ধারাবাহিক উপন্যাস
Published : 07 Sep 2025, 12:35 AM
সে ছিল এক চঞ্চল তরুণ জাকারান্ডা গাছ, কৌতূহলী আর আবেগি।
সে বললো, আমাদের ওকে জিজ্ঞেস করা উচিত।
এখনো না, উত্তর দিল আরেকটি গাছ।
ও প্রস্তুত নয়, বললো তৃতীয় গাছটি।
ওর কাছে সেটা অনেক বেশি চাওয়া হবে, বললো চতুর্থ গাছটি।
আমি একমত, চিৎকার করে উঠল পঞ্চম গাছ। তোমরা কি দেখছ না, ও তো একেবারে ছোট্ট একটা মেয়ে?
আরও ভালো তো! গম্ভীর গলায় বলে উঠল এক ওবেচে গাছ। কারণ বোঝার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে শিশু-কিশোরদের মধ্যেই।
আমার মনে হয় আমাদের অপেক্ষা করা উচিত, বললো সপ্তম এক গাছ। তার কণ্ঠস্বর ভীষণ পুরনো আর জ্ঞানভরা। চলো অপেক্ষা করি, দেখি আসলে সে কেমন। ঠিক মানুষটা হতে হবে। যদি ঠিক না হয়, সবই বৃথা যাবে।
সে-ই ঠিক মানুষ, বলে উঠল আগের এক গাছ। দেখছ না, কেমন করে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে?
হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ, আরেকটি বললো। ও আমাদের শুনতে পাচ্ছে, বুঝতেও পারছে। এটাই তো অনেক বড় কথা।
তবুও অপেক্ষা করি, সেই বুড়ো জ্ঞানী গাছ আবার বললো। আমরা এতদিন অপেক্ষা করেছি, আরেকটু করলেই বা কী! তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা যে, বাকি সবাই চুপ হয়ে গেল। তবুও তারা ভিড় করে মাঙ্গোশির চারপাশে দাঁড়িয়ে রইল, বিস্মিত চোখে তাকিয়ে।
এবার মাঙ্গোশিও তাদের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এরা যেন তার পরিচিত মানুষ, তার গ্রামের লোকেরা, কিংবা কারও গল্পে শোনা মানুষ। কেন এমন লাগছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না। তারা নীরবই রইল। অবশেষে মাঙ্গোশি নিজেই মুখ খুলে বললো, তোমরা কীসের জন্য অপেক্ষা করছ?
গাছেরা কিছুই বললো না।
আমি নাকি এখনো প্রস্তুত নই? কিন্তু কীসের জন্য প্রস্তুত?
এ প্রশ্নে গাছেরা নিশ্চুপ।
আমি তো এখানে চিরকাল থাকতে পারব না। আমাকে ঘরে ফিরতেই হবে। এখন বাবা-মা হয়তো ভেবে বসে আছে, আমার নিশ্চয় কিছু হয়েছে।
এই বলে মাঙ্গোশি উঠতে গেল। তখনই গাছেরা সশব্দে দুলে দুলে তাদের আগের জায়গায় ফিরে গেল। আর তারা ঝুঁকে তার ওপর দাঁড়িয়ে রইল না। এখন আর তারা পরিচিত মানুষের মতো লাগছে না। তাদের আবার কেবল গাছের মতোই মনে হচ্ছে।
হয়তো সবই স্বপ্ন। হয়তো আমি কল্পনাই করেছি তারা কথা বলছে। কী যে বোকামি করছি আমি! মাঙ্গোশি নিজেই নিজেকে বললো। তারপর সে পথ খুঁজতে লাগল। হঠাৎ করেই পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। সে হাঁটতে লাগল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। পাখির ডাক আর বাতাস বয়ে যাচ্ছে পাতার ফিসফিসানি শুনতে শুনতে।
অবশেষে তার চোখে পড়ল গ্রামের রেখা। দেখল মানুষজন কথা বলছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে থালা-বাসনের শব্দ। রান্না করা তরকারির সুগন্ধ তার নাকে এসে লাগল। তাই সে তাড়াহুড়ো করে হাঁটতে লাগল। এসময় বনভূমির ওপর ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। যদি সে আর একটু দেরি করত, হয়তো ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পেত না।
মাঙ্গোশিকে দেখে তার মা-বাবা খুবই স্বস্তি পেলেন। এতক্ষণ তারা ভীষণ চিন্তায় ছিলেন। তখনই তারা মেয়েকে মনে করিয়ে দিলেন, যে ফুলটি আনতে তাকে পাঠানো হয়েছিল, সেটি কোথায়? মাঙ্গোশি হকচকিয়ে বুঝল, ফুলটি আর তার কাছে নেই। কুয়াশার মধ্যে কোথাও নিশ্চয়ই ফেলে এসেছে।
ফুল না পাওয়ায় বাবা-মা কিছুটা দুঃখ পেলেও, মেয়েকে নিরাপদে ঘরে ফিরে পেয়ে তাদের আনন্দ আরও বেশি হলো। রাতের খাবার খেয়ে মাঙ্গোশি মায়ের মুখে গল্প শুনতে লাগল। গল্পটি ছিল এক শিকারির অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে, যে একদিন জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল। গল্পটা এতই মজার আর টানটান যে, মাঙ্গোশির মনে হলো সে নিজেই যেন সেই গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। শিকারির সঙ্গে কথা বলছে, তার সঙ্গে বনের পথে হাঁটছে। তারপর কখন যে সে নিজের খাটে এসে শুয়ে পড়েছে টেরই পেল না।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে হঠাৎ মনে পড়ল, গাছেরা বলেছিল, সে এখনো প্রস্তুত নয়। এই কথাটাই বারবার তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল, আর ধীরে ধীরে সে ঘুমিয়ে গেল।
পরের দিন থেকেই মাঙ্গোশির মন ছটফট করতে লাগল, আবার জঙ্গলে যাবে। কিন্তু সারাদিন তার নানা কাজ, কত ছোটখাটো দায়িত্ব সামলাতে হলো। সন্ধ্যার আগে, রাতের খাবারের ঠিক আগে, সে অবশেষে খেলতে বেরোল। সেদিন সে সেই পথ ধরল, যেটা দিয়ে আগেও গিয়েছিল। কিন্তু জঙ্গলে ঢুকতেই আবার পথগুলো বেড়ে গেল, যেন অগুনতি।
সে কিছুতেই মনে করতে পারল না, কোন পথে গিয়েছিল আর কোথায় গাছেদের ফিসফিসানি শুনেছিল। অন্ধকার নামতে শুরু করল, আর মাঙ্গোশি পথ হারিয়ে ফেলল। অনেক চেষ্টা করে সে অবশেষে ঘরে ফেরার রাস্তা খুঁজে পেল। তখন সে ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করল।
তারপর আরও কয়েকদিন মাঙ্গোশি আর জঙ্গলে গেল না। এমনকি ধীরে ধীরে সে পুরো ঘটনাটাই ভুলতে শুরু করেছে। কিন্তু এক রাতে তার ঘুম ভাঙল জানালার কাছে যেন খসখস শব্দে! সে জানালা খুলে তাকাল, কিন্তু বাইরে শুধু বাড়ির পাশের গাছের পাতাগুলোই দেখা যাচ্ছে। আবার খাটে ফিরে এসে ঘুমোতে যাচ্ছিল, তখনই এক মৃদু ফিসফিসানি কানে এলো, আমরা তোমার অপেক্ষায় আছি।
মাঙ্গোশির খুব ঘুম পেয়েছিল। সে উঠতে চাইল, দেখতে চাইল কে জানালায় ডাকছে। কিন্তু ঘুম যেন এক কালো স্রোতের মতো তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গভীরে। দেরি হওয়ার আগে চলে এসো, আবার ফিসফিস করে উঠল কণ্ঠস্বর, এবার আরও তাড়াহুড়া নিয়ে। মাঙ্গোশির মনে হলো, কেউ তাকে ডাকছে। কারও তাকে দরকার। কিন্তু তখন পর্যন্ত সে পা বাড়িয়ে ঘুমের দেশে পৌঁছে গেছে। দূর, অনেক দূর থেকে আবার ভেসে এলো সেই কণ্ঠ, তুমি কি প্রস্তুত?
কিন্তু এবার তা শোনাল যেন পৃথিবীর ওপাশ থেকে আসছে। অল্প সময়ের মধ্যেই মাঙ্গোশি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সকালে মাঙ্গোশির শুধু হালকা ঝাপসা মনে ছিল সেই কণ্ঠস্বরের কথা। সে স্কুলে গেল, অনেক কিছু শিখল। আবার ঘরে ফিরে এসে মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে লাগলো।
চলবে...
আগের পর্ব- মঙ্গোশি ও কথা বলা গাছ, প্রথম পর্ব