Published : 09 Sep 2026, 05:11 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় আশির দশকের আদলে নিজের ছবি বানানোর এক নস্টালজিক জোয়ার তৈরি হয়েছে।
ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকের নিউজফিড স্ক্রল করলেই এখন চোখে পড়ছে বন্ধুদের চিরচেনা আধুনিক চেহারার বদলে আশির দশকের হাইস্কুল ইয়ারবুক বা ভিন্টেজ স্টাইলের রেট্রো ছবি।
প্রযুক্তির এই নতুন রূপান্তরকে মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ডিজিটাল নস্টালজিয়া ট্রাভেল’ বলা হচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক বাতিকে রূপ নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে শুধুই একটি সাধারণ বা মজাদার ফিল্টার গেম মনে হলেও, প্রযুক্তি ও আচরণ বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের অবচেতনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা ও প্রযুক্তির নিখুঁত কারসাজি।
আধুনিক বিশ্বের কৃত্রিম জাঁকজমক থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক মেদহীন, সরল ও রঙিন অতীতে ফিরে যাওয়ার এই প্রবণতা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এক নতুন জোয়ারের সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্ল্যারা ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল মিডিয়া গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদেরা এই ভাইরাল ট্রেন্ডের ৩টি বড় প্রভাব নিয়ে লোচনা করেছেন।
এই ট্রেন্ডের বৈশ্বিক সূত্রপাত: কে-পপ তারকাদের টাইমলাইন
প্রযুক্তি বিষয়ক পোর্টাল ‘টেকক্রাঞ্চ’ এবং ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ‘এআই ইয়ারবুক’ ট্রেন্ডের অফিশিয়াল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে।
দক্ষিণ কোরিয়ার স্নো কর্পোরেশন, তাদের জনপ্রিয় ফটো এডিটিং অ্যাপ ‘এপিআইকে’-এ এই ভিন্টেজ ফিল্টারটি প্রথম লঞ্চ করে।
অ্যাপটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হওয়ার মূল নেপথ্য কারিগর ছিল কোরিয়ান কে-পপ জগতের শীর্ষস্থানীয় তারকারা। ২০২৩ সালের অক্টাবরের প্রথম সপ্তাহে বয়ব্যান্ড ‘বিটিএস’-এর সদস্য ভি/কিম, ‘জি-আইডল’ ব্যান্ডের গায়িকা মিয়ন এবং কোরিয়ান পপ তারকা সোমি, তাদের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই ফিল্টার ব্যবহার করে আশির দশকের মার্কিন হাইস্কুল স্টাইলের ছবি পোস্ট করেন।
এআই অ্যাপটি তাদের ‘ফেইশল ফিচার’ বা গাঠনিক নকশা স্ক্যান করে সেটিকে আশির দশকের ক্যাটালগ ব্যাকগ্রাউন্ড, ‘ফ্লফি হেয়ারস্টাইল’, ডেনিম জিন্স জ্যাকেট এবং ভিন্টেজ লাইটিংয়ের সংমিশ্রণ দিয়েছিল।
এই চটজলদি এবং প্রামাণ্য রূপান্তর দেখে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও নিজেদের ছবি বানাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশে এই রেট্রো জোয়ার: যেভাবে শুরু হল
বিশ্ববাজারের ঠিক পর পরই বাংলাদেশের সাইবার জগতেও এই রেট্রো ফিল্টারের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। তবে বাংলাদেশে এই ট্রেন্ড মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট ধারায় জনপ্রিয় হয়।
প্রথমত, ২০২৩ সালের শেষভাগে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের অনুকরণে দেশের প্রথম সারির মডেল, বিনোদন তারকা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ‘এপিআইকে’ বা ‘লেন্সা এআই’ অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের ভিন্টেজ ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করেন।
র্যাম্প মডেল ও কোরিওগ্রাফার আজরা মাহমুদ, অভিনেত্রী টয়া, এবং বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সার যখন তাদের চিরচেনা আধুনিক লুকের বদলে আশির দশকের ক্যাটালগ স্টাইলের ছবি পোস্ট করেন, তখন অনুসারীদের মাঝে তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত এবং বড় জোয়ারটি আসে বর্তমানে; যখন চ্যাটজিপিটি এবং গুগল জেমিনি-র মতো জেনারেটিভ এআই ইমেজ টুলগুলো সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
দামি সাবস্ক্রিপশন অ্যাপের পরিধি ভেঙে ঢাকার তরুণ সমাজ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী ও কর্পোরেট পেশাজীবীরা যখন নিজেদের ছবি প্রম্পটের সাহায্যে রেট্রো লুকে রূপান্তর করে দলবদ্ধভাবে বা 'কো-রেগুলেশন' স্টাইলে ফেইসবুকে পোস্ট করা শুরু করেন, তখন এটি রাতারাতি একটি গণ-ধারায় রূপ নেয়।
অন্য কোনো দশক নয়, আশির দশককেই বেছে নেওয়া হল কেন?
মনস্তত্ত্ব বিষয়ক জার্নাল ‘কগনিটিভ রিসার্চ: প্রিন্সিপলস অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস’ এবং ‘জার্নাল অফ কম্পিউটার-মিডিয়েটেড কমিউনিকেশন’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, অন্য সব সময়ের চেয়ে ১৯৮০-এর দশকে মস্তিস্কের অগ্রাধিকার দেওয়ার ৩টি প্রধান কারণ হল-
পপ কালচার ও ‘অ্যাস্থেটিক ভিজ্যুয়ালের সোম্যাটিক’ আকর্ষণ
যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ)’-এর রিভিউতে প্রমাণিত হয়েছে যে, আশির দশক ছিল বিশ্বজুড়ে পপ মিউজিক, রেট্রো ফ্যাশন, নিয়ন লাইট এবং হলিউডের এক সোনালি ও ডাইনামিক সময়।
এই সময়ের পোশাকের স্টাইল (যেমন- ডেনিম জ্যাকেট, ওভারসাইজড ব্লেজার) এবং ‘ফ্লফি’ বা ফোলানো চুল বর্তমান আধুনিক যুগের জেন-জি এবং মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছে ফ্যাশনের আভিজাত্য বা ‘এস্থেটিক পিক’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মগজের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ প্রাকৃতিকভাবেই এই রঙিন ও ক্লাসিক ভিজ্যুয়াল দেখে তীব্র আনন্দ বা ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ করে।
সাফা কবির লিখেছেন, আশির দশকের এই উন্মাদনা এখন পুরো ইন্টারনেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর চরকি এতে দারুণ এক চমৎকার ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে! আশির দশকের এই লুকে ডা. ইরিনকে কেমন লাগছে?
ডিজিটাল ক্লান্তি এবং ‘অ্যানালগ’ জীবনের প্রতি অবচেতন টান
মনোস্তত্ত্ব বিষয়ক সাময়িকী ‘কম্পিউটার্স ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান যুগের মানুষ সারাক্ষণ তীব্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নোটিফিকেইশনের অ্যালার্ট এবং অনবরত ‘ডুম-স্ক্রোলিং’য়ের মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন।
১৯৮০ সালের সময়টি ছিল প্রযুক্তির এমন এক সূচনালগ্ন যখন মানুষ ইন্টারনেটের জালে বন্দি ছিল না, মানুষের মাঝে সরাসরি সামাজিক মেলবন্ধন এবং কমেনসালিটি কালচারের এক পরম শান্তি ছিল।
মানুষ যখন এআই দিয়ে নিজের সেই সময়ের ছবি দেখে, তখন মস্তিস্কে এক ধরনের নিরাপদ ও শান্ত ‘অ্যানালগ’ জীবনের রক্ষাকবচ অনুভব করে, যা মানসিক চাপ ও কর্টিসল হরমোন এক কমিয়ে দেয়।
আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ ও সামাজিক সংহতি
গবেষণা সাময়িকী ‘পাবলিক ওপিনিয়ন কোয়ার্টারলি’-তে প্রকাশিত সমাজবিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে নিজের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ‘নস্টালজিক’ রূপ উপস্থাপন করা মানুষের মনে নিজস্বতার এক গভীর অনুভূতি তৈরি করে।
বন্ধুরা যখন সেই রেট্রো ছবির নিচে এসে মন্তব্য করে এবং নিজেদের ছবিও শেয়ার করে, তখন শরীরে ‘কো-রেগুলেশন’ প্রক্রিয়া ঘটে।
এটি মানুষের একাকিত্ব ও অবসাদ দূর করে সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে তোলে।
নিজের ছবি তৈরি করার এআই প্রম্পট
দামি অ্যাপ ছাড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যো চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনি-এর মাধ্যমে নিজের আশির দশকের ছবি তৈরি করতে ব্যবহারকারী নিচের সুনির্দিষ্ট ইংরেজি প্রম্পটটি নমুনা বা ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
প্রম্পট নমুনা
"Create a 1980s retro-style based on my facial features. The person should have a classic 80s voluminous fluffy hairstyle, wearing a vintage 80's style dress. The lighting must be warm, slightly grainy, and analog film aesthetic, giving an authentic vintage photography look."
(ব্যবহারকারী এই টেক্সটটি দেওয়ার সঙ্গে নিজের একটি স্পষ্ট মুখের সম্মুখভাগের ছবি আপলোড করে দিলে এআই হুবহু আশির দশকের ছবি তৈরি করে দেবে।)
কড়া সাইবার নিরাপত্তা ও এআই ডেটা সতর্কতা
আন্তর্জাতিক সাইবার সিকিউরিটি জার্নাল ‘আইইইই সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রাইভেসি’-এর বিশেষজ্ঞরা এই ট্রেন্ড উপভোগ করার পাশাপাশি সতর্ক থাকার বিষয়ে সাবধান করেছেন।
এই থার্ড-পার্টি এআই অ্যাপগুলো ব্যবহার করার সময় ব্যবহারকারীকে নিজের গ্যালারির সমস্ত ছবি এবং মুখের বায়োমেট্রিক ডেটা ব্যবহারের অনুমতি দিতে হয়।
অনেক সময় ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার অ্যাপস এই ডেটাগুলো চুরি করে ‘ডিপফেইক’ বা পরিচয় জালিয়াতির ফাঁদ তৈরি করতে পারে।
তাই কোনো অ্যাপ ব্যবহারের আগে সেটি থার্ড-পার্টি অনুমোদিত কি-না এবং প্রাইভেসি পলিসি কী, তা সতর্কতার সঙ্গে দেখে নেওয়া বাধ্যতামূলক।