মাত্র তিন মিনিটের বিরতিতে মিলতে পারে মানসিক প্রশান্তি
বিধ্বস্ত লাগছে? তাহলে নিজেকে সতেজ করতে নেওয়া যায় ছোটখাট পদক্ষেপ।
দ্রুতগতির জীবনে প্রায় সবাই কাজের চাপে বিপর্যস্ত। অফিস, পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্যক্তিগত সময়ের টানাপোড়েন সব মিলিয়ে একটানা ব্যস্ততা যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
অনেকেই ভাবেন, নিজের যত্ন নিতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় প্রয়োজন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী এবং মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লিলিট আইরাপেটিয়ান রিয়েলসিম্পল ডটকম–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “নিজের যত্ন নেওয়া মানেই বড় কিছু করতে হবে এমন নয়। মাত্র তিন মিনিটের ছোট্ট বিরতিও মানসিক অবস্থাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।”
কখন বুঝবেন আপনার একটি বিরতি প্রয়োজন?
ডা. আইরাপেটিয়ান জানান, শরীরই নিজ থেকে আমাদের সংকেত দেয় কখন বিরতি দরকার।
তিনি বলেন, “আমি মা ও নারী রোগীর সঙ্গে কাজ করি। তাদের প্রায়ই বলি শরীর সবসময় আমাদের সঙ্গে কথা বলে। বিশেষ করে যখন আমাদের মন ও স্নায়ুতন্ত্র বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, তখনই এই সংকেতগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”
স্নায়ুতন্ত্র বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লে আমরা অনেক সময় ‘স্ট্রেস’ বা চাপের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট মুড’য়ে আটকে যাই বা একেবারে স্থবিরতা (ফ্রিজ মোড) অনুভব করি।
এর লক্ষণ হতে পারে দ্রুত চিন্তা, টানটান পেশি, বিরক্তি, হালকা শ্বাস-প্রশ্বাস, অস্থিরতা, এমনকি হতবুদ্ধি বা অসংলগ্ন অনুভব করা।
অনেক সময় আবার একেবারে অনুভূতিহীনতা বা ‘অটোপাইলট’য়ে চলার মতো অবস্থা তৈরি হয়। এ সবই বলে দেয়, শরীর চায় একটু আরাম বা বিশ্রাম; একটু স্থির হওয়া।
সময় মতো এসব সংকেত ধরতে পারলে বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয় এড়ানো যায়।
বিরতি মানেই বিলাসিতা নয়
ডা. আইরাপেটিয়ান বলেন, “বিরতি নেওয়া মানেই যে সেটা সময়সাপেক্ষ বা বিলাসিতাপূর্ণ হতে হবে তা নয়। এটা এক ধরনের মানসিক রক্ষণাবেক্ষণ বা ‘মেইনটেনেন্স’। যত বার এই ছোট ছোট ‘রিসেট’য়ের অনুশীলন বা পুনরায় শুরু করবেন, তত সহজে স্নায়ুতন্ত্র স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শিখে যাবে।”
কীভাবে মাত্র ৩ মিনিটেই মানসিক শান্তি পাবেন?
ইন্দ্রিয় অনুভবের অনুশীলন
পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। যেমন- স্পর্শ বা ঘ্রাণ। এরপর সেই অনুভবে পুরো মনোযোগ দিতে হবে।
ডা. আইরাপেটিয়ান বলেন, “নিজের হাতগুলো উষ্ণ পানির নিচে দিন, হালকা করে লোশন মেখে নিন। অথবা প্রিয় কোনো এসেনশল অয়েলের ঘ্রাণ নিন। এই অভ্যাস আমাদের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ অর্থাৎ বিশ্রাম ও হজমের প্রক্রিয়া চালু করে এবং বর্তমান মুহূর্তে স্থির হতে সাহায্য করে।”
চাইলে ল্যাভেন্ডার এসেনশল অয়েল ব্যবহার করতে পারেন, যা মানসিক প্রশান্তির জন্য খুবই কার্যকর। অফিসে তা ডেস্কের কাছাকাছি রাখলে দরকারে সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন- পরামর্শ দেন এই মনোবিজ্ঞানী।
শরীর ঝাঁকিয়ে নেওয়া
অফিসের চেয়ারে বসে থাকার ফলে শরীরে ক্লান্তি জমে, যা মানসিক চাপও বাড়ায়। হাঁটার সময় নেই? সমস্যা নেই। দাঁড়িয়ে হালকা করে হাত, পা, কোমর বা শরীরের অন্যান্য অংশ ঝাঁকান।
ডা. আইরাপেটিয়ান বলেন, “শরীর ঝাঁকানো হয়তো শুনতে হাস্যকর লাগতে পারে। তবে এটা স্ট্রেস বা চাপের এনার্জি বের করে দিতে দারুণ কাজ করে। মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই স্বস্তি অনুভব করা যায়।”
বক্স ব্রিদিং বা চার-কোণা শ্বাস
এই প্রাচীন শ্বাস অনুশীলন পদ্ধতি খুবই সহজ এবং কার্যকর। ধাপে ধাপে এইভাবে শ্বাস নিতে হবে:
৪ সেকেন্ডে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৪ সেকেন্ডে শ্বাস ছাড়ুন, আবার ৪ সেকেন্ড থেমে থাকুন। এভাবে কয়েকবার অনুশীলন করলেই মনটা শান্ত হয়ে আসে এবং মনোযোগও বাড়ে।
বুকে হাত রেখে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া
ইয়োগা ক্লাসে হয়ত অনেকেই এই অনুশীলন করে থাকতে পারেন। তবে ব্যস্ত মুহূর্তেও এটা কাজে দেয়।
চোখ বন্ধ করে নিজের বুকে হাত রাখতে হবে। ধীরে শ্বাস নিয়ে এবং মৃদুস্বরে বলতে হবে, ‘আমি এখানে, আমি নিরাপদ, আমি একটু থামতে পারি।’
ডা. আইরাপেটিয়ান বলেন, ‘এটা এক ধরনের আত্ম-স্নেহ, যা উদ্বেগ কমিয়ে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় আমরা নিজের যত্ন নিতে পারি।’
একটু বাইরের বাতাস নেওয়া
যদি সম্ভব হয় মাত্র এক মিনিটের জন্য বারান্দা বা জানালার কাছে দাঁড়াতে হবে।
ডা. আইরাপেটিয়ান বলেন, “প্রাকৃতিক আলো, খোলা হাওয়া এবং পরিবেশের সামান্য পরিবর্তন মস্তিষ্ককে ‘রিফ্রেশ’ বা সতেজ করে এবং শরীরকে পুনর্গঠিত করে।”
এই ছোট ছোট বিরতিগুলোই দিনটিকে অনেক হালকা করতে পারে। মনে রাখতে হবে, নিজেকে সময় দেওয়া মানে দায়িত্ব ফাঁকি দেওয়া নয়। বরং নিজের যত্ন নেওয়াই হল দীর্ঘমেয়াদে সব দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করার মূল চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন
