Published : 26 May 2026, 07:05 PM
রাতে ভালো ঘুম হওয়া শরীর ও মনের জন্য জরুরি। তবে অনেকেই পুরো অন্ধকার ঘরে ঘুমাতে অস্বস্তি বোধ করেন।
কেউ হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখেন, কেউ টেলিভিশনের আলো ছাড়া ঘুমাতে পারেন না, আবার কেউ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ভয় পান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই অনুভূতি অস্বাভাবিক নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে মানুষের জৈবিক ও মানসিক কারণ।”
তবে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করলে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঘুমানো সম্ভব, আর সেটি শরীরের জন্যও অনেক বেশি উপকারী।
যে কারণে অন্ধকারে অস্বস্তি হয়
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঘুমবিষয়ক চিকিৎসক কিশা সালিভান রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “অন্ধকার মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের সতর্ক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে দৃষ্টিশক্তির ওপর। যখন চারপাশ দেখা যায় না, তখন অন্য অনুভূতিগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে ছোট কোনো শব্দও তখন বেশি ভয়ংকর মনে হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্ধকারে মস্তিষ্ক আশপাশের অনিশ্চয়তা পূরণ করার চেষ্টা করে। তাই অচেনা শব্দ বা নড়াচড়া সহজেই উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের গবেষক ও মনোবিজ্ঞানী জোসেফ ডিয়ারজেভস্কি মনে করেন, “অনেক সময় মানুষ অন্ধকারকে ভয়, উদ্বেগ বা জেগে থাকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। ফলে অন্ধকার ঘর তখন শান্তির বদলে অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি করে।”
শরীরের জন্য অন্ধকার যে কারণে জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, “ঘুমের সঙ্গে আলো ও অন্ধকারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শরীরের জৈবিক ঘড়ি, আলো ও অন্ধকারের ওপর নির্ভর করেই কাজ করে।”
কিশা সালিভান বলেন, “আলো শরীরে মেলাটোনিন নামের যে হরমোন ঘুম আনতে সাহায্য করে, সেটার উৎপাদন কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে অন্ধকার শরীরকে বেশি মেলাটোনিন তৈরি করার সংকেত দেয়। ফলে মানুষ সহজে ঘুমিয়ে পড়তে পারে এবং ঘুম গভীর হয়।”
তিনি আরও বলেন, “রাতে দীর্ঘসময় আলোতে থাকা, শুধু ঘুমের ক্ষতি করে না বরং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ–২ ডায়াবেটিস এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।”
ধীরে ধীরে আলো কমানোর অভ্যাস
অনেকেই হঠাৎ পুরো অন্ধকারে যেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আলো কমানো কার্যকর উপায় হতে পারে।
জোসেফ ডিয়ারজেভস্কি বলেন, “ঘুমানোর আগে একেবারে হঠাৎ সব আলো নিভিয়ে না দিয়ে, ধাপে ধাপে আলো কমানো উচিত। এতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে রাতের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
উষ্ণ ও মৃদু আলোর ব্যবহারকে বেশি কার্যকর মনে করেন, তিনি। অনেক লাইট আছে যার আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। এতে ঘুমের জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়।
মৃদু আলোর ব্যবহার
সম্পূর্ণ অন্ধকারে অস্বস্তি হলে খুব হালকা আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেটি যেন খুব উজ্জ্বল না হয়।
লাল বা অ্যাম্বার রংয়ের মৃদু আলো ঘুমের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে। তাই প্রয়োজন হলে এই ধরনের ছোট রাতের বাতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘরের বাইরে করিডরে হালকা আলো থাকলেও অনেকের নিরাপদ অনুভব হয়। এতে পুরো ঘর আলোকিত হয় না, আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারও থাকে না।
নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসের গুরুত্ব
ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা শরীরকে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং জেগে ওঠার অভ্যাস শরীরের জৈবিক ছন্দ ঠিক রাখে।
তাই নিয়মিত ঘুমের রুটিন থাকলে, ঘর অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই ঘুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এতে অন্ধকারকে আর অস্বস্তিকর মনে হয় না।
এই বিশেষজ্ঞরা, ঘুমানোর আগে কিছু শান্ত অভ্যাস গড়ে তোলারও পরামর্শ দেন। যেমন গরম পানিতে গোসল করা, হালকা গান শোনা, শরীর টানটান করা বা ভেষজ চা পান করা।
এসব কাজ শরীর ও মনকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
ঘুমের আগে স্ক্রিন টাইম কমানো
অনেকেই ঘুমানোর আগে দীর্ঘসময় মোবাইল ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহার করেন। তবে এসব যন্ত্রের আলো মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
কিশা সালিভান বলেন, “ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে এসব যন্ত্র দূরে রাখা উচিত। কারণ শুধু আলোর কারণেই নয়, অনবরত তথ্য দেখার অভ্যাসও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নিতে দেয় না।”
ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং গভীর ঘুমও ব্যাহত হয়।
আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা
অন্ধকারে যারা অস্বস্তি বোধ করেন, তারা অন্য অনুভূতিগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। যেমন পরিচিত বিছানা, আরামদায়ক চাদর বা শান্ত শব্দ, অনেককে নিরাপদ অনুভব করাতে পারে।
ঠান্ডা ও শান্ত ঘর দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে। বাইরে শব্দ থাকলে কানে ব্যবহারযোগ্য নরম, হালকা শব্দ তৈরি করে এমন যন্ত্র সহায়ক হতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মানসিক প্রশান্তি
অন্ধকারে ভয় বা উদ্বেগ তৈরি হলে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম কার্যকর হতে পারে।
কিশা সালিভান বলেন, “ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া মস্তিষ্ককে আতঙ্কের অবস্থা থেকে শান্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এতে শরীরের চাপ কমে এবং ঘুম সহজ হয়।”
অনেকে ধাপে ধাপে শরীর শিথিল করার ব্যায়ামও করেন। এতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রতিটি অংশ আলাদা করে শিথিল করার চেষ্টা করা হয়। এই পদ্ধতি মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন
ঘুমের আগে মানসিক চাপ কমানোর পন্থা