মোবাইল ফোন ‘হ্যাং’ করার যত কারণ
নতুন কেনার আগে পুরান ফোনের কয়েকটি বিষয় পরখ করে দেখা যেতে পারে।
জরুরি একটা ফাইল পাঠাতে হবে ফোন থেকে। অথচ নির্দিষ্ট অ্যাপটা খুলছে না। কয়েকবার আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করার পর ফোন হ্যাং করে গেল। রি-স্টার্ট দিলেন, ঠিক হল। তবে মিনিট পনেরো পরে আবার একই সমস্যা।
এই অভিজ্ঞতা থেকে প্রথমেই মাথায় আসে— ফোন পুরানো হয়ে গেছে, নতুন কিনতে হবে।
তবে ঢাকার ইস্টার্ন প্লাজার মোবাইল মেরামত প্রতিষ্ঠান সাইম প্লাসের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল হোসেন বলেন, “নতুন ফোনও হ্যাং করে। এবং পুরনো ফোনও ঠিক করা যায়।”
সে কারণে জানতে হবে কিছু কৌশল।
স্টোরেজ ভরে গেলে ফোন মানুষের মতোই হাঁফিয়ে ওঠে
ফোনের হ্যাং হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল- ‘ইন্টারনাল স্টোরেজ’ ভরে যাওয়া।
মো. কামাল হোসেন সহজে বোঝাতে গিয়ে বলেন, “আপনার ঘরে যদি অনেক জিনিসপত্র থাকে যে নড়ার জায়গা নেই, তাহলে কাজ করতে অসুবিধা হবে। ফোনের ক্ষেত্রেও একই কথা। অ্যাপ চালাতে হলে ফোনের কিছু সাময়িক জায়গা দরকার — সেই জায়গা না থাকলে কাজ আটকে যায়।”
অনেকের ফোনে থাকে বছরের পুরানো ছবি, বারবার ডাউনলোড হওয়া ফাইল, কোনোদিন খোলা হয়নি এমন অ্যাপ। এই জঞ্জালগুলো ধীরে ধীরে ফোনের গতি কমায়।
“সমাধান সহজ। নিয়মিত অপ্রয়োজনীয় ফাইল, পুরানো ছবি ও অব্যবহৃত অ্যাপ মুছে ফেলতে হবে। স্টোরেজের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সবসময় খালি রাখার চেষ্টা করুন”- পরামর্শ দেন মো. হোসেন।
এক সঙ্গে অনেক অ্যাপ খোলা — র্যামের ওপর অত্যাচার
ফোনে একসঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, ক্রোম, ইউটিউব, ফেইসবুক, গুগল ম্যাপস — সব চলছে। মনে হচ্ছে মাল্টিটাস্কিং হচ্ছে। আসলে র্যামে চাপ পড়ছে।
র্যাম হল ফোনের কাজের টেবিল। যত বেশি অ্যাপ খোলা থাকে, টেবিলে তত বেশি জিনিস। একসময় জায়গা শেষ হয়ে যায়, তখন ফোন হ্যাং করে।
মো. হোসেন আরও বলেন, “কম র্যামের ফোনে এই সমস্যা আরও বেশি। তবে বেশি র্যামের ফোনেও একটানা অনেক অ্যাপ খোলা রাখলে একই পরিণতি হতে পারে।”
ব্যবহার শেষে অ্যাপ বন্ধ করুন। সেটিংসে গিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপগুলো সীমিত করুন। সপ্তাহে একবার ফোন রিস্টার্ট করলে র্যাম পরিষ্কার হয়- পরামর্শ দেন মো. হোসেন।
আপডেট এড়িয়ে যাচ্ছেন? এটাই হয়তো সমস্যার গোড়া
‘আপডেট আসছে’ নোটিফিকেশন দেখে অনেকে বন্ধ করে দেন। পরে করবেন বলে অনেক সময় করাই হয় না।
তবে ‘সফটওয়্যার আপডেট’ না রাখলে পুরানো বাগ থেকে যায়। এই বাগগুলো ফোনের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়, গতি কমায়। আপডেটগুলো মূলত এই বাগগুলো ঠিক করতেই আসে, পাশাপাশি নিরাপত্তাও বাড়ায়।
অ্যাপ আপডেটও গুরুত্বপূর্ণ। পুরানো ভার্সনের অ্যাপ নতুন ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে না।
“ওয়াইফাই-তে থাকলে আপডেট দিয়ে দিন। মোবাইল ডেটা খরচ হবে না, আর ফোনও ঠিকঠাক চলবে” বলেন কামাল হোসেন।
অজানা জায়গা থেকে অ্যাপ নামালে ভাইরাস আসে — ফোন আস্তে আস্তে কাবু হয়
প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরের বাইরে থেকে অ্যাপ নামানোর প্রবণতা অনেকের আছে। ফ্রি পাওয়া যাচ্ছে, তাই নামিয়ে নিলাম।
মো. কামাল বলেন, “তবে এই অ্যাপগুলোতে ম্যালওয়্যার থাকতে পারে। এই ক্ষতিকর সফটওয়্যার গোপনে চলতে থাকে, ডেটা পাঠায়, ব্যাটারি ব্যবহার করে, র্যাম দখল করে। আপনি বুঝতেই পারেন না কোথায় সমস্যা। তবে ফোন ক্রমেই ধীর হয়।
সমাধান হল বিশ্বস্ত ‘সোর্স’ ছাড়া অ্যাপ না নামানো। ফোনে ভালো অ্যান্টিভাইরাস রাখুন। সন্দেহজনক কিছু মনে হলে সেই অ্যাপ মুছে দিন- পরামর্শ দেন তিনি।
ফোন গরম হচ্ছে? সেটা নিজে থেকেই পারফরম্যান্স কমিয়ে দেয়
ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেইম খেলছেন, অথবা চার্জে লাগিয়ে ভিডিও দেখছেন— এই সময়ে ফোন গরম হয়ে যায়।
আর তখন ফোন নিজে থেকেই গতি কমিয়ে দেয়। প্রযুক্তির ভাষায় এটাকে বলে 'থ্রটলিং'। ভেতরের যন্ত্রপাতি যেন পুড়ে না যায়, সেজন্য ফোন নিজে নিজেই ধীরে চলতে শুরু করে।
“এই সময় হ্যাং করা বা স্লো হওয়া আসলে ফোনের নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা। সমাধান হল, চার্জে রেখে ভারী ব্যবহার করবেন না। গরম হলে কিছুক্ষণ রেস্ট দিন। সরাসরি রোদে ফোন ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন”- বলেন মো. কামাল হোসেন।
পুরনো ব্যাটারিও হ্যাংয়ের কারণ হতে পারে
ব্যাটারি পুরানো হলে শক্তি সরবরাহ অনিয়মিত হয়। ফোনের প্রসেসর পর্যাপ্ত শক্তি পায় না, তাই ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
অনেক ফোনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যাটারি ৪০ শতাংশ থাকতেই ফোন হঠাৎ স্লো হয় বা বন্ধ হয়ে যায়। এটা পুরানো ব্যাটারির লক্ষণ।
মো. কামাল হোসেন বলেন, “এছাড়া ব্যাটারির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি। আইফোনে সেটিংসে গেলে সরাসরি দেখা যায়। আশি শতাংশের নিচে নামলে বদলানোর কথা ভাবুন। নতুন ফোন কেনার চেয়ে ব্যাটারি বদলানো অনেক কম খরচের।”
ফোন কেনার আগে এই কাজগুলো করে দেখুন
সব উপায় চেষ্টা করার পরও ফোন বারবার হ্যাং করলে তখন ভাবুন ফ্যাক্টরি রিসেট দিতে। এর আগে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ব্যাকআপ নিন।
“আর হার্ডওয়্যারে সমস্যা হলে, যেমন- র্যাম বা প্রসেসরে ত্রুটি দেখা দিলে সফটওয়্যার সমাধান কাজ করবে না, ফোন ভালো মেরামত করতে পারে এমন কাউকে দেখাতে হবে”-বলেন মো. কামাল।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হ্যাংয়ের সমস্যা সফটওয়্যার পর্যায়ের। স্টোরেজ পরিষ্কার রাখা, আপডেট দেওয়া, অ্যাপ নিয়ন্ত্রণ করা — এই সহজ অভ্যাসগুলোই ফোনকে দীর্ঘদিন চাঙা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
