিকান কূটনৈতিক দল বারবার একই দেওয়ালে খাবি খাচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে ছয়টি বিশ্বশক্তি কাজ করে জেসিপিওএ চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। অথচ এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্প বাড়তি কিছুর প্রত্যাশা করেন; তাও মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এবং এমন লোকদের নেতৃত্বে, যাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কেই কোনো ধারণা নেই।
এই মুহূর্তে একটা সাধারণ মানের চুক্তিও আমেরিকার মান বাঁচাবে; তবে তা জটিল প্রশ্নগুলোকে দূরে ঠেলে দেবে। বৈশ্বিক জাহাজ কোম্পানি এবং বিমা বাজারগুলো সহসাই হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ যান চলাচল শুরু করবে না। তাদের প্রয়োজন যাচাইযোগ্য ও টেকসই শান্ত অবস্থা। মার্কিন-ইরান অর্থাৎ উভয় পক্ষই এখন সর্বাত্মক যুদ্ধ অপছন্দ করছে, ফলে যুদ্ধ বন্ধের নতুন দুয়ার খুলে গেছে। তবে সমঝোতার পথে এক কদম এগোতে পারদর্শী কূটনীতিক দল ব্যতীত দুয়ার খোলা মূল্যহীন। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই এই হিসাব কষতে বড্ড ভুল করেছে। দেশটা ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে ক্রমাগত নাদান লোকদের পাঠিয়েছিল, অথচ সেখানে পেশাদারদের থাকার কথা ছিল।
অভিজ্ঞ কূটনীতিক, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের সত্যিকারের কর্তৃত্ব ছাড়া আমেরিকা সমঝোতা টেবিলে ইরানের সঙ্গে পেরে উঠবে না। যতক্ষণ না এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে, আমেরিকা হিমশিম খেতেই থাকবে। এর ফলে শুধু সময় ও গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে এবং আরেকটি যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হবে। যেমনটা ২৮ ফেব্রুয়ারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল—কূটনীতির হিসাব গরমিল হলে যুদ্ধ শিরোধার্য।
লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত; এর লেখক ভীম ভুর্তেল নেপালের একজন প্রখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও গবেষক। তিনি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, হিমালয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং নেপাল-ভারত-চীন ত্রিমুখী সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন। নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই বিশ্লেষক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।