২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

অবচেতনে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করছে যেসব অভ্যাস

রাত জেগে ফোন দেখলে শুধু ঘুমের সমস্যাই হয় না, হৃদযন্ত্রেরও ক্ষতি হয়।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Sep 2026, 07:15 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:33 PM

বিশ্বজুড়ে অকাল মৃত্যুর একটি কারণ হল হৃদরোগ বা ‘কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ’। 

অনেকেই ভাবেন, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো ঘটনাগুলো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বা বয়সের কারণে ঘটে থাকে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভুল ধারণা।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিছু প্রাত্যহিক ভুল অভ্যাস, অলক্ষ্যেই হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ‘পাম্পিং’ ক্ষমতাকে অবশ করে দেয়।

রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া সচল রাখতে এবং হৃদসংক্রান্ত প্রক্রিয়াকে বাঁচাতে ৮টি ভুল সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত।

স্বাস্থ্য-বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জীবনযাত্রায় ছোট ছোট কিছু বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আনলে, কোনো দামি ওষুধ ছাড়াই হৃদযন্ত্রকে রোগমুক্ত রাখা সম্ভব।

১. অতিরিক্ত সোডিয়াম বা ক্ষতিকর লবণের ব্যবহার

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের হৃদরোগ-বিশেষজ্ঞ ডা. নিলয় শাহ সতর্ক করেন, “প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত স্যুপ, সসেজ, পাউরুটি এবং কড়া মসলার ফাস্টফুডের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ থাকে। অতিরিক্ত সোডিয়াম ধমনীর রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়, যা হাইপারটেনশন এবং আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকের প্রধান ঝুঁকি।”

সমাধান হল, দৈনিক সোডিয়ামের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২,৩০০ মিলিগ্রাম বা ১ চা-চামচের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা এবং ঘরে তৈরি তাজা খাবার খাওয়া।

২. দীর্ঘ সময় অনবরত বসে থাকা

যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস মেডিকেল সেন্টারের জেনারেল কার্ডিওলজি সার্ভিসের পরিচালক ডা. ব্রায়ান ডাউনি বলেন, “বর্তমানে বসে কাজ করার কারণে, মানুষ দিন দিন অলস হয়ে পড়ছে। ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি নতুন প্রবাদ তৈরি হয়েছে—‘বসে থাকা হল নতুন ধূমপান’

দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে শরীরে কম ক্যালরি পোড়ে, মেদ বা স্থূলতা বাড়ে এবং তা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি করে হৃদযন্ত্রের পেশি অবশ করে দেয়।”

এর প্রতিকারে প্রতি এক ঘণ্টা কাজ করার পর ডেস্ক-চেয়ার থেকে উঠে অন্তত ৫ মিনিট হাঁটাচলা করা, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার এবং সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি শরীরচর্চা করা বাধ্যতামূলক।

৩. ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল স্ক্রিনের ক্ষতিকর স্ক্রোলিং

নিউ ইয়র্কে অবস্থিত এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গন হেলথের ডা. হারমোনি রেনল্ডস ব্যাখ্যা করেন, “মাঝরাতে বিছানায় শুয়ে অবিরত সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোলিং করলে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো মগজের ঘুম পাড়ানি হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণ পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে এটি স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বাড়িয়ে দেয়। ঘুমের এই তীব্র ঘাটতি রক্তচাপকে দীর্ঘক্ষণ উচ্চ মাত্রায় আটকে রাখে, যা সরাসরি স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।”

এজন্য ঘুমানোর ৩০ মিনিট আগে বেডরুম থেকে ফোন দূরে রাখা এবং পরিবর্তে বই পড়ার অভ্যাস করা স্বাস্থ্যকর।

৪. রান্নাঘরে ক্ষতিকর জাঙ্ক ফুড জমানো

ঘরে চিপস, চকোলেট বা কোমল পানীয়র মতো অতি-প্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুড কিনে এনে মজুদ করে রাখা একটি বড় ভুল মানসিকতা। এই খাবারগুলোর ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে ধমনীতে চর্বির শক্ত ‘ব্লক’ তৈরি করে এবং রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতে ঘটিয়ে মেজাজ খিটখিটে করে দেয়।

সমাধান হল, বাজারে গেলে এই অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো না তুলে ওখানেই বর্জন করা এবং মিষ্টির বাতিক উঠলে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করা।

৫. তীব্র সামাজিক একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা

‘অ্যাডভান্সড হার্ট ফেইলিউর’-এর মার্কিন বিশেষজ্ঞ ডা. বলজাশ চিমা বলেন, “একাকিত্ব কেবল মস্তিস্কেরই ক্ষতি করে না, বরং সামাজিক মেলবন্ধনের তীব্র অভাব হৃদযন্ত্রের ওপর ধকল তৈরি করে।”

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তীব্র নিঃসঙ্গতার মানসিক চাপ ও ‘ট্রমা’ অলক্ষ্যেই হৃদরোগের আংশিক ঝুঁকি হিসেবে ধমনীর ব্লক প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিকারে প্রতি সপ্তাহে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পরিবারকে ফোন করা বা সামাজিক কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে অংশ নেওয়া প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

৬. নিজের মেটাবলিক সংখ্যা বা রিডিং না জানা

ডা. নিলয় শাহ লক্ষ্য করেছেন, বিশেষ করে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্করা ভাবেন হৃদরোগ কেবল বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা, তাই তারা বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা পুরোপুরি অবহেলা করেন।

অথচ বর্তমানে তরুণদের মাঝেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের হার বাড়ছে। তাই নিয়মিত ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিজের রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং খালি পেটের শর্করার মান লিখে রাখা এবং সচেতন হওয়া বাধ্যতামূলক।

৭. ‘দেরি হয়ে গেছে’ ভেবে ক্ষতিকর জীবনযাপন পরিবর্তন না করা

অনেক রোগী ভাবেন, ‘আমি তো বহু বছর ধরে ধূমপান করছি বা অতিরিক্ত ওজনে আছি, এখন আর অভ্যাস বদলে কী লাভ?’

ডা. বলজাশ চিমা নির্দেশনা দেন যে, “শরীর সুস্থ করার জন্য কোনো সময়ই ‘দেরি’ হয়ে যায় না; আপনি আজই যে ছোট পরিবর্তনটি শুরু করবেন, মস্তিস্ক ও হৃদযন্ত্রের কোষ সেখান থেকেই নিজেকে মেরামত করা দ্রুত সচল করবে।”

৮. বুকের ভেতরের প্রাথমিক লাল সংকেত

ডা. হারমোনি রেনল্ডস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক রোগী (বিশেষ করে নারীরা) বুকের ভেতরের তীব্র চাপ বা হালকা ব্যথাকে শুধুই সাধারণ গ্যাস বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স ভেবে অ্যান্টাসিড খেয়ে দিনের পর দিন অবহেলা করেন। অথচ বুকে ব্যথা হল হার্ট অ্যাটাকের প্রধানতম ও প্রথম সংকেত।”

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষতি স্থায়ী ও চিরন্তন হয়, তাই যদি বুকে তীব্র টাইটনেস বা আঁটসাঁট অনুভব, চাপ বা ব্যথা-  গলা, চোয়াল ও বাম বাহুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটা১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, তবে এক সেকেন্ড অবহেলা না করে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে যেসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হয়

পরিবর্তনের অজানা ভয় ‘মেটাথেসিওফোবিয়া’র ৮ লক্ষণ

পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রাকৃতিক পন্থা