Published : 05 Aug 2025, 05:44 PM
দিল্লি পুলিশের লেখা এক চিঠিতে বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ উল্লেখ করায় গত কয়েকদিন ধরেই ভারতের রাজনীতিতে তুমুল শোরগোল চলছে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, চিঠিতে পুলিশ যে ভাষা ব্যবহার করেছে তা কেন্দ্রীয় সরকারের চিন্তারই প্রতিফলন, তারা বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে খাটো করতে চায় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বলে দেখাতে চায়।
এর পাল্টায় বিজেপি বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষার রূপ আলাদা, যে কারণে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে দিল্লি পুলিশ ঠিক কাজটাই করেছে।
আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা; তার আগে ভাষা নিয়ে এ বিজেপি ও তৃণমূলের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থান বাংলাদেশলাগোয়া রাজ্যটিকে তাঁতিয়ে দিয়েছে, জানিয়েছে আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, সম্প্রতি দিল্লির লোধি কলোনি থানার এক পরিদর্শক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের দিল্লি কার্যালয়ের অন্তর্গত বঙ্গভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে লেখা এক চিঠিত ৮ সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীকে নিয়ে করা এক তদন্তের জন্য অনুবাদক চেয়ে চিঠি দেন।
ওই সন্দেহভাজনদের কাছে যেসব নথি পাওয়া গেছে সেগুলো ‘বাংলাদেশি ভাষায়’ হওয়ায় এই অনুবাদক চায় দিল্লি পুলিশ।
এ চিঠি দেখেই ক্ষেপে যায় তৃণমূল কংগ্রেস।
রোববার তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দোপাধ্যায় চিঠিটিকে ‘অপমানজনক, রাষ্ট্রবিরোধী ও অসাংবিধানিক’ অ্যাখ্যা দেন।
দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন, তিনি চিঠি লেখা পুলিশ কর্মকর্তার সাজাও দাবি করেছেন।
দিল্লি পুলিশ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন।
“বিজেপি বাংলা বিদ্বেষের সকল সীমা পার করে ফেলছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে একের পর এক বাংলাভাষী শ্রমিকের হেনস্তা ও গ্রেফতারের পর, এ বার অমিত শাহের দিল্লির পুলিশ সব সীমা অতিক্রম করে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে দাগিয়ে দিল।
“কোনও ভুল নয়—এটি একটি ইচ্ছাকৃত অপমান, পরিকল্পিত চক্রান্ত, যেখানে সংবিধানে স্বীকৃত এবং ধ্রুপদী ভাষার মধ্যে অন্যতম একটি ভাষাকে পরিচয়হীন করে দেওয়া হচ্ছে এবং কোটি কোটি বাংলাভাষী ভারতবাসীকে নিজেদের দেশেই বহিরাগত হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা চলছে। বাংলা ভাষায় সারা বিশ্বে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ কথা বলেন। এটি ভারতের ২২টি সরকারি ভাষার মধ্যে একটি। সেই ভাষাকে ‘বাংলাদেশি’ বলা কেবলই একটি ঘৃণ্য অপমান নয়, ভাষাটির ভারতীয় পরিচয় মুছে দেওয়ার, তার বৈধতা খারিজ করার এবং বাংলাভাষী মানুষদের বহিরাগত প্রমাণ করার নির্লজ্জ চেষ্টা,” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলে তৃণমূল কংগ্রেস।
তবে বিজেপি দিল্লি পুলিশের লেখা চিঠিতে কোনো ভুল দেখছে না।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি, রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, “একদম ঠিক ভাষাই ব্যবহার করা হয়েছে। আপনি বাংলাদেশের একটা বই এনে পড়ুন। আর পশ্চিমবঙ্গের একটা বই এনে পড়ুন। আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন, কোনটা সুবোধ সরকার লিখেছেন, আর কোনটা বাংলাদেশের সফিকুল ইসলাম লিখেছেন।
“ওই ভাষাটা পড়লেই বোঝা যায়। সুতরাং বাংলা ভাষায় কথা বললেই সে ভারতবাসী হয়ে যাবে, বাংলা ভাষায় কথা বললেই তার নামটা ভোটার লিস্টে রেখে দিতে হবে, এটা হতে পারে না। পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন জায়গায় নকল আধার কার্ড নিয়ে এখন ওরা বঙ্গভবনের মধ্যেও ঢুকে পড়ছে।”
মঙ্গলবার আরও একধাপ এগিয়ে বাংলাকে ভাষার তালিকা থেকেই বাদ দিয়ে দিয়েছেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য।
তিনি বলেছেন, “দিল্লি পুলিশ অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ভাষা বলে একদম ঠিক কাজ করেছে। আর এই শব্দ ব্যবহারের একমাত্র কারণ, ওই অনুপ্রবেশকারীদের ভিন্ন বাচনশৈলী, যা সাধারণ ভাবে ভারতে ব্যবহার হয় না।
“প্রকৃতপক্ষে, ‘বাংলা’ নামে কোনো ভাষা নেই যা এই সমস্ত ভিন্ন রূপগুলোকে একসঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে ধারণ করে। ‘বাংলা’ শব্দটি ভাষাগত ঐক্য নয়, বরং একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচায়ক। তাই দিল্লি পুলিশ যখন বাংলাদেশি ভাষার কথা উল্লেখ করছে, এটা তখন অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার জন্য। এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে ভাষাভাষী মানুষদের কোনো যোগ নেই।”
তবে এ দ্বৈরথে সাহিত্যিক, শিল্পীদের পাশাপাশি একাধিক বিরোধী দলেরও সমর্থন পেয়েছে তৃণমূল।
ইনডিয়া জোটের শরিক ডিএমকে, কংগ্রেস, সিপিআইএমএল লিবারেশন ও ত্রিপুরার টিপরা মোথা দিল্লি পুলিশের এমন চিঠির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিন বলেছেন, পুলিশের শব্দচয়ন ‘আমাদের জাতীয় সঙ্গীত রচিত হয়েছে যে ভাষায়, সে ভাষাকে সরাসরি অপমান করেছে’।
কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ বিজেপির বিরুদ্ধে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করে বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) মাধ্যমে তাদের তো একপ্রকার বাংলাদেশি বলে ঘোষণা করাই হয়েছে, এবার তাদের ভাষাকেও খাটো করা হচ্ছে।
টিপরা মোথার প্রধান প্রদ্যোৎ দেববর্মা বলেন, “ভাষার সঙ্গে জাতীয়তার সংযোগ টানা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ভারতের বহুত্ববাদী ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক।”