কাঠের ট্রেতে পরিবেশন
অতিথি এলে ট্রেতে সাজিয়ে নাস্তা দেওয়ার প্রথায় পরিবর্তন এসেছে। তবে কাঠের ট্রে পুরানো ঘরোয়া পরিবেশের কথা ঠিকই মনে করিয়ে দেয়।
মেহমান এলে খাবার পরিবেশনে ট্রে বের করে আনার রীতি পুরাতন। চায়ের কাপ, বিস্কুট বা নাস্তা সাজিয়ে ট্রেতে অতিথির সামনে তুলে ধরাও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।
যদিও ট্রের উপকরণ ও নকশায় এসেছে পরিবর্তন। কাচ, ধাতুর পাশাপাশি কাঠের ট্রেও আছে তালিকায়। কারণ প্রাকৃতিক রং, নান্দনিক নকশা আর সহজ-সরল আবহ খাবার পরিবেশনে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
“তবে শুধু অতিথি আপ্যায়নের উপকরণ নয়, ঘরের সাজেও জায়গা দেওয়া যায় নকশা করা ট্রে। বসার ঘরের টেবিলে ফল, চায়ের কাপ বা ছোটখাটো খাবার রাখার জন্যও ব্যবহার করা যায় কাঠের ট্রে”, বলেন ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা অন্দরসজ্জাবিদ গুলশান নাসরিন।
কাঠের ট্রের বিশেষত্ব হল, এর স্বাভাবিক রং ও গঠন। কাঠের নিজস্ব আঁশ, রেখা ও রংয়ের ভিন্নতা প্রতিটি ট্রের আলাদা চেহারা দেয়। সঙ্গে হাতে আঁকা নকশা, রংয়ের ব্যবহার বা ধাতব হাতল যুক্ত হলে, তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন ধরন।
রং বাছাইয়ে ঘরের আবহ
কাঠের ট্রের রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাঠের স্বাভাবিক রংকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। হালকা বাদামি, মধুরঙা বা প্রাকৃতিক কাঠের রং ঘরে উষ্ণ ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করে।
এসব রংয়ের ট্রে সাদা, মাটি বা হালকা রংয়ের বাসনের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়।
অন্যদিকে গাঢ় বাদামি বা মেহগনি রংয়ের ট্রে দেখতে কিছুটা আভিজাত্যপূর্ণ। বসার ঘরের গাঢ় রংয়ের আসবাব বা কাঠের টেবিলের সঙ্গে এ ধরনের ট্রে ভালো মানায়।
একটু উজ্জ্বল রং পছন্দ হলে নীল, সবুজ, হলুদ বা লাল রংয়ের নকশা করা ট্রেও বেছে নেওয়া যায়।
“তবে পুরো ট্রেতে অনেক রং ব্যবহার করা হলে খাবারের সঙ্গে দৃষ্টির প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে”, বলেন গুলশান নাসরিন।
এছাড়া সাদা বা হালকা রংয়ের নকশা গাঢ় কাঠের ওপর ফুটে ওঠে। আবার হালকা কাঠের ট্রেতে গাঢ় রংয়ের নকশাও বেশ মানানসই।
নকশায় নিজস্বতা
কাঠের ট্রেতে নকশার বৈচিত্র্য থাকতে পারে। কোথাও কাঠের স্বাভাবিক আঁশই প্রধান বিষয়, কোথাও হাতে আঁকা ফুল, পাতা, লতাপাতা বা জ্যামিতিক নকশা।
আবার কিছু ট্রেতে দেখা যায় লোকজ নকশা, আলপনার আদল বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি।
ঘরের ও টেবিলের সাজ সহজ ও পরিমিত হলে খুব বেশি নকশা ছাড়া সাধারণ ট্রে বেছে নেওয়া যায়। আর ঘরের সাজে রংয়ের ব্যবহার বেশি থাকলে নকশা করা ট্রে পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
নকশা নির্বাচনের সময় ট্রের ব্যবহারও বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিদিন চা-নাস্তা পরিবেশনের জন্য খুব বেশি উঁচু বা জটিল নকশার ট্রে সুবিধাজনক নয়। কারণ এর ওপর কাপ, প্লেট বা খাবারের বাটি ঠিকভাবে রাখা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে বিশেষ উপলক্ষ্যে পরিবেশনের জন্য হাতে আঁকা বা কারুকাজ করা ট্রে বেছে নেওয়া যায়। তবে যে নকশাই হোক, খাবার রাখার জায়গাটি যেন সমতল ও সহজে পরিষ্কার করা যায়।
হাতল যেমন হলে সুবিধা
ট্রের হাতল শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, নিরাপদে বহন করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কাঠের তৈরি হাতল ট্রের সঙ্গে একই রকম স্বাভাবিক ও সাদামাটা চেহারা তৈরি করে। আবার রুপালি বা সোনালি রংয়ের ধাতব হাতল কাঠের ট্রেতে আধুনিকতার ছোঁয়া যোগ করে।
তবে হাতলটি যেন মজবুতভাবে লাগানো থাকে এবং ধরার সময় আঙুলের জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকে, সেটা দেখার বিষয়।
হাতল খুব সরু হলে বা ধারালো কিনারা থাকলে বহন করতে অস্বস্তি হতে পারে। আবার হাতল ছাড়া সমতল ট্রে দেখতে বেশ সুন্দর হলেও, ভারী খাবার নিয়ে চলাচলের সময় দুই হাতে ধরে রাখতে হয়।
খাবার বুঝে ট্রের আকার
কাঠের ট্রে কেনার সময় আকারের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। ছোট আকারের ট্রে এক কাপ চা, কফি বা বিস্কুট পরিবেশনের জন্য যথেষ্ট।
ব্যক্তিগতভাবে নাস্তা পরিবেশন বা শোবার ঘরে পানীয় নেওয়ার কাজেও ছোট ট্রে ব্যবহার করা যায়।
মাঝারি আকারের ট্রেতে দুই থেকে চার কাপ চা, ছোট প্লেট, বিস্কুট বা নাস্তার বাটি সাজানো সম্ভব। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে চা পরিবেশন বা দু-একজন অতিথিকে আপ্যায়নের জন্য এই আকার সুবিধাজনক।
বড় আকারের ট্রে একাধিক খাবার, পানীয় ও পরিবেশনের বাসন একসঙ্গে বহনের জন্য উপযোগী। সকালের নাস্তা, ফল, স্যান্ডউইচ বা কয়েক ধরনের মুখরোচক খাবার সাজিয়ে দিতে চাইলে বড় ট্রে বেছে নেওয়া যায়।
তবে আকার যত বড় হবে, খাবারসহ ট্রেটির ওজনও তত বাড়বে। তাই খুব বড় ট্রে কেনার আগে, সেটি সহজে বহন করা যাবে কি-না, তা ভাবতে হবে।
এছাড়া আকারের পাশাপাশি ট্রের কিনারাও গুরুত্বপূর্ণ। চারপাশে সামান্য উঁচু কিনারা থাকলে কাপ বা বাটি সহজে পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।
যেমন খাবার তেমন ট্রে
চা, কফি বা পানীয় পরিবেশনের জন্য মাঝারি আকারের সমতল কাঠের ট্রে বেশ উপযোগী। এতে কাপের পাশাপাশি ছোট বাটিতে চিনি, বিস্কুট বা হালকা নাস্তা রাখা যায়।
সকালের নাস্তায় পাউরুটি, ফল, ডিম বা স্যান্ডউইচ পরিবেশন করতে চাইলে একটু বড় ও চওড়া ট্রে ভালো। এতে খাবার আলাদা করে সাজানোর জায়গা পাওয়া যায়।
মিষ্টি, পিঠা, কেক বা শুকনা নাস্তা পরিবেশনের জন্য অগভীর ট্রে বেছে নেওয়া যায়। এসব খাবার সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করা সম্ভব।
ফল পরিবেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা গভীর বা উঁচু কিনারাযুক্ত ট্রে সুবিধাজনক। এতে ফল গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
আবার ছোট ছোট বাটিতে বাদাম, চানাচুর বা বিভিন্ন মুখরোচক খাবার সাজিয়ে দিতে চাইলে চওড়া ট্রে ব্যবহার করা যায়।
তবে সব ধরনের খাবার সরাসরি কাঠের ট্রেতে রাখা উচিত নয়। বিশেষ করে খুব গরম, ঝোলযুক্ত বা অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার সরাসরি কাঠের ওপর রাখলে দাগ পড়তে পারে।
“এক্ষেত্রে খাবার প্লেট বা বাটিতে রেখে ট্রেতে সাজানো ভালো। গরম পাত্রের নিচে তাপসহনশীল ম্যাট ব্যবহার করলেও ট্রের সুরক্ষা থাকে”, বলেন গুলশান নাসরিন।
ব্যবহার ও যত্নে কয়েকটি বিষয়
কাঠের ট্রে দীর্ঘদিন ভালো রাখতে ব্যবহারের পর পরিষ্কার করে শুকনো রাখা জরুরি। খাবারের কণা বা পানীয় পড়ে থাকলে দ্রুত মুছে ফেলতে হবে।
এক্ষেত্রে পরিষ্কারের জন্য নরম কাপড় বা স্পঞ্জ ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজন হলে সামান্য সাবান-পানি দিয়ে মুছে পরে পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে সাবান সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপর শুকনা কাপড় দিয়ে পানি মুছে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শুকিয়ে নিতে হবে।
গুলশান নাসলিন সাবধান করে বলেন, “তবে কাঠের ট্রে দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা ঠিক নয়। পানিতে ডুবিয়ে রাখা বা ভেজা অবস্থায় রেখে দিলে কাঠ ফুলে যেতে পারে, বাঁকতে পারে বা এর ওপরের রং ও প্রলেপ নষ্ট হতে পারে।”
একইভাবে সরাসরি রোদে বা অতিরিক্ত তাপের কাছে রাখাও এড়িয়ে চলা ভালো।
