হাঁটলে কত ক্যালোরি ঝরে?
জেনে নিন হিসাব ও ওজন কমানোর সহজ উপায়।
ওজন কমানো এবং সুস্থ থাকার জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যায়াম হল হাঁটা। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার পর ঠিক কতটুকু ক্যালোরি পুড়ল, তা নিয়ে মনে নানান প্রশ্ন থাকেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সুস্থতা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁটার সময় ঠিক কত ক্যালোরি ঝরবে সেটা মূলত নির্ভর করে ব্যক্তির ওজন, হাঁটার গতি এবং কোন ধরণের রাস্তায় (সমতল নাকি পাহাড়ি) হাঁটা হচ্ছে সেটার ওপর।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেল্থ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, হাঁটার মাধ্যমে ক্যালোরি পোড়ানোর হিসাব বের করা এবং এর নানান শারীরিক উপকারিতা সম্পর্কে তুলে ধরেন পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মার্কিন লেখক লরা শোবার।
আর প্রতিবেদনটি চিকিৎসাগতভাবে পর্যালোচনা করেছেন মার্কিন পুষ্টিবিদ ও ‘ক্রনিক কিডনি’ রোগ বিশেষজ্ঞ কারিনা টোলেন্টিনো।
হাঁটার গতি ও ওজনের ওপর ক্যালোরি পোড়ানোর হিসাব
অ্যাথলেটিক নির্দেশিকা ‘কমপেন্ডিয়াম অব ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি’-এর তথ্য অনুযায়ী, একজন ৭৭ কেজি (১৭০ পাউন্ড) ওজনের ব্যক্তি যদি সমতল পৃষ্ঠে হাঁটেন, তবে দূরত্ব ও গতি অনুযায়ী তার ক্যালোরি পোড়ানোর হিসাবটি হবে ঠিক এমন:
ঘণ্টায় ৩.২ কিমি গতিতে হাঁটলে: প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪৪ ক্যালোরি পুড়বে (গতি ২.০ মাইল প্রতি ঘণ্টা)।
ঘণ্টায় ৪.৫ কিমি গতিতে হাঁটলে: প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪৬ ক্যালোরি পুড়বে (গতি ২.৮ মাইল প্রতি ঘণ্টা)।
ঘণ্টায় ৫.৬ কিমি গতিতে হাঁটলে: প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৫২ ক্যালোরি পুড়বে (গতি ৩.৫ মাইল প্রতি ঘণ্টা)।
ঘণ্টায় ৬.৪ কিমি গতিতে হাঁটলে: প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৫৭ ক্যালোরি পুড়বে (গতি ৪.০ মাইল প্রতি ঘণ্টা)।
এই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হল, শুরুতেই খুব দ্রুত না হেঁটে ধীরে ধীরে প্রতিদিনের লক্ষ্য এবং হাঁটার গতি বাড়ানো উচিত।
ক্যালোরি হিসাব করার সূত্র
ব্যায়ামের তীব্রতা বা চেষ্টার স্তর পরিমাপের জন্য স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা ‘মেটাবলিক ইকুইভ্যালেন্ট অব টাস্ক’, সংক্ষেপে ‘এমইটি’ বা ‘মেট’ ব্যবহার করেন।
যেমন, ঘণ্টায় ৫.৬ কিলোমিটার গতিতে দ্রুত হাঁটাকে ৪.৩ ‘মেট’ হিসেবে ধরা হয়।
প্রতি ঘণ্টায় কত ক্যালোরি পুড়ল তা বের করার একটি আন্তর্জাতিক সূত্র রয়েছে।
সূত্রটি হল: ‘মেট’ × ৩.৫ × কেজিতে শরীরের ওজন ÷ ২০০ = প্রতি মিনিটে পোড়ানো ক্যালোরি (একে ৬০ দিয়ে গুণ করলে ঘণ্টার হিসাব পাওয়া যাবে)।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কমপেনডিয়াম অব ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজ’-এর বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সমতল রাস্তায় বিভিন্ন গতিতে হাঁটার আন্তর্জাতিক ‘মেট’ হিসাবটি নিচে দেওয়া হল।
খুব ধীর গতি (ঘণ্টায় ৩.২ কিমি বা ২.০ মাইল): মেট মান ২.০ থেকে ২.৩। এই গতিতে হাঁটলে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২২ ক্যালরি পুড়বে।
স্বাভাবিক গতি (ঘণ্টায় ৪.০ কিমি বা ২.৫ মাইল): মেট মান ৩.০। এই গতিতে হাঁটলে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২৩ ক্যালরি পুড়বে।
মাঝারি দ্রুত গতি (ঘণ্টায় ৪.৮ কিমি বা ৩.০ মাইল): মেট মান ৩.৩ থেকে ৩.৫।
বেশ দ্রুত গতি বা ব্রিস্ক ওয়াকিং (ঘণ্টায় ৫.৬ কিমি বা ৩.৫ মাইল): মেট মান ৪.৩ থেকে ৪.৮। এই গতিতে হাঁটলে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২৬ ক্যালরি পুড়বে।
অত্যন্ত দ্রুত গতি (ঘণ্টায় ৬.৪ কিমি বা ৮.০ মাইল): মেট মান ৫.০ থেকে ৫.৫। এই গতিতে হাঁটলে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২৯ ক্যালরি পুড়বে।
কারিনা টলেন্টিনো বলেন, “ওজনের তারতম্যের কারণে এই ফলে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। ওজন বেশি হলে শরীর নড়াতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়, তাই বেশি ওজনের মানুষের সমপরিমাণ হাঁটলে ক্যালরিও বেশি পোড়ে।”
হাঁটার গতি ও ক্যালরি পোড়ানের সহজ কৌশল
কম সময়ে বেশি ক্যালরি পোড়াতে চাইলে ৪টি সহজ নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে।
উঁচু রাস্তায় হাঁটা: সমতল রাস্তার বদলে পাহাড়ি রাস্তা বা ট্রেডমিলের ইনক্লাইন বা ঢাল বাড়িয়ে হাঁটলে অভিকর্ষজ বলের বিপরীতে পেশিকে বেশি কাজ করতে হয়। গতি একই রেখেও শুধু ৬ শতাংশ বা তার বেশি উঁচু রাস্তায় হাঁটলে ‘মেট’ মান সরাসরি বেড়ে প্রায় ৮.০ পর্যন্ত হতে পারে, যা দ্রুত চর্বি গলায়।
গতির পরিবর্তন: একটানা একই গতিতে না হেঁটে মাঝেমধ্যে কিছু সময়ের জন্য জগিংয়ের চেষ্টা করতে হবে।
গান শোনা: হাঁটার সময় পছন্দের চাঙা কোনও সংগীত শুনলে অবচেতনভাবেই হাঁটার গতি ও তীব্রতা বেড়ে যায়।
দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার সুযোগ তৈরি: লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, কর্মক্ষেত্রে দুপুরের খাবারের পর সামান্য হেঁটে নেওয়া বা গাড়ি একটু দূরে পার্ক করে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়া ক্যালরি পোড়ার হার বাড়ায়।
কানাডার অন্টারিওতে কর্মরত ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ অ্যামি কোয়ান মন্তব্য করেন, “যারা ডেস্কে বসে দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন, তারা যদি কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করেন, তবে পিঠ এবং পায়ের পেশি সক্রিয় হয়ে বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখে।”
কেন হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য মহৌষধ?
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘জ্যামা’-তে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন বেশি কদম বা স্টেপ ফেলা মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
গবেষকদের মতে, দিনে প্রচলিত ১০ হাজার কদমই হাঁটতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অলস বসে না থেকে দৈনিক নিজের সাধ্যমতো কদম বাড়ানোই আসল। নিয়মিত হাঁটার ফলে-
ক্যানসার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
হাড়ের ঘনত্ব বাড়ে এবং বাতের (আর্থ্রাইটিস) ব্যথা উপশম হয়।
রাতে ঘুমের গভীরতা ও মান উন্নত হয় এবং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ে।
মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা ও মানসিক অবসাদের লক্ষণ দূর হয়।
