১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

গ্যাসলাইটিং: অদৃশ্য মানসিক নির্যাতন চেনার উপায়

মানসিক অত্যাচার থেকে স্বাস্থ্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 03:26 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

কখনও কি এমন হয়েছে, কোনো ঘটনা স্পষ্টভাবে মনে রেখেছেন, তবে অন্য একজন বারবার বলতে থাকলেন, ‘এমন কিছু তো ঘটেইনি’, ‘তুমি ভুল মনে করছ’, কিংবা ‘তুমি খুব বেশি উল্টা পাল্টা ভাবছো!’

আর এ ভাবেই ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতিকেও সন্দেহ করতে শুরু করলেন। নিজের অনুভূতি, বিচারবোধ ও সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা কমে গেল।

এই ধরনের ধারাবাহিক মানসিক প্রভাব বিস্তারকে বলা হয় ‘গ্যাসলাইটিং’।

এটি কেবল প্রেমের সম্পর্কেই নয়- পরিবার, কর্মক্ষেত্র, বন্ধুত্ব কিংবা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।

দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতিতে থাকলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে এবং ব্যক্তি নিজের বাস্তবতা নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন।

গ্যাসলাইটিং বলতে যা বোঝায়

মার্কিন মনোচিকিৎসক ও দাম্পত্য ও পারিবারিক চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভিভিয়ানা কোলস রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “গ্যাসলাইটিং হল এমন এক ধরনের মানসিক প্রভাব বিস্তার, যেখানে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যজনকে তার নিজের অনুভূতি, স্মৃতি, বিচারবোধ কিংবা বাস্তবতা নিয়ে সন্দিহান করে তোলেন। এটি মানসিক নির্যাতনেরও একটি রূপ।”

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিশ্লেষক রবিন স্টার্ন বলেন, “অনেক সময় নিজের দায় এড়াতে, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বা অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এই ধরনের আচরণ ব্যবহার করে। এতে ধীরে ধীরে ভুক্তভোগী নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।”

শুধু দাম্পত্যে নয়, যেকোনো সম্পর্কেই হতে পারে

অনেকেই মনে করেন, গ্যাসলাইটিং কেবল প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্কে ঘটে। তবে পরিবারের সদস্য, কর্মক্ষেত্র, সহকর্মী, বন্ধু কিংবা অনলাইনেও এই আচরনের শিকার হওয়া সম্ভব।

যখন সম্পর্কের এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর মানসিক, সামাজিক বা পেশাগতভাবে নির্ভরশীল থাকে, তখন গ্যাসলাইটিংয়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

কারণ সেই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে একজন, অন্যজনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

গ্যাসলাইটিং যেভাবে শুরু হয়

প্রথমদিকে বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম হতে পারে। কেউ হয়ত আপনার কথা অস্বীকার করলেন বা অনুভূতিকে গুরুত্ব দিলেন না। পরে সেটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়।

এমন অবস্থায় হয় তো আপনি বললেন, ‘তোমার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি তো এমন কিছু বলিনি’, ‘সবই তোমার কল্পনা’, অথবা ‘তোমারই সমস্যা, তুমি সবকিছু ভুল বোঝো।’

এভাবে একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে একসময় নিজের স্মৃতি ও অনুভূতিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেন। এটাই গ্যাসলাইটিংয়ের বিপজ্জনক দিক।

যেসব লক্ষণে হতে হবে সতর্ক

গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। ছোট ছোট বিষয়েও অন্যের অনুমোদন খোঁজেন। নিজের ভুল না থাকলেও বারবার ক্ষমা চান।

পরিবার বা বন্ধুদের কাছে সম্পর্কের বাস্তব চিত্র গোপন রাখেন। অনেক সময় মনে হয়, ‘সমস্যাটা হয়তো আমারই।’

ভিভিয়ানা কোলস বলেন, “এর ফলে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। সহজ সিদ্ধান্ত নিতেও কষ্ট হয়। নিজের অনুভূতির চেয়ে অন্যের ব্যাখ্যাকেই সত্য মনে হতে থাকে।”

গ্যাসলাইটিংয়ের সাধারণ ধাপ

রবিন স্টার্নের মতে, “শুরুতে মানুষ বিশ্বাসই করতে পারেন না যে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে। পরে তিনি নিজের অবস্থান প্রমাণ করার জন্য বারবার ব্যাখ্যা দিতে থাকেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আত্মরক্ষার চেষ্টাও কমে যায়।”

একসময় ভুক্তভোগী নিজেই ভাবতে শুরু করেন, হয়ত অন্য মানুষটিই ঠিক। তখন তিনি আরও একা হয়ে পড়েন এবং সম্পর্কের ভেতর নিজের অবস্থান নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

নিজেকে রক্ষা করবেন যেভাবে

ভিভিয়ানা কোলস বলেন, “প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি বারবার মনে হয় কেউ আপনার অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করছে, তাহলে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। কারণ বাইরের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।”

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা কথোপকথন মনে রাখতে ব্যক্তিগতভাবে নোট রাখাও উপকারী হতে পারে। এতে নিজের স্মৃতি নিয়ে অকারণ সন্দেহ কমে।

যদি এই আচরণ নিয়মিত চলতে থাকে এবং সম্পর্কের ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তাহলে মনোচিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

প্রয়োজনে সম্পর্ক নিয়ে যৌথ পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।

সব মতভেদ গ্যাসলাইটিং নয়

দুইজন মানুষের স্মৃতি বা মতামত ভিন্ন হতে পারে। সব ধরনের তর্ক বা মতবিরোধকে গ্যাসলাইটিং বলা ঠিক নয়।

রবিন ব্যাখ্যা করেন, “মূল পার্থক্য হল, গ্যাসলাইটিংয়ে একজন ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে অন্যজনকে নিজের বাস্তবতা নিয়ে সন্দিহান করে তোলেন এবং সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চান।”

আরও পড়ুন

অনিশ্চিত সম্পর্কে আছেন কি-না, বুঝবেন যেভাবে

সম বয়সের প্রেম: কেন তৈরি হয় এই আকর্ষণ?

সম্পর্কে যেভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে ‘প্যারালাল লাইফ সিন্ড্রোম’