Published : 05 Feb 2026, 04:23 PM
ভারতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে।
দেশটির বেশ কয়েকটি রাজ্য জানিয়েছে, তারা সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় কার্যকর হওয়া এ সংক্রান্ত কঠোর আইনটি পর্যালোচনা করে দেখছে।
সম্প্রতি অন্তত দুটি দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যের মন্ত্রিরা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা শিশুদের সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে রাখতে কতটা কার্যকর হবে তা খতিয়ে দেখছেন তারা।
বিবিসি লিখেছে, কিছুদিন আগে ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার নেতৃত্বে হওয়া বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ইকোনমিক সার্ভে’-তেও কেন্দ্রীয় সরকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শিশুদের জন্য বয়সভিত্তিক সীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
এই সুপারিশ মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক না হলেও এটি নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ ভারতের জন্য সহজ হবে না, এবং এটি বড়সড় আইনি প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। এ নতুন আইনের কল্যাণে প্ল্যাটফর্মগুলোই ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
কেবল অস্ট্রেলিয়া নয়, গত সপ্তাহে ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষেও ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের একটি বিল অনুমোদিত হয়েছে; যা এখন সেনেটে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
ভারতে, অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের প্রভাবশালী দল তেলুগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সংসদ সদস্য এলএসকে দেভারায়ালু দিনকয়েক আগেই পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করেছেন। এই বিলে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত বিল হওয়ায় এর আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও এটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার পথ তৈরি করেছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ইতোমধ্যে বৈশ্বিক আইনগুলো পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রীদের একটি দল গঠন করেছে এবং মেটা, গুগল ও এক্স-এর মতো বড় বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ নিয়ে আলোচনার জন্য ডেকেছে। তবে ওই আমন্ত্রণ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলো কোনো মন্তব্য করেনি।
রাজ্যটির তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী নারা লোকেশ বলেছেন, শিশুরা যেভাবে লাগাতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছে তা তাদের মারাত্মক ক্ষতি করছে; তাদের মনোযোগ ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
“সোশাল মিডিয়া যেন নিরাপদ জায়গা হতে পারে তা নিশ্চিত করবো আমরা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর যেটা হচ্ছে তা কমিয়ে আনবো,” বলেছেন তিনি।
গোয়া এবং কর্ণাটক রাজ্যও একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ‘ভারতের সিলিকন ভ্যালি’ খ্যাত বেঙ্গালুরু যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই কর্ণাটকের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গে বিধানসভায় জানিয়েছেন, প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিতে তারা কাজ করছেন।
ইতোমধ্যে তারা মেটা-র সহায়তায় প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী ও ১ লাখ শিক্ষকের জন্য একটি ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ প্রোগ্রাম চালু করেছেন।
গোয়ার পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী রোহান খাউন্তে বলেছেন, তার রাজ্যও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আইনি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
কিন্তু রাজ্য পর্যায়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জটিলতা সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন।
ডিজিটাল অধিকার কর্মী নিখিল পাহওয়া বিবিসি-কে বলেন, “বয়স যাচাই করা এত সহজ নয়। এই নিষেধাজ্ঞা মানতে গেলে কোম্পানিগুলোকে ইন্টারনেটের প্রতিটি ব্যবহারকারীকে যাচাই করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, এক রাজ্যে নিষেধাজ্ঞা থাকলে পাশের রাজ্যে তা না থাকলে প্রযুক্তিগত ও আইনি জটিলতা তৈরি হবে।
এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও অনেক শিশু বিবিসিকে বলেছে, তারা ভুয়া জন্মতারিখ ব্যবহার করে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারছে।
টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের প্রোগ্রাম প্রধান ও পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ প্রতীক ওয়াঘরে মনে করেন, এই আইনের প্রয়োগ মূলত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, “তাত্ত্বিকভাবে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু অ্যাপ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো এই নির্দেশ মেনে চলবে কি না, নাকি তারা আদালতের দ্বারস্থ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।”
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সমস্যাটি শনাক্ত করা গেলেও কেবল নিষেধাজ্ঞার মতো ‘ছোট পদক্ষেপে’ বড় কোনো সুফল নাও আসতে পারে।
এক হাজার ২৭৭ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ভারতের ডিজিটাল পরিসরে অতিরিক্ত বাধার মুখে পড়তে পারে।
দেশটিতে অনেকে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সহায়তায় অ্যাকাউন্ট খোলে, ব্যক্তিগত ইমেইলের সঙ্গে ওই অ্যাকাউন্ট সংযুক্তও করা থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত মালিকানা নিশ্চিত করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বয়স নিশ্চিত করা যে কতটা জটিল হবে, তা ভাবাই যাচ্ছে না।
অনেক অভিভাবক এই নিষেধাজ্ঞার ভাবনাকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ সমস্যার আরও গভীরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
দিল্লির বাসিন্দা জিতেন্দ্র যাদব, যার আট ও চার বছর বয়সী দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে, তিনি বলেন, “বাবা-মায়েরা নিজেরাই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে ব্যর্থ হন, পরে তাদের ব্যস্ত রাখতে হাতে ফোন তুলে দেন, সমস্যার শুরুটা আসলে সেখানেই।”
“আমি নিশ্চিত নই যে এই নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজে আসবে কি না। কারণ যতক্ষণ না বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন বা সৃজনশীল কাজে যুক্ত না করতে না শিখছেন, ততক্ষণ শিশুরা এই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ ঠিকই খুঁজে বের করবে,” বলেছেন তিনি।
লিংক-