Published : 12 Jul 2026, 12:25 PM
বাংলার ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন আর সংঘাতের ইতিহাস নয়, এটি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানেরও ইতিহাস। মোগল আমলে ঢাকা ও বিক্রমপুর ছিল বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। বিশেষ করে মোগল সুবেদারদের শাসনামলে ঢাকা যে আভিজাত্য অর্জন করেছিল, তা ছিল অনন্য।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার উত্থান ঘটে নতুন নগরী হিসেবে। ব্রিটিশরা কলকাতাকে তাদের রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়ায় বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইংরেজি শিক্ষা, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আর রেনেসাঁর আলোয় কলকাতা দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে।
একদিকে কলকাতার নাগরিক আভিজাত্য, অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের চিরন্তন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। এই দুই বিপরীত স্রোত যে বিন্দুতে এসে মিলেছিল এবং যেখানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক নীরব যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা হলো ফুটবলের সবুজ ময়দান।
জে. এ. ম্যাঙ্গান দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশরা ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো খেলাগুলোকে তাদের ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’-এর অংশ হিসেবে ভারতে এনেছিল। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর অভিজাত ভারতীয়দের বশ করতে এবং পশ্চিমা মূল্যবোধ শেখাতে এই খেলাগুলোর প্রসার ঘটানো হয়। পূর্ববঙ্গের ঢাকা ও বিক্রমপুর অঞ্চলে যখন একের পর এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন সেখানেও দ্রুত ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ল।
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার তরুণরা খুব কম সময়ের মধ্যেই এই বিদেশি খেলাটিতে দক্ষ হয়ে ওঠে। তবে সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। পূর্ববঙ্গের খেলোয়াড়রা যতই ভালো খেলুক না কেন, তাদের চূড়ান্ত স্বীকৃতির জন্য সেই কলকাতাতেই যেতে হতো। কিন্তু কলকাতার ময়দান তখন কেবল ব্রিটিশ আর পশ্চিমবঙ্গের বাবুদের নিয়ন্ত্রণে।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯১১ সালে মোহনবাগান যখন প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আইএফএ শিল্ড জিতে ইতিহাস গড়েছিল, সেই দলের এগারোজন খেলোয়াড়ের মধ্যে আটজনই ছিলেন পূর্ববঙ্গের সন্তান। ফুটবলের অমর নায়ক গোষ্ঠ পাল ছিলেন খুলনার মানুষ। শিল্ড জয়ের সেই ঐতিহাসিক দিনে ঢাকা ও বিক্রমপুর থেকে অগণিত মানুষ ট্রেনের ছাদ আঁকড়ে কলকাতায় এসেছিলেন কেবল স্বজাতীয়দের জয় দেখতে।
অথচ ট্র্যাজেডি হলো এই, এত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কলকাতার ক্লাবগুলোতে পূর্ববঙ্গের খেলোয়াড়রা অনেকটাই উপেক্ষিত থাকতেন। অনেক সময় তাদের দল থেকে বাদ দেওয়া হতো। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধেই শুরু হয় পূর্ববঙ্গের ক্লাব সংস্কৃতির নিজস্ব অভিযাত্রা।
পূর্ববঙ্গের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ও প্রধান মাইলফলক হলো ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ারী ক্লাব’। ঢাকার প্রভাবশালী জমিদার রায়বাহাদুর সুরেন্দ্রনাথ রায়ের হাত ধরে এই ক্লাবের জন্ম। ঢাকার পল্টন ময়দানে এই ক্লাবের নিজস্ব প্যাভিলিয়ন ও খেলার মাঠ ছিল।
ওয়ারী কেবল স্থানীয় ক্লাবই ছিল না; তারা ব্রিটিশ ও কলকাতার নামি দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিত। ১৯১০ সালে তারা কোচবিহারের মহারাজা একাদশকে পরাজিত করে, যে দলে কলকাতার বাঘা বাঘা খেলোয়াড়রা ছিলেন। ১৯১২ সাল থেকে ওয়ারী ক্লাব নিয়মিত কলকাতার আইএফএ শিল্ডে অংশ নিতে শুরু করে। ১৯১৭ সালে তারা কলকাতার লিগ চ্যাম্পিয়ন ‘লিনকনস’ দলকে হারিয়ে হইচই ফেলে দেয়।
ওয়ারী ক্লাবের বীরত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ দল ‘শেরউড ফরেস্টার্স’-এর বিরুদ্ধে ম্যাচটি। সেই শক্তিশালী ব্রিটিশ দলটি পুরো ভারত সফরে কেবল একটি গোল হজম করেছিল এবং সেই গোলটি দিয়েছিল ঢাকার ওয়ারী ক্লাব। যদিও ম্যাচটি ওয়ারী ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল, কিন্তু তাদের সেই লড়াই আজও ঢাকার ফুটবলের গর্ব হয়ে আছে। কেবল খেলা নয়, পূর্ববঙ্গে ফুটবল লিগ ও ‘নির্মল মেমোরিয়াল ফুটবল শিল্ড’-এর মতো টুর্নামেন্ট আয়োজনেও ওয়ারী ক্লাবের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

১৯০৫ সালে রংপুরের তাজহাটের রাজা গোপাল রায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘তাজহাট ফুটবল ক্লাব’। এই ক্লাবটি বিভিন্ন অঞ্চলের মেধাবী ফুটবলারদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে। ১৯১৫ ও ১৯১৮-১৯ সালে তারা কোচবিহার কাপ জয় করে কলকাতার ময়দানে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করে। বিখ্যাত ফুটবলার ভোলা সেন এবং প্রফুল্ল চ্যাটার্জি এই তাজহাট ক্লাবেরই আবিষ্কার।
তবে ১৯২০-এর দশকে কলকাতার ময়দান রাজনীতির খেলায় তাজহাট ক্লাব কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৯২১ সালে নেপাল রায় একটি বড় সিদ্ধান্ত নেন; তিনি তার শক্তিশালী তাজহাট ক্লাবের নাম প্রত্যাহার করে নেন যাতে নবগঠিত ‘ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব’ দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সুযোগ পায়। তাজহাটের অধিকাংশ তারকা খেলোয়াড় তখন ইস্ট বেঙ্গলে যোগ দিয়ে ক্লাবটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
অন্যদিকে, ১৯০৩ সালে ঢাকার পাঁচটি প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব’। রানি ভিক্টোরিয়ার নামে এই ক্লাবের নামকরণ করা হয়েছিল। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সুরেশ চন্দ্র ধাম ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ১৯১৭ সালের দিকে কিংবদন্তি ফুটবলার সৈয়দ আবদুস সামাদ এই ক্লাবের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। ঢাকার পল্টন ময়দানে ওয়ারী ও ভিক্টোরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অনেকটা কলকাতার মোহনবাগান-ইস্ট বেঙ্গল লড়াইয়ের মতো।
কলকাতার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৩০-এর দশকে তাদের অভাবনীয় সাফল্য মুসলিম সমাজের মধ্যে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। ব্রিটিশ ও হিন্দু প্রধান ক্লাবগুলোর বিপরীতে মোহামেডানের জয় ছিল তৎকালীন মুসলিম তরুণদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। এই ঢেউ পূর্ববঙ্গেও এসে লাগে। ১৯৩৬ সালে ঢাকার নবাব পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে কুমিল্লাতেও মোহামেডান ক্লাব গড়ে উঠেছিল। নবাবদের সক্রিয় সহযোগিতায় ঢাকা মোহামেডান দ্রুতই পূর্ববঙ্গের ফুটবলে একটি সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়।
পূর্ববঙ্গের ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৩৭ সালটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেই বছর যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অপেশাদার ফুটবল দল ‘আইলিংটন করিন্থিয়ান্স’ ভারত সফরে আসে। তারা ভারতের বড় বড় দলকে হারিয়ে দিলেও ঢাকার মাঠে ‘ঢাকা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন একাদশ’-এর কাছে পরাজিত হয়। সেই দলের এগারোজন খেলোয়াড়ের মধ্যে আটজনই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং দশজন ছিলেন ওয়ারী ক্লাবের সদস্য।
এই পরাজয়ে করিন্থিয়ান্স অধিনায়ক পি.বি. ক্লার্ক এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে তিনি বলেছিলেন, “আমরা এতদিন বইয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের কথা পড়েছি, আজ খেলার মাঠে সেই বাঘদের চাক্ষুষ দেখলাম।” এই উক্তিটি ছিল পূর্ববঙ্গের ফুটবলারদের বিশ্বমানের দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
ফুটবল কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও ঢাকা ছিল পথপ্রদর্শক। আজকের ভারতের জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ বা ‘সন্তোষ ট্রফি’ চালুর প্রস্তাব প্রথম এসেছিল ‘ঢাকা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (প্রতিষ্ঠিত ১৯১৭)-এর কাছ থেকে। ১৯৪০ সালে দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের চতুর্থ বার্ষিক সভায় ঢাকা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন একটি আন্তঃরাজ্য ফুটবল প্রতিযোগিতার প্রস্তাব পেশ করে। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৪১ সালে বোম্বেতে প্রথম সন্তোষ ট্রফি শুরু হয়।
সন্তোষের মহারাজা মন্মথনাথ রায়চৌধুরী, যিনি ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবেরও একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তার নামেই এই ট্রফির নামকরণ করা হয়। যদিও ১৯৪১ সালে পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ঢাকার খেলোয়াড়রা অংশ নিতে পারেননি, কিন্তু ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালে তারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এই অঞ্চলের খেলোয়াড়দের আর সন্তোষ ট্রফিতে খেলার সুযোগ থাকেনি।
১৯১৫ সাল থেকে ঢাকায় প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ শুরু হয়। কেবল ঢাকা নয়, ফুটবল ছড়িয়ে পড়েছিল মফস্বল শহরগুলোতেও। রাজশাহীতে স্কুল পর্যায়ে ফুটবলের প্রসারে ‘কুমুদিনী কাপ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশালের মতো জেলাগুলোতেও ফুটবল লিগ শুরু হয়।
কলকাতার বিখ্যাত ক্লাব ‘হারে স্পোর্টিং’ ও ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন’ নিয়মিত পূর্ববঙ্গে খেলতে আসত। এই মাটি থেকেই উঠে এসেছিলেন সৈয়দ আবদুস সামাদ ও মোজাম্মেল হক (রাজশাহী), পি. দাশগুপ্ত ও সিরাজউদ্দিন (চট্টগ্রাম), গোষ্ঠ পাল (খুলনা) এবং এন. মজুমদার (বরিশাল)-এর মতো কিংবদন্তিরা।
ঔপনিবেশিক আমলের পূর্ববঙ্গের ফুটবল সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল লড়াকু জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। দেশভাগের পর এই ফুটবল ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ ওপারে চলে গেলেও, এর শিকড় রয়ে গিয়েছিল এপারের মাটিতেই। সেই দিনের ওয়ারী, ভিক্টোরিয়া কিংবা ঢাকা মোহামেডান যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, তারই ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশের ফুটবল।
তথ্যসূত্র:
১. আহমেদ, শরীফউদ্দিন; ঢাকা: ইতিহাস ও নগর জীবন, ঢাকা: অ্যাকাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড, ২০০১।
২. বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশিক; খেলা যখন ইতিহাস, সেতু প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০৭।
৩. শামসুদ্দিন, আবুল কালাম; অতীত দিনের স্মৃতি, ঢাকা।