Published : 01 Sep 2026, 04:17 PM
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবন, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার প্রবণতা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে বর্তমান যুগের মানুষের মাঝে ঘুমের ঘাটতি এক নীরব মহামারী আকার ধারণ করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ঘুমের চেয়ে যতটুকু কম ঘুমানো হয়, সেই পুঞ্জীভূত ঘাটতিকে ‘স্লিপ ডেট’ বা ‘ঘুমের দায়’ বলা হয়।
অনেকেই ভাবেন, কাজের দিনগুলোতে রাত জেগে কম ঘুমালেও ছুটির দিনে বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একটানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলে, সেই ঘাটতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ঘুম-বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা চিকিৎসাগতভাবে সম্পূর্ণ ভুল এবং এটি শরীরের মেটাবলিজমকে মারাত্মকভাবে ওলটপালট করে দেয়।
স্বাস্থ্য পোর্টাল ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্লিপ মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞ থমাস জনসন বলেন, “ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমালে সাময়িক আরাম মিললেও মস্তিস্কের অভ্যন্তরীণ কগনিটিভ বা চিন্তা করার ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না।”
মস্তিস্কের ‘স্লিপ টাইমার’ ও অ্যাডেনোসিনের কারসাজি
মার্কিন গবেষক এ. এল. হেউড একই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “মস্তিস্কে প্রাকৃতিকভাবেই একটি অভ্যন্তরীণ ‘স্লিপ টাইমার’ বা ঘুম ঘড়ি কাজ করে। মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকে, মগজের কোষে অনবরত ‘অ্যাডেনোসিন’ নামক এক বিশেষ হরমোন বা রাসায়নিক উপাদান জমা হতে থাকে, যা শরীরে ‘স্লিপ প্রেসার’ বা ঘুমের তীব্র চাপ তৈরি করে।
যখন কেউ রাতে পর্যাপ্ত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমান, তখন মস্তিস্ক এই অ্যাডেনোসিন পুরোপুরি পরিষ্কার করে ‘টাইমার’টি রিসেট করে দেয়। তবে ঘুমের দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি থাকলে এই হরমোনের নির্দিষ্ট মাত্রা রক্তে স্থায়ীভাবে বেড়ে যায়, যা কেবল অলসতা বা ক্লান্তিই তৈরি করে না, বরং ধমনীর রক্ত প্রবাহকে ধীর করে হৃদস্পন্দনের গতি ওলটপালট করে দেয়।”
ঘুমের ঘাটতিতে শারীরিক ঝুঁকি
বিপাকীয় ধীরগতি ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
ঘুমের ঘাটতি সরাসরি শরীরের এন্ডোক্রাইন বা হরমোন উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে দেয়। এটি রক্তে ক্ষুধা বাড়ানোর হরমোন ‘গ্রেলিন’ বাড়িয়ে দেয় এবং পেট ভরা থাকার সংকেত দেওয়া হরমোন ‘লেপটিন’ স্তব্ধ করে দেয়, যা অতিরিক্ত মেদ জমায়।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের একাধিক সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘ক্রনিক স্লিপ ডেট’ শরীরের কোষের সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ।
হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষের স্বয়ংক্রিয় ‘সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র’ অনবরত হাইপার-অ্যাক্টিভ বা অতি-সক্রিয় থাকে। ফলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে ধমনীর ওপর চাপ বাড়ায়, যা দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অবশ হওয়া
মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখন তার ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে এক বিশেষ রাসায়নিক বা ‘সাইটোকাইন’ নিঃসরণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর তথ্যানুসারে, ঘুমের চরম অবহেলা এই সাইটোকাইনের নিঃসরণ কমিয়ে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু থেকে শুরু করে ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
মস্তিস্কের নোংরা আবর্জনা জমাকরণ
গভীর ঘুমের সময় মগজের কোষে দিনের বেলা জমা হওয়া সমস্ত বর্জ্য ও ক্ষতিকর প্রোটিন প্রাকৃতিকভাবে ধুয়ে সাফ করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতিতে মগজ নিজেকে ‘পরিষ্কার করার সুযোগ পায় না। ফলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অর্থাৎ জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা পুরোপুরি অবশ করে দেয়।
মেজাজের খিটখিটে ভাব ও অবসাদ
২০২১ সালের এক সামাজিক গবেষণায় প্রায় ১,৯৫৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টানা কয়েক রাত, ৬ ঘণ্টার কম ঘুমালে মানুষের আবেগের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দৈনিক মেজাজ ও মানসিকভাবে ভালো থাকার পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
ছুটির দিনের ঘুমের ঘাটতি শোধ করা যায়
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, এক রাতের ঘুমের ঘাটতি পরে রাতে বেশি ঘুমালে কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি, সাপ্তাহিক এক বা দুই দিনের ছুটিতে শোধ করা অসম্ভব।
৪ দিনের হিসাব: ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, মাত্র ১ ঘণ্টার ঘুমের বকেয়া খতিয়ান শরীর থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে মস্তিস্কের একটানা ৪ দিন সঠিক নিয়মে ঘুমানোর প্রয়োজন হয়।
সপ্তাহান্তে ঘুমের ভুল ফাঁদ: ২০২০ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ ছুটির দিনে ঘুমিয়ে সপ্তাহের ক্লান্তি সামলাতে পারেন। বাকিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অলস ঘুম শরীরের স্বাভাবিক সারকাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়িকে ওলটপালট করে দেয়। ফলে ছুটির রাতে সঠিক সময়ে ঘুম আসে না এবং ঘুমের এই ঘাটতি পরের সপ্তাহেও অবিরত চলতে থা।
পাওয়ার ন্যাপের সীমাবদ্ধতা: দুপুরে বা বিকেলে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো বা ন্যাপ নেওয়া সাময়িক শক্তি দিলেও তা রাতের গভীর ঘুমের বিকল্প হতে পারে না।
দুপুরে সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের একটি ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নেওয়া যেতে পারে।
ঘুমের মান উন্নত করার ঘরোয়া নিয়ম
ঘুমানোর ১৫ মিনিটের সূত্র: প্রতিদিন রাতে হুট করে বিছানায় না গিয়ে, নিজের কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানোর জন্য প্রতি রাতে ১৫ মিনিট আগে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
গ্যাজেট ও স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা: ঘুমানোর অন্তত ২ ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ, মোবাইল বা যেকোনো ইলেকট্রনিক স্ক্রিন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। কারণ এর ব্লু-লাইট মেলাটোনিন হরমোন নষ্ট করে।
অ্যালার্ম লক: ছুটির দিনেও নিজের সাধারণ ঘুম থেকে ওঠার সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টার বেশি অতিরিক্ত বিছানায় থাকা অনুচিত, এতে বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক থাকে।
বেডরুমের পরিবেশ ও ক্যাফিন বর্জন: শয়নকক্ষ সবসময় অন্ধকার, শান্ত এবং ঠান্ডা রাখা প্রয়োজনীয়। বিকালের পর কফি বা ক্যাফিন ধর্মী পানীয় বর্জন করা নিরাপদ।
শরীরের অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা সচল রাখা: ঘুমের সময় মস্তিস্কের কোষগুলো যেন পানিশূন্য না হয়ে পড়ে, সেজন্য সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন
ঘুমের ঘাটতিতে দেহের ক্ষতি মেটানোর ব্যায়াম