Published : 03 May 2026, 09:03 PM
সাংবাদিকদের জন্য ‘বাধাহীন পরিবেশ’ তৈরি এবং আর্থিক সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার দাবির বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইউনেস্কো এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক সংলাপে এ আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “মিডিয়া রিফর্মস কমিশনের কথা এল। আমি ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি, আমরা খুবই দ্রুত তাদের সাথে বসব, এই কথা আমি তুলেছি। আমি আজকেও তাদেরকে জানিয়েছি।
“আমি এটা বলছি না রাতারাতি সব বাস্তবায়ন করে ফেলা যাবে, এখানে একটা প্রশ্নও ছিল এটা নিয়ে। রাতারাতি না গেলেও খুব দ্রুত যেগুলো করা যায়, আমরা সবকিছু খুব দ্রুত করতে চাই।”
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান, সাংবাদিক কামাল আহমেদও উপস্থিতিত ছিলেন সংলাপে।
গত বছরের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্কার কমিশন। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করাসহ গণমাধ্যম সংস্কারে ২০ দফা সুপারিশ রাখা হয় সেখানে।
একাধিক গণমাধ্যমের মালিকানা একক ব্যক্তির হাতে থাকার পথ বন্ধ করা, সরকারি বিজ্ঞাপন বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, সার্কুলেশন ব্যবস্থার নিরীক্ষার পাশাপাশি ‘স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন’ করার সুপারিশ ছিল ওই প্রতিবেদনে।
আশু বাস্তবায়নযোগ্য কিছু সুপারিশের কথা কমিশন সেই সময় বললেও অন্তর্বর্তী সরকার সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও ওই সুপারিশ ঝুলে রয়েছে।
স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আইনি বাধার পাশাপাশি গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা কমে যাওয়া ঠেকাতে উদ্যোগ এবং রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্সের (আরএসএফ) প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবনমনের বিষয়টিও এদিন আলোচনায় আসে।
‘স্বৈরাচারী শাসনের’ কারণে ‘গণমাধ্যমের সংস্কৃতি’ পরিবর্তন হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমরা খেয়াল করব শেখ হাসিনার পতনের পর ধারণা করা হল যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে। প্রচুর মিডিয়া যেভাবে কথা বলতে শুরু করল, বিএনপির পক্ষে দাঁড়িয়ে, আমাদের কি মনে হয়, বিএনপি থেকে ইন্স্ট্রাকশন দেয়া হয়েছিল এভাবে কথা বলার জন্য? আমি এটা বিশ্বাস করি না।”
মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জাহেদ বলেন, “আপনারা প্রত্যেকে খুব শক্তভাবে সরকারের যে কোনো ধরনের সমালোচনা, যৌক্তিক সমালোচনা করবেন। আমি এটা আমাদের জায়গা থেকে বলছি। এটার একটা কারণ আছে, আমি একটা দায়িত্বে আছি, এই দায়িত্বে আমি আসলে কতদিন নিজে থাকতে ভালো লাগবে জানি না। কতদিন আমাকে এই দায়িত্বে রাখতে চাইবেন তিনি, যিনি আমাকে এই দায়িত্বে এনেছেন, আমি জানি না।
“তবে, আমি এ দেশের একজন নাগরিক, এমনকি শেখ হাসিনার বীভৎসতম সময়টাতেও দেশে ছিলাম, কথা বলেছি, ঝুঁকি নিয়েছি, এ দেশে থাকতে চাই। এই দেশে একটা দুর্দান্ত ভাইব্রেন্ট মিডিয়া আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই।”
সাংবাদিকতায় ‘জনআস্থা’ ফেরাতে গণমাধ্যমের তরফে সেলফ রেগুলেশন বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন সাংবাদিক কামাল আহমেদ।
তিনি বলেন, “ইন্ডাস্ট্রিতে সেলফ রেগুলেশনের ইনিশিয়েটিভটা সত্যি সত্যিই জরুরি এবং এটা যত দ্রুত আমরা করতে পারব তত দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারব। এটা করার জন্যে দুটো কাজ ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থেকেই করতে হবে।
“বিভিন্ন ধরনের গণমাধ্যমের নেতৃত্ব মিলে ‘কোড অব এথিক্স’ তৈরি এবং সেই ‘এথিক্স এনফোর্স’ করতে হবে। সেটার ‘এনফোর্স মেকানিজমটা’ একটা গণমাধ্যম রেগুলেটরি বডি বা ফ্যাসিলিটেটরি বডি যাই বলি, সেরকম একটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য একটা স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন হতে হবে।”
এটা করতে পারলে যারা অপরাধ আড়াল করার জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে, তার ‘ঝরে পড়বে’ বলে মনে করেন কামাল আহমেদ।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার সুপারিশ করে তিনি বলেন, “সরকার সেগুলোকে আইনগত বৈধতা দেবে এবং সহায়তা করবে, স্বীকৃতি দেবে। সরকারের যে বিজ্ঞাপন বা অন্যান্য সুবিধা শুধু তারাই পাবে, যারা স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের এখতিয়ার বা তার নির্দেশনা অনুসরণ করবে।”
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভালো একটা কিছু করে যাবেন, কিন্তু ন্যূনতম বাস্তবায়নের মত কোনো পদক্ষেপ তারা নেননি। তার মানে, আমরা নীতিবাক্য আউড়াই, বাস্তবে কোনো কাজ করি না।”
তিনিও দ্রুত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবি তোলেন সরকারে কাছে।
সংবাদকর্মীদের ‘অর্থনৈতিক সক্ষমতা’ নিশ্চিতে সম্প্রচারমাধ্যমের কর্মীদের জন্য ওয়েজবোর্ড গঠনের দাবি জানান ফাহিম আহমেদ। একইসঙ্গে, গ্রাহক থেকে যে অর্থ কেবল অপারেটররা পান, সেখান থেকে টেলিভিশনের জন্য আয়ের পথ বের করার দাবি জানান।
সংলাপে ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে সাংবাদিকদের হয়রানি না করে প্রেস কাউন্সিল বা ন্যায়পালের মত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ।
তিনি বলেন, “লোকেরা যদি যে কোনো তুচ্ছ কারণে মিডিয়ার উপরে ক্ষুব্ধ হয় এবং আদালতে গিয়ে ক্রিমিনাল কেস করে দেয় এবং তাতে যদি সাংবাদিকদের পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়, এটা তো কোনো একটা স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিবেশ হতে পারে না।”
অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান সুসান ভাইজ বলেন, “একটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও পেশাদার গণমাধ্যমই তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা নিশ্চিত করে। বর্তমান তথ্যপ্রবাহের জটিল বাস্তবতায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ বজায় রাখা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরো অংশ নেন ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটৎস, সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি এবং সুইডেন দূতাবাসের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও লিঙ্গসমতা বিষয়ক প্রথম সচিব পাওলা কাস্ত্রো নিডারস্টাম।