Published : 10 Apr 2023, 04:40 PM
পেলভিসের তলায় ট্রামপোলিন শরীরের শক্তির কেন্দ্রই শুধু নয়, এই পেশি কয়েক ধরনের প্রতঙ্গকে নিজ অবস্থানে ধরে রাখে। যেমন- ব্লাডার, বাওয়েল এবং নারী জননাঙ্গ ও জরায়ু। এসব প্রত্যঙ্গের কর্ম ক্ষমতা বজায় রাখতে পেলভিক ফ্লোর পেশির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এরপরও শরীর চর্চায় অনেকেই ভুলে যান এই পেশির যত্ন নিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ফিমেল পেলভিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অ্যামি পার্ক বলেন, অনেকের হয়ত জানাই নেই শরীরে পেলভিক পেশির অস্তিত্ব নিয়ে; অন্তত যতক্ষণ না এর কর্মক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়।
“পেলভিক জায়গাটা নিয়ে আমাদের মধ্যে সাধারণ সচেতনতার অভাব আছে। আমি তো দিনের মধ্যে কয়েক দফা নারীকে বোঝাই আমাদের পেলভিক ফ্লোর পেশি রয়েছে।”
ট্রাইসেপ বা কোয়াড পেশির মত ফুটে না উঠলেও, শরীরে অনেক কাজে পেলভিক পেশির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন- প্রাতঃক্রিয়া থেকে যৌনস্বাস্থ্য অথবা বসা থেকে দাঁড়ানো। শরীর চর্চার মধ্যে দিয়ে পেলভিক পেশির সুস্থতা ধরে রাখা যায়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে প্রায় একজন পেলভিক ফ্লোর ডিজঅর্ডার রোগে ভোগেন।
ইউরিনারি ইনকনসিসটেন্স বা প্রস্রাব ঝরে পড়া, বাওয়েল সিনড্রম, পেলভিকে ব্যথা, পেলভিক অর্গান প্রল্যাপস– এমন উপসর্গ নিয়ে অসুস্থতা শুরু হতে পারে।
কেবল সন্তান প্রসব করেছেন এমন নারীর বেলায় এসব স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেয়– এমন ধারণা ঠিক নয়। গবেষণা বলছে, কখনো সন্তান প্রসব করেননি– এমন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও পেলভিক ফ্লোর ডিজঅর্ডারে ভুগতে পারেন।

খেলাধুলা ও শরীর চর্চা করার সময় পেলভিক ফ্লোর ভারসাম্য ও চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।
ডিজিটাল পেলভিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান পেলভিকসেন্স পরিচালনাকারী হেচ বলেন, “আমি যদি পিকলবল খেলি এবং একটা শট নিতে চাই, আমার পেলভিক ফ্লোর শরীরের কাঠামোকে সহযোগিতা করে শক্তপোক্ত হতে।”
পেলভিক ফ্লোর পেশিতে জটিলতা দেখা দিতে পারে যদি কোনো কারণে দীর্ঘ সময় ধরে পেশিতে অতিরিক্ত টান পড়ে। এতে পেশি ছিঁড়ে যেতে পারে অথবা দুর্বল হয়ে যায়।
দৌড়, নাচ, ভারী কিছু তোলার সময় শরীরের ভঙ্গিমা সঠিক না হওয়ার কারণে এমন হতে পারে।
আবার দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা, ঘন ঘন কাশি, গর্ভধারণ ও প্রসবের কারণেও পেলভিক ফ্লোর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অনেকে নিয়মিত মলমূত্রের বেগ চাপিয়ে রাখেন, এতে পেশি শক্ত হয়ে যায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার মানসিক চাপে ও অস্থিরতা থেকেও অনেকে এই অংশে পেশি শক্ত করে রাখেন।
প্যানডেমিক পেলভিক বলে নতুন একটি উপসর্গের নাম আলোচিত হয়েছে বলে জানাচ্ছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। দীর্ঘসময় বসে থাকার কারণে এই ডিজঅর্ডার হয়।
তবে পেলভিক ফ্লোরে সমস্যা চিকিৎসার বাইরে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত শরীর চর্চার মধ্যে দিয়ে এই পেশির সুস্থতা ফিরিয়ে আনা যায়।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিস সেন্টারের সেক্সুয়াল মেডিসিন ও মেনোপজ বিভাগের মেডিকেল পরিচালক লরেন স্ট্রেইচার একজন থেরাপিস্ট এবং পেলভিস প্রশিক্ষক। তার পরামর্শ হচ্ছে, পেলভিক ফ্লোর ডিজঅর্ডার বা স্বাস্থ্যসমস্যা নেই এমন নারীদের প্রত্যেকের ছয় ধরনের প্রাথমিক ব্যায়াম নিয়মিত শরীর চর্চায় রাখা উচিত।
এসব ব্যায়াম প্রতি সপ্তাহে তিন বার করতে হবে। মিরাকল বলেন,”যে কোনো সময় এই ব্যায়াম করা যায়, যা নারীকে আরাম দেবে।”

মধ্যচ্ছদা দিয়ে শ্বাস নেওয়া
বক্ষগহ্বর ও উদর গহ্বরের মধ্যে মাংসপেশি দিয়ে গঠিত বিশেষ পর্দা হচ্ছে মধ্যচ্ছেদা বা ডায়াফ্রাম।
একটি চেয়ার নিতে হবে এই ব্যায়ামের জন্য। চেয়ারে এমনভাবে বসতে হবে যেন পায়ের তালু মেঝেতে সমান করে রাখা যায়। একটি হাত পেটে এবং অপর হাত রাখতে হবে বুকের উপর।
শ্বাস নিতে হবে এমন ভাবে যেন পেট ফুলে ওঠে। এবার ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়তে হবে মুখ দিয়ে।
প্রক্রিয়াটি অনেকটা বেলুন ফোলানোর মত। কল্পনা করতে হবে পেটের ভেতরে একটি বেলুন রয়েছে যা শ্বাস নিতে নিতে বাতাস ভর্তি হয়ে ফুলে ওঠে। আবার নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলে দিলে বেলুনটি চুপসে যায়, যেমন বেলুনের মুখ চেপে রাখা আঙ্গুল সরিয়ে নিলে বাতাস বার হয়ে যায়।
এভাবে ১০ বার এই ব্যায়ামের পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
পেলভিক ফ্লোর দীর্ঘায়িত করা
কোনো কাজে পুরো শরীরকে তাল মেলাতে শিথিল ও লম্বা পেলভিক ফ্লোর পেশি জরুরি। এতে ব্যথা বা কষ্ট ছাড়াই মলত্যাগ কিংবা যৌনক্রিয়া করা যায়।
এই ব্যায়ামে পিঠ সমতলে রেখে আরামে শুয়ে পড়তে হবে। পায়ের তালু মেঝেতে রেখে হাঁটু ভাঁজ করা থাকবে।
এবার মধ্যচ্ছদা দিয়ে শ্বাস নিতে হবে। গভীর ভাবে শ্বাস নিতে হবে যেন ফুসফুসের নিচের দিক বাতাসে ভরে যায়।
পেটের নিচে, পিঠের নিচে এবং পেলভিক ফ্লোরে মৃদু টান অনুভব হবে এ সময়।
এরপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে দিতে হবে। এ সময় পেট, পিঠ ও পেলভিক ফ্লোর শিথিল থাকবে। নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় পেশিতে টান দেওয়া যাবে না।
এভাবে ১০ বার এই ব্যায়াম করতে হবে।

আগের ব্যায়ামে পেলভিক ফ্লোর পেশি শিথিল হবে। আর কিগেল ব্যায়াম করলে পেশির সঙ্গে পেশির সন্ধি হবে মজবুত। এ ধরনের ব্যায়াম করলে মলমূত্রের বেগ ধরে রাখা সহজ হয়।
এছাড়া এই ব্যায়ামে তলপেটের পেশি শরীরের প্রত্যঙ্গগুলোর ভার সারাদিন বহন করার মত পোক্ত হয়।
শুরু পায়ের তালু মেঝেতে রেখে বসতে হবে। এবার নাক দিয়ে শ্বাস নিতে হবে পেলভিক ফ্লোরকে শিথিল করে যেন পেট ও বুকের খাঁচা প্রসারিত হতে পারে।
নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ফেলভিক ফ্লোর পেশি সংকুচিত করে রাখতে হবে। এভাবে ১০ সেকেন্ড পেশি শরীরের ভেতরের দিকে চেপে রাখতে হবে; যেভাবে প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ চেপে রাখি আমরা তেমন করে।
এরপর চার থেকে ১০ সেকেন্ড কিংবা আরও বেশিক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। কারণ সংকুচিত হওয়া পেশি আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক শিথিল হওয়া জরুরি।
এই ব্যায়াম এক বসায় তিন থেকে ১০ বার করতে হবে।
দ্রুতলয়ে কিগেল
পেলভিক ফ্লোর পেশি যেন চটজলদি নড়াচড়ার সময় বেকায়দায় না ফেলে তাই একটু চটপট করে কিগেল ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে।
এতে করে জোরে হাঁচি-কাশি বা হাসির সময় প্রস্রাব ঝরে যাওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
পায়ের তালু সমতলে রেখে বসতে হবে। পেশি একসঙ্গে চাপ দিয়ে শরীরের ভেতরের দিকে টানতে হবে আগের মত। খেয়াল রাখতে হবে ১০ সেকেন্ডে অন্তত সাত বার এভাবে পেশি ভেতরের দিকে চেপে ধরতে হবে ও শিথিল করতে হবে।
এভাবে এক বসায় ৩০ বার এই ব্যায়ামের পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়া
চাপ সহ্যশক্তি বাড়াতে এই ব্যায়াম বেশ কাজের।
পায়ের তালু মেঝেতে রেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসতে হবে। নাক দিয়ে শ্বাস নিতে হবে। এসময় পেলভিক ফ্লোর পেশি শিথিল থাকবে, কিন্তু বুকের খাঁচাও পেট প্রসারিত হবে।
নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় পেলভিক ফ্লোর পেশি সংকুচিত করে উপরের দিকে টেনে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে মুখ দিয়ে বাতাস বেড়িয়ে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার মত আওয়াজ হবে।
একটানা তিনবার করে বিশ্রাম নিয়ে মোট ১০ বার এই ব্যায়াম করতে হবে এক বসাতে।
পেট তুলে ধরা
এই ব্যায়ামে ট্রান্সভার্সাস অ্যাবডোমিনিস পেশির কর্মক্ষমতা বাড়ে। তলপেটের এই পেশি শরীরের কেন্দ্রে ভারসাম্য ধরে রাখে। বসা ও দাঁড়ানোর সময় এই পেশি সহায়তা করে শরীরকে। এছাড়া যে কোনো কাজে ও ব্যায়ামে ভারসাম্য ধরে রাখতে ট্রান্সভার্সাস অ্যাবডোমিনিস পেশির সুস্থতা জরুরি।
হাতের তালু মেঝেতে রেখে ও হাঁটু মেঝেতে ঠেকিয়ে উবু হয়ে থাকতে হবে। দুই হাতের মাঝে তাকিয়ে থাকতে হবে। এই ব্যায়ামে দুই হাত ও হাঁটু মেঝেতে রাখা অবস্থায় পিঠ সোজা থাকবে।
শ্বাস নিয়ে পেটে বাতাস ভরে নিতে হবে। এরপর পেট শিথিল করে মেঝের দিকে ঠেলতে হবে।
নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় পেট ভেতরে মেরুদণ্ডের দিকে ঠেলতে হবে। এতে করে ট্রান্সভার্সাস অ্যাবডোমিনিস পেশির কার্যকারিতা বাড়বে।
এই ব্যায়াম একেক পর্বে ১০ বার করতে হবে।