Published : 03 Jun 2026, 12:02 AM
বাংলাদেশে বছর কয়েক ধরে ‘সাংবাদিকদের ওপর দলীয় নিপীড়নের চক্র’ ভেঙে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় এগিয়ে আসতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানয়েছে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস- সিপিজে।
এ পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে দলটির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ শুরু করার কথা বলেছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান করেছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে তিনটি সরকার এসেছে। দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ প্রশাসন, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায় থাকা তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। প্রতিটি ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সময়ই সাংবাদিকরা আটক, অভিযুক্ত করা, নজরদারি, আক্রমণ এবং কুৎসার শিকার হয়েছেন। যার বেশির ভাগই ঘটেছে সদ্য পতন হওয়া সরকারের প্রতি তাদের কথিত আনুগত্য বা সমর্থনের কারণে।”
পুলিশ দেশজুড়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান এবং তালিকা করছে- সম্প্রতি ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর এমন একটি প্রতিবেদনকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবেও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়।
সিপিজে বলছে, ২০২৫ সালে তারা রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় সময় প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির অভিযোগের অন্তত ১০টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যার বেশিরভাগই বিএনপি এবং এর ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দ্বারা হয়েছিল।
সরকারকে এসব সহিংসতার নিন্দা জানাতে আহ্বান করে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বিবেচনা না করেই অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নির্দেশ দিতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বিবৃতিতে।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদারের অভিযোগ, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে প্রায়শই প্রতিটি নতুন সরকার তাদের আগের প্রশাসনের পক্ষে সমর্থন থাকা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নিয়েছে।
“তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ভিন্ন কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তাদের ক্ষমতার ১০০ দিন পার হলেও খুব কম অর্থপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।”
সরকার এরইমধ্যে বিভিন্ন মামলায় বন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়ে এবং ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলাগুলো প্রত্যাহার করে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে বলেও পরামর্শ তার।
একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ বন্ধ করা, ‘মব সন্ত্রাস’ থেকে সাংবাদিকদের রক্ষা করা, কুৎসা রটানো বন্ধ করা এবং যে আইনগুলোর কারণে এসব করা সম্ভব হচ্ছে, সেগুলো সংশোধনের তাগিদ দেন তিনি।
কুনাল বলেন, “সরকার এই পদক্ষেপগুলো নিলে, তা হবে একটি চক্র ভাঙা। তবে এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি সাংবাদিকের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে। আবার সাংবাদিকরা কাকে সমর্থন করছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তা এখানে বিবেচ্য হবে না। এই চক্রটি ভাঙার অর্থ হবে এটাই।”
বিবৃতিতে বাংলাদেশে ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ১০টি প্রধান পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে।
পদক্ষেপগুলো হল-
১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ব্যবহার বন্ধ করা।
২. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ব্যবহার বন্ধ করা।
৩. রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৪. মবের হাত থেকে সাংবাদিক ও বার্তাকক্ষকে রক্ষা করা।
৫. সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ বাতিল করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা খারিজ করা।
৬. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যাতে ব্যবহার না হয় সেজন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংস্কার ২০০৯-এর সংস্কার।
৭. মিডিয়া রেগুলেটরি অর্ডিন্যান্সের খসড়া প্রত্যাহার এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন।
৮. সাংবাদিকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে ব্যবহৃত পুরোনো আইন এবং নজরদারি কাঠামো বাতিল বা সংশোধন করা।
৯. অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা কবচ তৈরি।
১০. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো বন্ধ করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারকে স্পষ্ট এবং বারবার জনসমক্ষে বিবৃতি দিতে হবে যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রয়োজনীয়তা এবং যারা কুৎসা রটানোর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেবে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।