Published : 11 May 2025, 06:21 PM
কোনো উৎসবের আগের সকালে- বাড়ির উঠোন, ছাদ বা বারান্দাতে মা, চাচি, খালা, ফুপু বা বড় বোনদের চুলে তেল, মেহেদি বা অন্য ঘরোয়া উপাদান দেওয়ার স্মৃতি অনেকেই মনে করতে পারবেন।
চারপাশে নারিকেল তেলের ঘ্রাণ, হাসাহাসি, গল্পগুজব— সব মিলিয়ে উৎসবের আগাম আবেশ তৈরি হত। ঘরদোর ঝাঁটপাট, নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের যত্ন; বিশেষ করে চুলের।
যে কোনো উৎসবের আগে চুলের যত্ন এখনও প্রাধান্য পায়। যত্নের ধরনে পরিবর্তন এলেও শিকড় গেড়ে আছে প্রজন্মের অভিজ্ঞতায়।
গন্ধরাজ আর নারিকেল: শেকড়ের টান
একসময় দাদি-নানিরা চুলের যত্নে ব্যবহার করতেন ঘরে তৈরি উপাদান। গন্ধরাজ, নারিকেল, আমলকী, মেথি, জবাফুল এসব উপাদান মিশিয়ে বানানো হতো বিশুদ্ধ চুলের তেল।
নারিকেল তেল গরম করে তাতে গন্ধরাজ পাতা বা ফুল দিয়ে তৈরি হত ঘ্রাণযুক্ত তেল, যা মাথার তালু ঠাণ্ডা রাখত আর চুল পড়া রোধ করত। কুসুম গরম নারিকেল তেল মালিশের এই পদ্ধতি এখনও অনেক পরিবারে প্রচলিত।
সেই সময়ে তেলের সঙ্গে থাকত হরেক রকম ভেজষ উপকরণ। শিকাকাই, রিঠা এবং আমলকী ছিল প্রাকৃতিক শ্যাম্পুর বিকল্প। এসব দিয়ে ধুলে চুল হত ঝলমলে ও মসৃণ।
সামনের ঈদুল আজহায় চুল ঝলমলে দেখাতে আগে থেকেই যত্ন নেওয়া শুরু করেছেন নাফিসা নিধি।
এই প্রজন্মের মেয়ে নাফিসা বলেন, “দাদি গল্প করেন কীভাবে নিজের হাতে কাঁচা নারকেল কুরিয়ে, সেটা থেকে দুধ বের করে তেল বানাতেন। সেই তেলেই নাকি তার চুল মসৃণ, ঘন আর লম্বা হয়েছে। মা প্রায়ই বলেন দাদির ছিল হাঁটুর নিচে চুল।”
মায়ের ঘ্রাণে জড়ানো যত্ন
মায়েদের সময়েও রূপচর্চা মানেই ছিল ঘরোয়া উপাদান। ঈদ শীতের সময় হলে নারিকেল তেলে মেথি ভেজানো হত, কখনও আবার কালিজিরা।
গরমে চুল-মাথা ঠাণ্ডা রাখতে কাঁচা আমলকী সেদ্ধ করে তেল বানাতেন অনেকেই। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হত এই সব উপাদান দিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরির কাজ।
ঈদের আগের দিন সকালে চুলে তেল দিয়ে ঘণ্টাখানেক রোদে বসে থাকা ছিল রীতিমতো নিয়ম। তারপর কেউ বেসন-মুলতানি-মেহেদি দিয়ে তৈরি মিশ্রণ লাগাতেন, কেউ আবার শুধু টকদই দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতেন।
“ঈদের আগে চুল ধোয়ার পর যেমন গন্ধ আসত তেলের, মেহেদির— ওই ঘ্রাণটাই ছিল ঈদের প্রথম আনন্দ,” বলে হাসলেন ৫০ পেরোনো আকলিমা খাতুন।
মেয়ের চুলে ঈদের আগের দিন তিনি এখনও একই মমতায় তেল দিয়ে দেন।
আশি ও নববই দশকের যত্ন
এই সময়ে বড় বোনদের ঘরে তৈরি চুলের মাস্কের ব্যবহার করতে দেখেছেন অনেকেই।
জারা'স বিউটি লাউঞ্জের রূপবিশেষজ্ঞ ফারহানা রুমি বলেন, “সে সময়ে ডিম, টক দই, কলা আর মধু মিশিয়ে ব্যবহার করা হত। শুষ্ক চুলে এই প্যাক দারুণ কাজ করত। তখনও ‘পার্লার কালচার’ এতটা বিস্তার পায়নি। তাই ঈদের আগের দিন বা শুক্রবারে বাসায় বসেই চলত তেল-মালিশ, শ্যাম্পু আর হেয়ার মাস্কের আয়োজন।”
“বর্তমানে এই যত্নের ধারার সঙ্গে নিজেরাও নতুন উপাদান যুক্ত করেন। কেউ ব্যবহার করছে অ্যাভোকাডো, কেউবা অলিভ অয়েল। তবে ভালোবাসা আর মনোযোগের জায়গাটা একই রয়ে গেছে”- মন্তব্য করেন এই রূপবিশেষজ্ঞ।
প্রজন্ম বদলায়, বদলায় রীতি
আজকের সময়ে এসে চুলের যত্নের ধরন বদলে গেছে অনেকটাই। কর্মজীবী নারী, ব্যস্ত মা, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী— সবার কাছে সময়টাই সবচেয়ে বড় সংকট।
চুলের যত্ন বলতে এখন হয়ত সপ্তাহান্তে পার্লারে যাওয়া বা কোনো হেয়ার মাস্ক লাগানো বোঝায়।
তবে বদলটা শুধুই অভ্যাসে নয়, উপাদানেও। আগে যেখানে নারিকেল তেল ছিল অপরিহার্য, এখন সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে আর্গান অয়েল, কেরাটিন সেরাম, অ্যালোভেরা জেল।
তবে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়ত জানেই না, নারিকেল তেল গরম করে মাথায় লাগালে চুল নরম হয়, খুশকি কমে। কিংবা মেহেদির সঙ্গে ডিম মিশিয়ে চুলে দিলে চুল ঘন দেখায়- বলেন ফারহানা রুমি।
ঈদের যত্নের সেই পুরানো আবহ ফেরানো
অনেকেই এখন আবার ফিরে যাচ্ছেন সেই ঘরোয়া যত্নে। ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম রিলের কল্যাণে আবার জনপ্রিয় হচ্ছে ‘নিজেই করুন হেয়ার কেয়ার রুটিন’।
কেউ বাসায় মেথি ভিজিয়ে তেল বানাচ্ছেন, কেউ মেহেদি পাতার মিশ্রণ করছেন চুলের জন্য।
এ প্রসঙ্গে ফারহানা রুমি বলেন, “ঘরোয়া উপাদানগুলো সব সময়ই কার্যকর। তবে আধুনিক পণ্যের সুবিধাও রয়েছে। আর সবচেয়ে জরুরি হল— যত্ন নেওয়ার ইচ্ছা ও ধারাবাহিকতা।”

ঈদের আগে চুলের যত্নে পুরানো ও কার্যকর কিছু যত্নের কথা বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ।
তেল মালিশ: ঈদের একদিন আগে মাথায় গরম নারিকেল তেল মালিশ করা খুবই কার্যকর। সময় পেলে তাতে মেথি বা আমলকীর গুঁড়া মিশিয়ে নিতে পারেন।
হেয়ার প্যাক: ডিম, টক দই ও মেহেদির মিশ্রণ বা মুলতানি মাটি ও অ্যালোভেরা জেল দিয়ে হেয়ার প্যাক চুলকে ঝলমলে ও মসৃণ করবে। এছাড়া অ্যালোভেরা, নারিকেল তেল বা টক দই— এইগুলো কার্যকর।
পরিষ্কার করা: ঈদের কয়েকদিন আগে চুলে ভালোভাবে তেল দিয়ে রাখতে হবে। আর হালকা ভেষজ বা সালফেট-মুক্ত শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এতে মাথার তালু পরিষ্কার হবে।
পুষ্টি প্রদান: ঈদের দুয়েকদিন আগে চুলে ‘ডিপ কন্ডিশনিং মাস্ক’ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে চুল নরম ও কোমল হবে। ঘরেই সহজে এমন মাস্ক তৈরি করা যায়।
পর্যাপ্ত পানি পান: ঈদের ব্যস্ততায় ‘ডিহাইড্রেইশন’ বা পানী শূন্যতা হলে চুল ঝরে যেতে পারে। তাই পানি পান কোনোভাবেই কমানো যাবে না।
তাপের ব্যবহার কমানো: একটা সময় চুল বাঁধতে কোনো ‘হিট মেশিন’ বা তাপীয় যন্ত্রের ব্যবহার ছিল না। তখন হাতেই চুলের নানা স্টাইল করা হতো।
তবে সময়ের পরিবর্তনে হিট দেওয়া ও মেশিন ব্যবহার হয়। ঈদের সকালে হেয়ার স্টাইল করতে গিয়ে চুলে অতিরিক্ত তাপ দেওয়া যাবে না। এছাড়া অবশ্যই ‘হিট প্রটেক্ট্যান্ট’ ব্যবহার করতে হবে।
আরও পড়ুন