Published : 09 Nov 2025, 02:34 PM
কোনো ক্যাফেতে, অফিসের সামনে বা রাস্তায়- হঠাৎ এমন কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যিনি খুব বেশি পরিচিত নন, কথা হয়েছে হয়ত হাতে গোনা দু’বার।
কিংবা ইনবক্সে ছোটখাট ‘হাই, হ্যালো! কেমন আছেন?’ প্রশ্নের টুকটাক ‘হ্যাঁ’ বা ‘এইতো’ ধরনের উত্তর আদান প্রদান।
তবে এসব কথাবার্তার শেষে অনিবার্যভাবে সেই মানুষটি হয়ত প্রস্তাব দিয়ে বসেন- ‘চলুন. একসঙ্গে বসে আড্ডা দেই একদিন!’ বা ‘একদিন ব্রাঞ্চে দেখা করা যাক!’
শুনে মুখে ভদ্রতার হাসি ফুটে উঠলেও মনে জাগে প্রশ্ন ‘এখনই কেন?’ বা ‘আমাদের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠতা কবে হল?’
এই দোটানার মুহূর্তে, অনেকেই অস্বস্তিতে পড়ে যান। কারণ সরাসরি ‘না’ বললে অভদ্র মনে হতে পারে, আবার রাজি হলে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয় যে, মনে হয় এর কোনো প্রয়োজনই নেই।
এমন অবস্থায় ‘না’ বলা মানেই অভদ্রতা নয় বরং এটি নিজের সময়, মানসিক শান্তি ও সীমারেখা রক্ষার একটি সচেতন উপায়।
না বলার মধ্যেও ভদ্রতা আছে
‘লাভ… ইটস হাউ আই ম্যানিফেস্ট’ বইয়ের লেখক ম্যান্ডি মরিস ও মার্কিন ‘লাইফ কোচ’ দ্য স্কিম ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “অনেক সময় এমন আমন্ত্রণে রাজি হয়ে যাই যেখানে নিজের তেমন কোনো আগ্রহই নেই। কারণ, অনেকেই মনে করেন ‘না’ বলাটা অভদ্রতা হবে।”
তবে এতে নিজেরই ক্ষতি হয়। কারণ যদি ক্লান্ত, ব্যস্ত বা আগ্রহহীন হন তবে জোর করে দেখা করার মানে শুধু সময় নষ্ট করাই নয় বরং নকল বা অসত্য সম্পর্ক তৈরি করা।
ম্যান্ডি বলেন, “সত্যিকার সম্পর্ক অপরাধবোধ থেকে নয়, আগ্রহ থেকে তৈরি হয়।”
তাই নিজের সময় বাঁচাতে এবং সম্পর্ককে স্বচ্ছ রাখতে ভদ্রভাবে ‘না’ বলা শেখা জরুরি।
সহজ উপায়ে ভদ্রভাবে ‘না’ বলার কয়েকটি উপায়
১. ‘তোমার সঙ্গে দেখা করে খুব ভালো লাগল! এখনই সময় মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে যোগাযোগ রাখতে চাই। সময় হলে আমিই জানাব।’- এভাবে বলার মানে হল- আপনি সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না, আবার নিজের সময়ও ধরে রাখছেন।
২. ‘এই মুহূর্তে পরিকল্পনা করা একটু কঠিন হচ্ছে। তবুও দেখা হয়ে ভালো লাগল, আশা করি তুমি ভালো আছো।’- এভাবে বলাটা খুব সরল ও ভদ্র ধরন। এতে কোনো অস্বস্তি তৈরি হয় না।
৩. ‘এই সময়ে আমি খুব ব্যস্ত, তাই নতুন কিছু যুক্ত করতে পারছি না। তবে দেখা হয়ে খুব ভালো লেগেছে।’- এতে নিজের সীমারেখা স্পষ্ট হয়, অথচ অভদ্রও শোনায় না।
৪. ‘শুনতে ভালো লাগছে, তবে সময় মেলাতে না পারলেও আজ তোমাকে দেখে ভালো লাগল।’- এটি কিন্তু খুবই সরল, সংক্ষিপ্ত আবার বন্ধুত্বপূর্ণ।
৫. ‘আমরা দুজনেই এখন ব্যস্ত মনে হচ্ছে, সময় হলে নিশ্চয়ই একদিন দেখা হবে।’- এভাবে বললে ভবিষ্যতের জন্য দরজা খোলা থাকে। আর বর্তমানের চাপ এড়ানো যায়।
ইমেইল— একটি নিরাপদ সীমানা
মরিসের মতে, “যদি এমন কারও সঙ্গে কথা বলেন যার সঙ্গে এখনও ব্যক্তিগত যোগাযোগ হয়নি, তবে ফোন নম্বর না দিয়ে ইমেইল দেওয়া উত্তম।”
তিনি বলেন, “এমন অবস্থায় সাধারণত বলা যায়, ‘আমি আপনাকে আমার ইমেইল দিই।’ এতে যার সত্যিই আগ্রহ আছে, সে ইমেইল করবে। আর এতে বোঝা যায়, তারা সত্যিই যোগাযোগ রাখতে চায় কিনা।”
এভাবে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরও রক্ষা করা যায়। আবার সরাসরি অস্বীকারও করতে হয় না।
অপরাধবোধ যে কারণে আসে
‘না’ বলার পর অনেকেরই মনে হয় ‘আমি কি খুব রূঢ় হলাম?’ বা ‘সে কি কষ্ট পেল?’
মরিস বলেন, “সমাজ মূলত অপরাধবোধের ওপর চলে। মানুষ এমনভাবে বড় হয়েছে যে, অন্যের প্রত্যাশা ভাঙলে নিজেকে খারাপ মনে হয়।”
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন- এই অপরাধবোধ থেকেই সম্পর্কগুলো অপ্রকৃত হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, “নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত— ‘আমি কি অপরাধবোধ থেকে কাজ করছি?’, ‘এটি কি আমাকে এবং অন্যজনকে সত্যিই সাহায্য করছে?’, ‘এটাই কি আমি চাই?’ যদি উত্তর হয় ‘না’, তবে সেটি পরিষ্কার ইঙ্গিত আপনাকে ভদ্রভাবে না বলতে হবে।”
সীমারেখা মানে আত্মসম্মান
অনেকে প্রায়ই মনে করেন, অন্যকে খুশি রাখাই ভদ্রতা। তবে বাস্তবে এটি অনেক সময় নিজের সীমা হারানোর কারণ হয়।
মরিস বলেন, “নিজেকে সময় দেওয়া, নিজের সীমা নির্ধারণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা মানে নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”
এটি রূঢ়তা নয় বরং আত্মসম্মান। আর আত্মসম্মান থেকে গড়ে ওঠে প্রকৃত সম্পর্ক, যেগুলো বাধ্যবাধকতা নয়, আনন্দের জায়গা থেকে আসে।
আরও পড়ুন