Published : 09 Sep 2026, 06:05 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন আশির দশকের সাজে, ছবি বানানোর নতুন ট্রেন্ড চলছে। সেই সাজে না সাজলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেই ভাবের ছবির জোয়ার চলছে ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে।
চুল একটু বেশি ফোলা, চোখে একটু বেশি কাজল, ঠোঁটে গাঢ় রং, কানে বড় দুল, গায়ে উজ্জ্বল পোশাক সবই ছিল আশির দশকের ফ্যাশন ।
ছেলেদের কারও চুল পেছনে আঁচড়ানো, কারও আবার সামনে উঁচু করে তোলা। আর চোখে বড় কালো চশমা, কোমরে চওড়া বেল্ট, পায়ে মোটা তলার জুতা পরা, পুরানো ছবির রং কিছুটা বিবর্ণ হলেই যেন সময়টা নিজে থেকেই বলে দেয়— এটি আশির দশক।
বড় চুলেই ছিল আশির দশকের বড় পরিচয়
আশির দশকের মেয়েদের সাজ দেখলেই সবার আগে মনে পড়ে বড়, ফোলা ও ঘন চুলের কথা। চুলকে বেশি ফুলিয়ে তোলা, সামনের অংশ উঁচু করা, কপালের ওপর ঢেউ খেলানো চুল রাখা বা একপাশে চুল সরিয়ে দেওয়া ছিল বেশ পরিচিত ধরন।
“অনেকেই চুল খোলা রাখতেন, আবার কেউ উঁচু করে পনিটেইল বা একপাশে উঁচুতে বাঁধা চুলে সাজতেন। চুলকে বেশি ঘন দেখাতে চুলের গোড়ায় ফুলিয়ে নেওয়া হত। বড় চুলের এই প্রবণতা আশির দশকের সৌন্দর্যচর্চার পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল। কোঁকড়া চুল ছিল তখনের বিশেষ ফ্যাশন”, মন্তব্য করেন জারা'স বিউটি লাউঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টারের প্রধান ফারহানা রুমি।
এই রূপচর্চাকর আরও বলেন, “এ ছাড়া তখন মাথায় কাপড়ের ফিতা, চওড়া চুলের রঙিন ফিতা, ব্যান্ড ব্যবহারের চলও ছিল।”
চোখে ছিল গাঢ় সাজ
আজকের মতো খুব সূক্ষ্ম চোখের সাজের বদলে আশির দশকের চোখ ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট। চোখের পাতায় নীল, সবুজ, বেগুনি, গোলাপি রংয়ের শ্যাডো ব্যবহার করা হত, যা এখনের সময়ে অনেকটাই সাহসী মনে হবে।
আবার কখনও একাধিক রং মিলিয়ে চোখকে আরও উজ্জ্বল করে তোলা হতো।
“অর্থাৎ চোখে একই সঙ্গে ফিরোজা, ম্যাজেন্টা, সবুজের মতো শ্যাডো ব্যবহার করা হত”, বলেন এই রূপ বিশেষজ্ঞ।
চোখের ওপরের আইলাইনার গাঢ় করে টানা এবং চোখের নিচেও কাজল দেওয়ার বেশ প্রবণতা ছিল।
এছাড়া আশির দশকের সাজে চোখ ও গালের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। সে সময়ের সাজ ছিল বেশ উজ্জ্বল ও দৃশ্যমান। অর্থাৎ চোখ, ভ্রু ও গালকে স্পষ্ট করে তোলা ছিল প্রধান কৌশল।
মাসকারাও ব্যবহার করা হত চোখের পাপড়িকে ঘন ও বড় দেখাতে। চোখের সাজ যত বেশি দৃশ্যমান হবে, ততই যেন আশির দশকের আবহ তৈরি হবে।
“তাই আজকের হালকা, প্রায় অদৃশ্য চোখের সাজের বদলে আশির দশকের অনুকরণ করতে চাইলে গাঢ় আইলাইনার, কাজল ও রঙিন চোখের শ্যাডোই বেশি মানানসই হবে” পরামর্শ দেন ফারহানা রুমি।
ভ্রু ছিল স্বাভাবিক ও ঘন
আশির দশকের সাজে আরেকটি আলাদাধর্মী বিষয় ছিল তুলনামূলক ঘন ভ্রু। অতিরিক্ত সরু করে ভ্রু তোলার বদলে ভ্রুর স্বাভাবিক ঘনত্ব ধরে রাখার প্রবণতাই দেখা যেত।
তাই আশির দশকের সাজ করতে চাইলে, খুব সরু করে আঁকা ভ্রুর বদলে কিছুটা স্বাভাবিক, পূর্ণ ভ্রু রাখাই সেই সময়ের আবহের কাছাকাছি হবে।
ঠোঁটে লাল থেকে বেগুনি
লিপস্টিকের রংয়েও ছিল সাহসী উপস্থিতি। লাল, গাঢ় গোলাপি, মেরুন, বেরি বা বেগুনি ধরনের রং ব্যবহার করা হত সেই সময়ে।
“চোখে যেমন উজ্জ্বল রং, ঠোঁটেও তেমন স্পষ্ট রং—এটাই ছিল সময়টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য”, মত দেন রুমি।
গালেও কম রং নয়
আজকের মতো গালের রং বা ব্লাশন খুব হালকা করে লাগানোর বদলে আশির দশকে গালে তুলনামূলক বেশি ব্লাশন ব্যবহার করা হত। গোলাপি, প্রবাল বা লালচে আভা- গালের ওপর অনেক বেশি স্পষ্ট করে দেওয়া হতো।
মুখের বেইজ মেইকআপ অবশ্য খুব ভারী না হলেও সাজ থাকত দৃশ্যমান। অর্থাৎ ত্বককে একেবারে কৃত্রিমভাবে নিখুঁত করার চেয়ে চোখ, ঠোঁট ও গালের রংকে গাঢ় করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বড় দুল, বড় গয়না
রুমি বলেন, “আশির দশকের সাজে ‘ছোটই সুন্দর’ ধারণার চেয়ে বড় ও নজরকাড়া গয়নাই বেশি দেখা যেত। বড় গোল দুল, ঝুলন্ত দুল, রঙিন কানের দুল, চওড়া বালা, একাধিক মালা কিংবা বড় পুঁতির হার সাজকে আলাদা করে তুলত।”
আশির দশকের ফ্যাশনে বড় গোল দুলের চল ছিল। বিশেষ করে রুপালি বা সোনালি রংয়ের পাশাপাশি, উজ্জ্বল রংয়ের বড় দুলও জনপ্রিয় ছিল।
শাড়িতে ছিল রং ও নকশার খেলা
আশির দশকের শাড়িতে নতুন ধরনের বুনন, রং ও কারুকাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছিল। ব্লাউজেও পরিবর্তন আসে; গোল বা গলার কাটের পাশাপাশি নতুন ধরনের নকশাও দেখা গিয়েছিল।
উজ্জ্বল নীল, ফিরোজা, মেরুন, লাল, সরিষা, সবুজ কিংবা সোনালি রংয়ের শাড়িই আশির দশকের আবহ তৈরি করত।
শাড়ির সঙ্গে বড় দুল, চুড়ি ও ফোলা চুল ছিল সেই সময়ের আধুনিক ‘লুক’।
সালোয়ার-কামিজেও বদল
“সালোয়ার-কামিজের ক্ষেত্রেও ছিল নানান পরীক্ষা। ঢিলেঢালা সালোয়ার, তুলনামূলক লম্বা কামিজ, রঙিন পোশাক এবং কখনও কামিজের সঙ্গে জ্যাকেট বা কটি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যেত”, বলেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিবিয়ানা’র কর্ণধার লিপি খন্দকার।
প্যান্টে জিনস, চওড়া কাট
আশির দশকের পোশাকে জিনস ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কখনও আঁটসাঁট, কখনও ঢিলেঢালা; আবার ধোয়া-দাগের নীল জিনসও ফ্যাশনেবল ছিল।
মেয়েদের পোশাকে জিনসের সঙ্গে ঢিলেঢালা জামা, ছোট জ্যাকেট কিংবা কোমরে বেল্ট দেখা যেত।
জ্যাকেটের কাঁধের ভেতরে শক্ত আস্তরণ বা প্যাড দেওয়া হতো যেন কাঁধ চওড়া দেখায়। আবার চওড়া বেল্টও আশির দশকের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
অর্থাৎ ফোলা হাতার পোশাক ছিল আশির দশকের সাজের পরিচিত অংশ। বিশেষ করে নারীদের পোশাকে কাঁধ ও হাতার অংশ কিছুটা ফুলিয়ে তোলার প্রবণতা দেখা যেত। উজ্জ্বল রংয়ের এমন পোশাকের সঙ্গে চওড়া বেল্টও থাকত।
এ ছাড়া ‘পার্টি লুকের’ জন্য রঙিন চুমকি দেওয়া পোশাকও সমানভাবেই ফ্যাশনের অংশ ছিল।
ছেলেদের সাজেও ছিল আলাদা আত্মবিশ্বাস
আশির দশকের ছেলেদের পোশাকে একদিকে ছিল পরিপাটি শার্ট-প্যান্ট, অন্যদিকে জিনসের ব্যবহার। চেক বা ডোরাকাটা শার্ট, ঢিলেঢালা প্যান্ট, রঙিন জ্যাকেট ও টি-শার্ট ছিল তরুণদের পরিচিত সাজ।
জিনসের জ্যাকেট ও জিনসের প্যান্ট একই সঙ্গে পরা সে সময়ের অন্যতম ফ্যাশন ছিল। আর ভেতরে উজ্জ্বল রংয়ের খোলা কলারের শার্টই ছিল আশির দশকের অন্যতম সেরা ফ্যাশন।
চোখে বড় চশমা
সানগ্লাস ছিল আশির দশকের সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বড় আকৃতির ধাতব ফ্রেমের চশমা, চোখ ঢেকে রাখা প্রশস্ত কালো চশমা ছিল ফ্যাশনাবল।
মেয়েরাও বড় ফ্রেমের চশমাই ফ্যাশনে রাখত। কালো, বাদামি কিংবা ফিরোজা, লাল ফ্রেমের চশমাও দেখা যেত। এই লুকের সাথে বড় কানের দুল ও ফোলা চুলের সমন্বয়ই রেট্রো ছবিতে সহজে আশির দশকের আবহ তৈরি করতে পারে।
হাতে ঘড়ি, সাজে শেষ ছোঁয়া
হাতঘড়িও ছিল আশির দশকের সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেয়েদের জন্য তুলনামূলক সরু ধাতব বা মেটাল বেল্টের ঘড়ি, রঙিন ঘড়ি কিংবা ছোট গোল ডায়ালের ঘড়ি বেশি দেখা যেত৷
ছেলেদের ক্ষেত্রে বড় ডায়াল, ধাতব বা চামড়ার বেল্টের ঘড়িই চলত। এ ছাড়া অনেক বেশি রঙিন ও সহজ, সাধারণ নকশার ঘড়িই ফ্যাশনে আলাদা জায়গা করে নেয়৷
আরও পড়ুন