Published : 01 Dec 2025, 02:49 PM
সাধারণত মাথার ত্বক আর ওপরের অংশের চুলের চকচকে-ভাব নিয়েই বেশি যত্নআত্তি করা হয়। অথচ আয়নাতে তাকালে বেশিরভাগ সময় চোখে ধরা পড়ে একই সমস্যার ছবি; সেটা হল চুলের নিচের অংশ রুক্ষ, খসখসে আর অনুজ্জ্বল।
গোড়া থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত চুল বেশ মসৃণ থাকলেও শেষভাগে যেন প্রাণ নেই। এই রুক্ষভাব শুধু দেখতে খারাপ লাগে তা নয় বরং ভাঙা চুল, আগা ফাঁটা সমস্যা, জট বেঁধে যাওয়া- এসব সমস্যার মূলেও কাজ করে।
কিন্তু কেন চুলের নিচের অংশই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
রুক্ষতার মূল কারণ
“চুলের ফলিকল থেকে বের হওয়ার সময় প্রাকৃতিক তেল বা সিবাম চুলকে সুরক্ষা দেয়। এই তেল ধীরে ধীরে দৈর্ঘ্য বরাবর নিচের দিকে নামে। তবে চুল যত লম্বা হয়, তেল শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে তত বেশি সময় লাগে, অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছায় না। ফলে নিচের অংশ শুষ্ক হয়ে পড়ে”- ব্যাখ্যা করেন রূপসজ্জাকর শারমিন কচি।
তাছাড়া রোদ, ধুলা, দূষণ, ধোয়ার সময় ঘষাঘষি, তাপ ব্যবহার- সবকিছু মিলিয়ে শেষভাগটাই সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করে।
অনেকে প্রতিদিন শ্যাম্পু করেন। এতে মাথার ত্বক পরিষ্কার হলেও চুলের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধুয়ে যায়। গোড়ায় আবার তেল তৈরি হয়, কিন্তু নিচের অংশ সেই সুযোগ পায় না। ফলে সেখানে শুষ্কতা বাড়তে থাকে।
হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার, কার্লার এসব তাপের যন্ত্র সরাসরি চুলের কিউটিকল স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিচের অংশে ক্ষতি বেশি হয়, কারণ এটি তুলনামূলক পুরানো চুল। আর তা নতুন চুলের মতো শক্ত ও সুরক্ষিত নয়।
রং করা বা বারবার কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টও একটি বড় কারণ। ব্লিচ, রং, পার্ম, রিবন্ডিং— এসব প্রক্রিয়ায় কিউটিকল উঠে যায়, ভেতরের আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়। ফলাফল— ভাঙাচোরা, শক্ত ও রুক্ষ চুল, বিশেষ করে নিচের অংশে।
খাবারের অনিয়ম, পানিশূন্যতা, প্রোটিন ও ভিটামিনের অভাবও চুলের গুণমানে প্রভাব ফেলে। ভেতর থেকে পুষ্টি না পেলে শেষভাগ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
রুক্ষ চুলের লক্ষণ
কচি বলেন, “এই সমস্যা শুধু খোঁচানো-ভাবেই শেষ নয়। রুক্ষতার সাথে নিচের অংশে দেখা দেয় আগা ফাঁটা, জট লেগে থাকা, সহজে ভেঙে যাওয়া ও রং ফিকে হয়ে যাওয়ার সমস্যা।
আঁচড়াতে গেলে নিচে বারবার আটকে যায়। অনেকে জোরে টান দিতে হয়, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
চুল ধোয়ার সঠিক কৌশল
চুলের নিচের অংশ ভালো রাখার জন্য ধোয়ার অভ্যাস বদলানো জরুরি। শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে মূলত মাথার ত্বকে।
“সারা দৈর্ঘ্যে জোরে ঘষাঘষি করা ঠিক নয়। ফেনা যখন নিচে নামে, তখন হালকা হাতে পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট”- পরামর্শ দেন এই রূপসজ্জাকর।
প্রতিবার শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করা চুলের নিচের অংশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কন্ডিশনার মূলত এই অংশের শুষ্কতা কমাতে কাজ করে।
তবে কন্ডিশনার কখনই স্ক্যাল্প বা মাথার ত্বকে দেওয়া ঠিক নয়— শুধু মাঝামাঝি থেকে নিচ পর্যন্ত লাগাতে হবে- মত দেন শারমিন কচি।
তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে গিয়ে অধিকাংশ মানুষ জোরে ঘষে ফেলেন। এতে ক্ষতি হয়। বরং আলতোভাবে চাপ দিয়ে শুকানো ভালো।
নিয়মিত ময়েশ্চার ও পুষ্টি
রুক্ষ চুলের সবচেয়ে বড় ওষুধ ময়েশ্চার। সপ্তাহে অন্তত একবার তেল বা হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করলে চুলের ভেতরের আর্দ্রতা ফেরে।
নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল কিংবা ভেষজ তেল খুব উপকারী। তেল মালিশের পর কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেললে নিচের অংশ নরম থাকে।
ঘরে তৈরি হেয়ার মাস্ক
ডিম, দই, মধু বা অ্যালোভেরা দিয়ে বানানো প্যাক শুকনো চুলে দারুণ কাজ করে। এগুলো চুলে প্রোটিন আর আর্দ্রতা জোগায়।
শ্যাম্পুর পর ‘লিভ-ইন কন্ডিশনার’ বা সেরাম ব্যবহার করা যায়। এগুলো নিচের অংশে একটি সুরক্ষার পরত দেয়, ফলে বাতাস ও ধুলার ক্ষতি কমে।
তাপ ও কেমিক্যাল থেকে দূরে থাকা
চুলে তাপ ব্যবহার যতটা সম্ভব কম করা উচিত। প্রয়োজন হলে ‘হিট প্রোটেক্টেন্ট স্প্রে’ ব্যবহার করে তারপর ড্রাই বা স্টাইলিং করা ভালো।
রং বা পার্মের মতো কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট বারবার না করাই নিচের অংশ রক্ষার অন্যতম উপায়।
নিয়মিত ছাঁটা জরুরি
ছোট ছোট ‘ট্রিম’ বা আগা ছাঁটা, চুলের সৌন্দর্য ধরে রাখতে সাহায্য করে- পরামর্শ দেন শারমিন কচি।
তিন থেকে চার মাস অন্তর অল্প করে নিচের অংশ ছেঁটে ফেললে আগা ফাটা সমস্যা দূর হয় আর রুক্ষতার বিস্তার থামে।
অনেকে চুল লম্বা করার লোভে ‘ট্রিম’ এড়িয়ে যান। তবে তাতে চুল আসলে আরও বেশি ভাঙে।
খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব
চুল বাইরের যত্নের পাশাপাশি ভেতরের পুষ্টিও চায়। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ডিম, ডাল, মাছ চুলকে শক্ত করে।
শাকসবজি ও ফল থেকে আসা ভিটামিন এ, সি এবং ই চুলে উজ্জ্বলতা আনে। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শুষ্ক হবেই।
দিনে অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করা দরকার।
যত্নে নিয়মিততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
এই রূপসজ্জাকর বলেন, “একদিন তেল বা মাস্ক দিয়ে হঠাৎ ভালো লাগলেও নিয়মিত যত্ন না নিলে রুক্ষতা আবার ফিরে আসবে।”
তাই শ্যাম্পু-কন্ডিশনারের সঠিক ব্যবহার, সপ্তাহিক ‘ময়েশ্চার ট্রিটমেন্ট’, তাপীয় যন্ত্রের ব্যবহার কমানো, সময় মতো আগা ছাঁটা- এই চার অভ্যাস অভ্যন্তরীণ পুষ্টির সঙ্গে মিললে ধীরে ধীরে চুলের নিচের অংশে ফিরবে স্বাভাবিক কোমলতা।
আরও পড়ুন