Published : 18 Feb 2026, 08:58 PM
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। অনেক পরিচিত পুরনো মুখ বাদ পড়লেও নতুন ও অভিজ্ঞদের একটি সুন্দর সমন্বয় সেখানে দৃশ্যমান। ঘোষিত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বেশিরভাগই বড় ধরনের বিতর্কের বাইরে। ব্যতিক্রম শুধু টেকনোক্র্যাট পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, যিনি সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। তার নিয়োগ ঘিরেই দ্বিধান্বিত এখন এদেশের জনপরিসর। কিন্তু কেন জনতার কাঠগড়ায় খলিলুর রহমান?
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি নৈতিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করা নামান্তরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে বিতর্কিত করার সামিল। জনতার একটি বড় অংশ ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃশ্যমান রূপান্তরও প্রত্যাশা করেছে। তাই মন্ত্রিসভা ঘোষণার সময়টা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারা সরকারে থাকছেন আর কারা বাদ পড়ছেন—এ থেকে মানুষ আগামীর রাজনীতির একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজে নিতে চেয়েছে। খলিলুর রহমানের নিয়োগের পর জনতার যেসব অস্বস্তির অভিব্যক্তি চোখে পড়েছে, তা মূলত ওই দৃশ্যমান পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই উদ্ভূত।
রাজনীতিতে ব্যক্তির অতীত, অবস্থান, নীরবতা বা উচ্চারণ—সবই জনস্মৃতি ও জনমতের উপাদান। এখানে সরাসরি অভিযোগের প্রশ্ন নয়; বরং মানুষ স্মৃতির মধ্য দিয়ে বর্তমানকে বিচার করে। পূর্ববর্তী সময়ে তিনি কী ভূমিকা পালন করেছেন, সংকটের মুহূর্তে তার অবস্থান কতটা স্পষ্ট ছিল, অথবা তিনি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার প্রতিনিধিত্ব করেন কি না—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনা সবসময় প্রমাণভিত্তিক না হলেও জনমত গঠনে প্রভাব ফেলে। খলিলুরকে ঘিরে অস্বস্তির একটা অংশ এই স্মৃতি-রাজনীতি থেকেই উঠে এসেছে।
একইসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষত্ব বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। পররাষ্ট্রনীতি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কৌশলগত দক্ষতা একসঙ্গে বিবেচ্য। গণঅভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। ফলে সাধারণ মানুষের একটা অংশ ভাবছে, এই নাজুক সময়ে আমাদের নেতৃত্ব কতটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এগোতে পারবে। এটি ব্যক্তিগত আস্থার চেয়ে বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে সাধারণ মানুষের সতর্ক দৃষ্টি হিসেবে বিবেচ্য।
নতুন-পুরাতনের সমীকরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী পুরনো মুখ বাদ দিয়ে নতুনদের জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনতার মধ্যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগিয়েছে। কিন্তু রাজনীতি কখনো সম্পূর্ণ শূন্য থেকে শুরু হয় না। নতুন কাঠামোর মধ্যেও পূর্বের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে যায়। খলিলুর রহমানের নিয়োগকে কেউ কেউ ওই পুরনো ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখেছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজনীতিতে পরিবর্তনের ডাক কি সত্যিই আন্তরিক, নাকি এটা কেবল কৌশলগত কোনো পদক্ষেপ?
এই অস্বস্তির পেছনে ডিজিটাল জনপরিসরের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। একটি নিয়োগ ঘোষণার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সমর্থন, সমালোচনা, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। কখনো অল্প কয়েকটি মতামতও বড় বিতর্কে রূপ নেয়। ফলে যে সন্দেহ হয়তো সীমিত ছিল, সেটিও দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। খলিলকে ঘিরে বিতর্কের বিস্তৃতি আংশিকভাবে এই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতির ফল।
একটি অভ্যুত্থানের পর মানুষের নৈতিক প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই উঁচুতে থাকে। সবাই চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অতীত থেকে দৃশ্যমান দূরত্ব। কিন্তু সরকার পরিচালনায় রাজনৈতিক ভারসাম্য, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব কৌশলও বিবেচ্য। এই নৈতিক প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক তৈরি হলে অস্বস্তি দেখা দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেহেতু বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই এখানে কাকে বসানো হলো সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খলিলুর রহমানের নিয়োগকে সবাই এক চোখে দেখছেন না। কেউ তার দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, আবার কেউ ভাবছেন এটি হয়তো কোনো রাজনৈতিক আপস। এই চিন্তার অমিল থেকেই মূলত সাধারণ মানুষের মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আস্থার প্রশ্ন। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকার শুরুতেই জনগণের সমর্থন পেলেও ওই সমর্থন শর্তহীন নয়। মানুষ এখন সতর্ক। খলিলুর রহমানকে ঘিরে এই আলোচনা আসলে মানুষের ওই সাবধানী মনোভাবেরই অংশ। তারা এখন তাড়াহুড়ো করে কাউকে ভালো বা মন্দ বলে দেয় না; বরং সময় নিয়ে সবকিছু পরখ করে দেখতে চায়।
দেশের অভ্যন্তরীণ প্রত্যাশা ও বাইরের কূটনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়ও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বহুল আলোচিত। ফলে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিটি পদক্ষেপ বাড়তি নজরে থাকাই স্বাভাবিক। এই বাড়তি নজরদারি সম্পর্কে জনতার সচেতনতা থেকেই দ্বিধার একটা অংশ তৈরি হয়েছে।
ব্যক্তির ওপর মানুষের প্রত্যাশার চাপও এখানে প্রভাবক। অনেক সময় কাঠামোগত নানা সমস্যার দায় একজনের ওপর এসে পড়ে, ফলে তিনিই বিতর্কের মুখে পড়েন। খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রেও ওই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মানুষ তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির বাস্তবতাও পরখ করছে।
একটা বিষয় পরিষ্কার, মানুষের এই অস্বস্তি মানে তাকে সরাসরি নাকচ করে দেওয়া নয়। গণতন্ত্রে যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা, খুঁটিয়ে দেখা বা সমালোচনা করা খুবই স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর। এটিই সচেতন নাগরিক সমাজের লক্ষণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক আসলে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ। এখানে ঢালাও অভিযোগের চেয়ে যুক্তিপূর্ণ প্রশ্নই বেশি চোখে পড়েছে।
একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, সরকার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের ভূমিকা সময়ের সঙ্গে তার কূটনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও নীতিগত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হবে। বর্তমানের অস্বস্তি একটি সূচনালগ্নের প্রতিক্রিয়া, যা কাজের ধারাবাহিকতা দিয়ে বদলাতে পারে। জনমত কখনো স্থির থাকে না; কাজের অভিজ্ঞতাই শেষপর্যন্ত মানুষের মতামত নির্ধারণ করে।
সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে জনতার দ্বিধা একক কোনো কারণের ফল নয়। সময়ের প্রেক্ষাপট, উচ্চ প্রত্যাশা, জনস্মৃতি, ডিজিটাল আলোচনার গতি এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা—সব মিলে এটি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষিত হবে। তাই এই বিতর্ককে গণতন্ত্র বা নবগঠিত সরকারের সংকট হিসেবে না দেখে একটি সজাগ সমাজের লক্ষণ হিসেবে পড়া যায়।
রাষ্ট্র ও সরকার যদি স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট রাখতে পারে, তবে সময়ের সঙ্গে এই দ্বিধা কমবে। আর যদি জনতার প্রত্যাশা ও নীতিগত বাস্তবতার ব্যবধান বাড়ে, তবে অস্বস্তি আরও দৃশ্যমান হবে। আপাতত বলা যায়, খলিলুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তরের পথে প্রাথমিক একটি পরীক্ষা মাত্র।